বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
রাওয়াতের ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ ক্যাম্প চালুর ঘোষণায় কাশ্মিরে আতঙ্ক
রাওয়াতের ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ ক্যাম্প চালুর ঘোষণায় কাশ্মিরে আতঙ্ক





আল জাজিরা
Sunday, Jan 26, 2020, 1:03 am
Update: 26.01.2020, 1:05:20 am
 @palabadalnet

জেনারেল বিপিন রাওতয়াত

জেনারেল বিপিন রাওতয়াত

ভারতের নতুন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল বিপিন রাওতয়াত চীনের জিনজিয়াংয়ের আদলে ভারতে ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ বা উগ্রতা দূরীকরণ ক্যাম্প চালুর ঘোষণায় কাশ্মিরে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

নয়া দিল্লিতে গত সপ্তাহে মিডিয়া ও বিদেশী ডেলিগেটদের সামনে বক্তব্যকালে রাওয়াত বলেন, কাশ্মিরে আমরা ‘রেডিক্যালাইজেশন’ দেখতে পাচ্ছি…। এমন অনেকে আছে যারা পুরোপুরি উগ্র হয়ে গেছে। এদেরকে আলাদা করে ‘উগ্রতা দূরীকরণ ক্যাম্পে’ নিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদেরকে দেশে ‘উগ্রতা দূরীকরণ ক্যাম্প’ চালু করতে হবে।

কাশ্মিরিদের মধ্যে আতঙ্ক

রাওয়াতের কথায় কাশ্মিরিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, চীনের জিনজিয়াংয়ের মতো শিবির চালু করতে চাচ্ছে ভারত। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন চীনের ওই সব অন্তরায়ন শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি উইঘুর মুসলমানকে আটকে রাখা হয়েছে। বেইজিং এগুলোকে পুনঃশিক্ষা শিবির বলছে। কথিত ধর্মীয় চরমপন্থা দূর করতে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে বেইজিংয়ের দাবি।

শ্রীনগরভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর আহমদ বাবা বলেন, ভারতের চীনকে অনুসরণ করা ঠিক হবে না কারণ ভারত নিজেকে সাংবিধানিক গণতন্ত্র দাবি করে।

গত ৫ আগস্ট ভারতের মোদি সরকার একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগুরু রাজ্য কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে। তখন থেকে অঞ্চলটি অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এলাকাটির সঙ্গে ইন্টারনেট, মোবাইল, ল্যান্ডফোনসহ যোগাযোগের সব ধরনের উপায় বন্ধ করে দেয়া হয়। ৫ মাস পর মোবাইল ফোনের সংযোগ চালু হলেও ইন্টারনেট সংযোগ নেই এখনো। কোন গণতান্ত্রিক দেশে এটাই দীর্ঘদিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখার রেকর্ড।

আল জাজিরাকে বাবা বলেন, কাশ্মির একটি রাজনৈতিক সমস্যা, এর সঙ্গে উগ্রবাদের কোন সম্পর্ক নেই। গণতন্ত্রে এ ধরনের কিছু কাম্য নয়। কাশ্মির একটি রাজনৈতিক সমস্যা এবং রাজনৈতিকভাবেই তার সমাধান হতে হবে।

এদিকে, রাওয়াতের দাবি নিশ্চিত করে কাশ্মিরের একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার আল জাজিরাকে বলেন, কাশ্মিরে প্রথম উগ্রতা দূরিকরণ শিবির স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

ওই অঞ্চলের পুলিশ প্রধান দিলবাগ সিং কাশ্মিরে  উগ্রতা দূরিকরণ শিবির স্থাপনের ধারণা সমর্থন করে বলেন, কাশ্মিরে এ ধরনের কিছু চালু করা হলে তা হবে ভালো লক্ষণ। এটা হওয়া উচিত। এটা নষ্ট হয়ে যাওয়া লোকজনকে নিশ্চিতভাবে সাহায্য করবে।

রাওয়াতের বিতর্কিত বক্তব্য

‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন ক্যাম্প’ স্থাপনের ব্যাপারে বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যের পর অধিকারকর্মী এবং কাশ্মিরি বুদ্ধিজীবীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, জেনারেলের ভাষায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়েও কাশ্মিরিদের কীভাবে দেখা হয়। তার এই মন্তব্য কাশ্মির ইস্যুকে বিপজ্জনক রাস্তায় ঠেলে দিতে পারে।

ইতিহাসবিদ সিদ্দিক ওয়াহিদ বলেন, এটি বিস্ময়কর যে তার পর্যায়ের একজন এমন কথা বলবেন। এটি আমাদরকে চীনের উইঘুর শিবিরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমার মনে হয় না বিপিন রাওয়াত তার কথার গুরুত্ব বুঝে ওই মন্তব্য করেছেন।

জেনারেল রাওয়াতের ওই মন্তব্যকে অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে কাশ্মিরি বুদ্ধিজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, দেশটির বর্তমান নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময় এমন সব কিছুই সম্ভব হয়ে উঠছে যা কয়েক বছর আগে চিন্তাও করা যেতো না।

কীভাবে সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করতে হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে সেদিন বিপিন রাওয়াত বলেন, কাশ্মীরে মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যেই একটা ছেলে বা মেয়ে উগ্রবাদী হয়ে ওঠে। তাদেরকে হয়তো ধীরে ধীরে উগ্রবাদ থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সেখানে অনেকেই আছেন যারা পুরোপুরি উগ্রবাদী হয়ে উঠেছে। তাদেরকে অবশ্যই আলাদা করে ফেলতে হবে এবং সম্ভব হলে ডি-রেডিক্যালাইজেশন শিবিরে নিয়ে যেতে হবে। এরপরই তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ভারতে ডি-রেডিক্যালাইজেশন ক্যাম্প স্থাপিত হচ্ছে।

তার ওই মন্তব্য ভারতজুড়ে গণমাধ্যমগুলোর প্রথম পাতার শিরোনামে পরিণত হয়। শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন মুম্বাইয়ের এমন একজন অধিকারকর্মী সকেত গোখালে জানান, এই প্রথম তিনি ভারতের মধ্যে এ ধরনের ডি-রেডিক্যালাইজেশন ক্যাম্পের কথা শুনেছেন। ডি-রেডিক্যালাইজেশনের জন্য আলাদা প্রকল্প আছে কিন্তু তা একটি ক্যাম্পের থেকে অনেক আলাদা। সিদ্দিক ওয়াহিদও এই ক্যাম্প শব্দটা নিয়ে আতঙ্ক জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা কি এমন একটি ক্যাম্পের বিষয়ে কথা বলছি যেখানে মানুষদের নিয়ে তাদের পরিচয় মুছে দেয়া হবে এবং নতুন করে তাকে পরিচিত হতে হবে?

সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণ

নয়া দিল্লির ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নির্বাহী পরিচালক অজয় সাহানী বলেন, এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে তার মতো উঁচু মাপের একজন মানুষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদা খাটো করে ফেললেন। আসলে অনেক দিন থেকেই তিনি এ ধরনের কথা বলছেন, যা তার রাজনৈতিক ঝোঁক স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপরে রাখা উচিত। কিন্তু এ ধরনের প্রবণতা বিব্রতকর এবং এর সুদূরপ্রসারি পরিণতি রয়েছে।

কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির সমালোচক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কাক বলেন, তার কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে তিনি শিশুদেরকে ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ ক্যাম্পে পাঠাতে চাচ্ছেন।

‘সামরিকবাহিনীর রাজনীতিকরণ ও রাজনীতির সামরিকীকরণ’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কাক। তার মতে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো হবে না।

ভারতের প্রতিরক্ষা বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় ম্যাগাজিন ফোর্স-এর নির্বাহী সম্পাদক গাজালা ওহাব বলেন, এটা চরম উদ্বেগজনক। সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকরণ মানে গণতন্ত্রকে পুরোপুরি অস্বীকার করা।

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]