সারাবাংলা
এবার বাতাসী মাছের পোনা উৎপাদন
এবার বাতাসী মাছের পোনা উৎপাদন





ময়মনসিংহ ব্যুরো
Monday, May 24, 2021, 1:22 pm
Update: 24.05.2021, 1:22:51 pm
 @palabadalnet

ময়মনসিংহ: কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এবার বিলুপ্তপ্রায় বাতাসী মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। বগুড়া জেলার সান্তাহারে অবস্থিত ইনস্টিটিউটের ‘প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রে’ এই সফলতা অর্জিত হয়। এ সাফল্য বিলুপ্তপ্রায় বাতাসী মাছ চাষের জন্য মাঠ পর্যায়ের চাষিরা ব্যাপকভাবে আগ্রহী হবেন। এতে বাতাসী মাছ বাজারে সহজলভ্য হবে এবং দ্রুত ভোজন রসিকদের খাবার টেবিলে ফিরবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।  

বিএফআরআই সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে আইইউসিএন’র তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে স্বাদুপানির ২৬০টি মাছের মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বিলুপ্তপ্রায়। এরমধ্যে ৯টি অতিবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি বিপন্নের পথে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২৫টি বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন সক্ষম হয়েছে। গত ১৯ মে ওই তালিকায় সংযোজন হলো বাতাসী মাছ। বাতাসী মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Neotropiusatherinoides। এই প্রজাতির মাছ সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং মিয়ানমারে বেশি দেখা যায়। 

এদিকে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এক সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলের খর স্রোতে ব্রহ্মপুত্র নদে চেলা, গাঙমাগুর, বাছা, গাউড়া, বাতাসী ও কাজলিসহ অনেক প্রজাতির ছোট মাছ পাওয়া যেতো। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদসহ কয়েকটি নদীতে সুস্বাদু বাতাসী মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়লেও হাটবাজারে খুব কমই পাওয়া যায়। ব্রহ্মপুত্র নদসহ হাওর অঞ্চলের জেলেদের সংগ্রহ করা বাতাসী মাছ প্রায়শ নগরীর মেছুয়াবাজার, নতুনবাজার, সানকিপাড়াবাজার, মিন্টু কলেজ রেলগেট বাজারসহ শহরতলীর হাটবাজারে প্রতিকেজি ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় বেচাকেনা হয়। 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা কারণে দেশীয় ছোট মাছ জলাশয়ে এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। দিনে দিনে অনেক মাছ এখন বিপন্নের তালিকায় চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিলুপ্তপ্রায় মাছকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গবেষণা শুরু করা হয়। গত পাঁচ বছরে তার সরাসরি তত্ত্ববধানে ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তরের স্বাদুপানি কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উপকেন্দ্রের গবেষকরা ১৩টি বিলুপ্তপ্রায়  জাতপুটি, টেংরা, গজার, আঙ্গুস, খলিসা, মেনি, বালাচাটা, দাতিনা, বৈরালী, গুতুম, ঢেলা ও বাতাসী মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন। সর্বশেষ বাতাসী মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেন গবেষকরা।

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ আরো জানান, এ পর্যন্ত ২৬টি প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদের কৌশল উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। বগুড়ার সান্তাহার প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে খর স্রোতা যমুনা ও আত্রাই নদীসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বাতাসী মাছের পোনা সংগ্রহ করে উপকেন্দ্রের পুকুরে নিবিড়ভাবে প্রতিপালন করেন। এসময় বাতাসী মাছের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিপক্ক বাতাসী মাছের খাদ্য নালিতে শতকরা ৮৬ ভাগ প্লাংটন ও ১৪ ভাগ অন্যান্য খাদ্য বস্তুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া বছরব্যাপী জিএসআই ও হিস্টোলজি পরীক্ষণের মাধ্যমে বাতাসী মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করা হয়। গবেষণায় আরো দেখা যায়, এ মাছটির দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর দেহ চ্যাপ্টা এবং উপরের চোয়াল নীচের চোয়ালের চেয়ে কিছুটা লম্বা। বাতাসী মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে থেকে জুলাই। ডিম ধারণক্ষমতা আকার ভেদে ১২০০-২৫০০টি। একটি পরিপক্ক স্ত্রী বাতাসী মাছ চার দশমিক শূণ্য গ্রাম থেকে ছয় দশমিক শূণ্য গ্রাম ওজনের হলেই প্রজনন উপযোগী হয়। প্রজনন উপযোগী পুরুষ বাতাসী মাছ স্ত্রী বাতাসী মাছের চেয়ে আকারে আপেক্ষাকৃত ছোট (২.৫-৪.০ গ্রাম) হয়। 

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, প্রজনন মৌসুমের শুরু হলে চলতি মে মাসে বাতাসী মাছকে হরমোন ইনজেকশন দেয়া হয়। হরমোন প্রয়োগের ১২-১৫ ঘণ্টা পর বাতাসী মাছ ডিম ছাড়ে এবং ২৩-২৫ ঘণ্টা পর নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপাদিত হয়। ডিম নিষিক্ততার হার ছিল শতকরা প্রায় ৭৩ ভাগ। উৎপাদিত রেণু বর্তমানে প্লাবনভুমি উপকেন্দ্রের হ্যাচারিতে প্রতিপালন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বাতাসী মাছের গবেষকদলের প্রধান ড. ডেভিড রিন্টু দাস জানান, বাতাসী মাছ একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ মাছ। প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী বাতাসী মাছে পটাশিয়াম ৬১০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪০০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২০০ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক ১৪.৪ মিলিগ্রাম, আয়রন ৩৩.০মিলিগ্রাম এবং ম্যাঙ্গানিজ ২০০মিলি গ্রাম রয়েছে। যা অন্যান্য দেশীয় ছোট মাছের তুলনায় অনেক বেশি। জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। করোনাকালে বাতাসী মাছ বেশী করে খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন তিনি। 

বিএফআরআই’র মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ আরো জানান, বিলুপ্তপ্রায় মাছ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে  ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে পিয়ালী, কাজলী, কাকিলা, রাণী ও গাং টেংরাসহ আরো আটটি মাছ নিয়ে গবেষণা চলছে। ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ায় দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার মে.টন। গত ১২ বছরে পুকুরে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় চার গুণ বেড়ে আড়াই লাখ মে.টন হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, পর্যায়ক্রমে সকল বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে চাষি পর্যায়ে চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজন রসিকদের খাবার টেবিলে দেশীয় সকল ছোট মাছ ফিরিয়ে আনা হবে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহস্থ স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে একটি ‘লাইভ জীন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ এবং পোনা উৎপাদনে গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০২০ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করে বলেও জানান তিনি। 

পালাবদল/এমএ


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]