শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১০ ফাল্গুন ১৪২৬
 
মতামত
নাগরিকত্ব আইনকে ঘিরে ভারতের সবচেয়ে বড় ফেডারেল সঙ্কট
নাগরিকত্ব আইনকে ঘিরে ভারতের সবচেয়ে বড় ফেডারেল সঙ্কট





সুবীর ভৌমিক
Friday, Jan 24, 2020, 12:15 pm
Update: 24.01.2020, 4:06:15 pm
 @palabadalnet

বৃটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য থেকে ১৯৪৭ সালে সৃষ্টির পর থেকে ভারতীয় ফেডারেশন এখনই সবচেয়ে বড় ‘ফেডারেল সঙ্কটে’ পড়েছে। এখন পর্যন্ত ১২টি রাজ্য সরকার নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) প্রতি তাদের বিরোধিতার কথা ঘোষণা করেছে। এই আইনে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া নির্যাতিত অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

তারা বলছে যে এই সংশোধনী ভারতের সেক্যুলার মূল্যবোধকে আঘাত হেনেছে, এ কারণে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেরালার বামপন্থী সরকার ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কংগ্রেস-শাসিত পাঞ্জাবের মতো অন্যান্য রাজ্যও একই পরিকল্পনা করছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আসামে প্রয়োগ করার পর অনেক রাজ্য অবশিষ্ট ভারতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের বিরোধিতা করেছে। এনআরসি হালনাগাদ করার ফলে প্রায় ২০ লাখ লোক তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, এদের বেশির ভাগই বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম। তারা নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।

মাক্সর্সবাদী নেতা ও কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সচিব প্রকাশ কারাত বলেন, আর ১০টি রাজ্য যদি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও এনআরসির বিরোধিতা করে এবং জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধনের (এনপিআর, যা এনআরসির প্রারম্ভিক পর্ব বিবেচিত হচ্ছে) বিরোধিতা করে তবে এসব বিতর্কিত আইন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করার বিজেপির পরিকল্পনা চিরদিনের মতো মাটিচাপা পড়বে।

কারাত বলেন, নরেন্দ্র মোদি সরকার সংবিধানকে ‘ত্রিশূলবিদ্ধ’ করার পরিকল্পনা করছে। এর প্রথমটি হলো সিএএ, দ্বিতীয়টি এনপিআর, তৃতীয়টি এনআরসি। তিনটিই পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত।

এই বিশাল ফেডারেল সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা দলের (বিজেপি) অবস্থান সঙ্কুচিত হওয়া। ভারতের বর্তমানে রয়েছে ২৮টি রাজ্য ও ৯টি কেন্দ্রশাসিত ইউনিয়ন টেরিটরি (ইউটি)। দুটি ইউনিটের তথা পুদুচেরি (সাবেক পন্ডিচেরি) ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের (দিল্লি) আইনসভা রয়েছে।

বিজেপি ও এর মিত্ররা এখন ১৪টি রাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করে: উত্তরাখন্ড, হরিয়ানা (জেজেপির সাথে), গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, বিহার (জেডি-ইউর সাথে), আসাম (এজিপি ও বিপিএফের সাথে), মেঘালয় (এনপিপির সাথে), মনিপুর (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, নাগা পিপলস ফ্রন্ট, লোক জনশক্তি পার্টির সাথে), নাগাল্যান্ড (এনডিপিপি), ত্রিপুরা (আইএনপিটির সাথে), অরুনাচল প্রদেশ, গোয়া (গোয়া ফরোয়ার্ড পার্টি ও এমজিপির সাথে) হিমাচল প্রদেশ ও কর্নাটক।

কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ করে সাতটি রাজ্য: পাঞ্জাব, পদুচেরি, ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র (শিবসেনা ও এনসিপির সাথে), ঝাড়খন্ড (ঝাড়খন্ড মুক্তি মরচান্দ আরজেডির সাথে)।

৯টি রাজ্য আঞ্চলিক দলগুলো শাসন করে: দিল্লি- আম আদমি পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ- তৃণমূল কংগ্রেস, তামিল নাড়ু- এআইএডিএমকে, অন্ধ্র প্রদেশ- ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা- তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি, কেরালা- সিপিআই (এম)-নেতৃত্বাধীন লেফট ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট, উডিশা- বিজুজনতা দল, মিজোরাম- মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট, সিকিম- সিকিম ক্রান্তিকারি মোর্চা।

বিজেপির বেশির ভাগ মিত্রও সিএএ ও এনআরসির কোনো একটির বা দুটিরই বিরোধিতা করছে। বিজেপির মিত্র হিন্দি বেল্টের রাজ্য বিহারের নিতিশ কুমার কঠোরভাবে এনআরসির বিরোধিতা করছেন, তার দল সিএএর বিরুদ্ধেও অবস্থান গ্রহণ করেছে।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিলটি ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে পাস হয়েছে। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর বিলটি নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন (সিএএ) ২০১৯ হিসেবে পরিচিতি পায়। এর পরই সিএএ, এনআরসি ও এনপিআরের তীব্র বিরোধিতা শুরু হয় ভারতজুড়ে।

এরপর পরই দেখা দেয়া ছাত্র ও নগারিকদের বিক্ষোভ নৃশংসতার শিকার হয়। গেরুয়া ব্রিগ্রেডের গুন্ডারা পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়। ভারতজুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় অনেক রাজ্য সরকার বিতর্কিত সিএএ-এনআরসি-এনপিআরের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার ও তার দল জনতা দল (ইউনাইটেড) (জেডি-ইউ) হলো বিজেপির মিত্র। জেডি-ইউ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করেছে। এর পর থেকে ভারতব্যাপী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে নিতিশ কুমার বিহারে এনআরসির বাস্তবায়নের বিরোধিতা করছে। গত সোমবার রাজ্য বিধান সভায় বক্তৃতাকালে তিনি এ নিয়ে আলোচনার কথা বলেন। তিনি বলেন, বিহারে এনআরসির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এনআরসি কেবল আসামের প্রেক্ষাপটে প্রবর্তন করা হয়েছিল, পুরো দেশের জন্য নয়। জেডি-ইউ অবশ্য প্রস্তাবিত এনপিআরের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেনি।

জরিপ বিশেষজ্ঞ থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া প্রশান্ত কিশোর (তিনি জেডি-ইউর সাথে রয়েছেন) আনুষ্ঠানিকভাবে সিএএ ও এনআরসি প্রত্যাখ্যান করার জন্য কংগ্রেস নেতৃত্বের, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গন্ধীকে ধন্যবাদ জানান। এর আগে তিনি কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব রাজ্যে তারা যেন এনআরসি প্রত্যাখ্যান করেন। নিতিশের টুইটের সূত্র উল্লেখ করে কিশোর বলেন, বিহারে সিএএ ও এনআরসি বাস্তবায়ন হবে না।

মধ্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথও সিএএর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি সম্প্রতি সংবাদপত্রে বলেছেন যে তার সরকার এমন কিছু বাস্তবায়ন করবে না যা সমাজকে বিভক্তি আনে বা বিভক্ত করার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এর মাত্র এক দিন আগে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সিএএ, এনআরসি ও এনপিআর নিয়ে আলোচনা করে। ওই সভায় কংগ্রেসের সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী এনপিআরকে এনসিআরের ছদ্মবেশ হিসেবে অভিহিত করেন।

কংগ্রেসের নেতা আনন্দ শর্মা ওই বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, সিএএ ও প্রস্তাবিত এনআরসি দেশে ভয় আর উদ্বেগের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে সমাজের ধর্মীয় ও ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘু, আদিবাসী, গরিব, অসহায়দের মধ্যে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিএএ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে, এনআরসি বাস্তবায়ন বন্ধ করতে আহ্বান জানাচ্ছে।

কংগ্রেস ক্ষমতায় আছে পাঞ্জাব, রাজস্তান, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে। তারা মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডে ক্ষমতাসীন জোটের অংশ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মহারাষ্ট্র কংগ্রেসের নেতা ও রাজ্য রাজস্ব মন্ত্রী বালাসাহেব থোরাট জোরালোভাবে বলেন যে রাজ্য সিএএ ও এনআরসি বাস্তবায়ন করবে না। রাজ্যের বিধান সভার নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেন সংকল্প ব্যক্ত করেছেন যে তিনি ক্ষমতায় এলে সিএএ ও এনআরসি পর্যালোচনা করবেন।

এখন পর্যন্ত কংগ্রেস ও এর মিত্ররা তাদের রাজ্যগুলোতে সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন না করার ব্যাপারে সোচ্চার। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সিএএ ও এনআরসি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান এখনো হয়নি। অবশ্য কেরালা বা পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টি ভিন্ন। এই দুটি রাজ্য বিজেপির নয়, কংগ্রেসও নয়।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারায়ি বিজায়ন রাজ্য বিধান সভায় একটি প্রস্তাব পাস করেন। এতে তিনি সিএএ বাতিল করার দাবি জানান। তিনি বলেন, এটি সংবিধানের নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি আশ্বাস দেন, তার রাজ্যে কোনো আটক কেন্দ্র হবে না।

পশ্চিমবঙ্গও স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা এনআরসি, এনপিআর বাস্তবায়ন করবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সিএএর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি সিএএ ও এনআরসির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার। গত মাসে এনপিআরের সাথে সম্পর্কিত সব কার্যক্রম স্থগিত করে পশ্চিমবঙ্গ।

এমনকি বিজেপি শাসিত রাজ্য আসাম ও ইউপিতেও সিএএর বিরুদ্ধে বিপুল বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে পুলিশের গুলিতে অনেক নিহত হয়েছে। সেখানে পুলিশ সন্ত্রাস চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিজেপি বলছে যে রাজ্যগুলো পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হওয়া কোনো আইন বাস্তবায়ন না করে থাকতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, সিএএ থেকে সরে আসার কোনোই সুযোগ নেই। তিনি অবশ্য এনআরসি থেকে কিছুটা পিছু হটেছেন।

অমিত শাহ বলেছেন, সিএএ ডিজিটাল মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে অনলাইনে আবেদনপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে। কিন্তু মমতা বলেছেন, তা সম্ভব নয়। কারণ আবেদন তো যাচাই করতে হবে। সেগুলো কে করবে?

স্বাধীনতার পর থেকে ভারত আর কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি। রাজ্যগুলো মাঝে মাঝেই কেন্দ্রীয় আইনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কিন্তু কখনো এত সংখ্যায় পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইন বাস্তবায়নে বিরোধিতা করেনি। অথচ বিজেপি বিপুল ব্যবধানে পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল, উচ্চকক্ষে তাদের অবস্থান সংহত করেছে। এ কারণেই সিএএ পাস করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মহারাষ্ট্রের মতো অনেক রাজ্যে পরাজয় রাজ্যগুলোর ওপর বিজেপির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রনবির সমাদ্দার বলেন, এটা নজিরবিহীন সঙ্কট। এটি ভারতের ফেডারেল কাঠামোকেই মারাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্র-রাজ্য উত্তেজনা নতুন নয়, তবে তা কখনো কোনো সঙ্কটজনক অবস্থায় উপনীত হয়নি। এর মূল কারণ বিজেপির সমঝোতার রাজনীতি পরিত্যাগ করে যেকোনো উপাযে তার বিভেদমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।


 
ট্রাম্পের নির্দেশে পরিচালিত ড্রোন হামলায় ইরানের পারসদারান (রেভ্যুলশনারি গার্ডস) প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাত ত্বরান্বিত হওয়ায় ভারতীয়রা ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ভারতে স্বার্থের জন্য বিপর্যকর বিষয়।

ভারত তার চাহিদার ৮৩ ভাগ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং মার্কিন অবরোধের কারণে বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত ইরান ছিল ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী।

ইরান বেপরোয়াভাবে ভারতের কাছে দিনে ৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বিক্রি করতে আশা করেছিল এবং এজন্য তারা প্রায় বিনামূল্যে পরিবহন ও বিক্রি বাড়ানোর জন্য ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভীত হয়ে তা গ্রহণ করেননি।

অর্থাৎ মার্কিন ভীতির কারণে ভারত খুবই সস্তা ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তেলের উৎসটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব থেকে ভারতের তেল আমদানি বেড়েছে, তবে এতে ভারতকে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তেলের দাম ভারতে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।

আর এতে যুক্তরাষ্ট্র (বর্তমানে তেল রফতানিকারক) ও সৌদি আরব লাভবান হলেও আমদানি ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতি মাত্রা বেড়ে গিয়ে (পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায়) ভারতের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে ফেলবে। ভারত সরকার অবশেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ২০২০-০১ সময়কালের জন্য হ্রাস করে করেছে ৫ ভাগ (২০১৯-২০ সময়কালে ছিল ৬.৮ ভাগ)। ম্যানুফেকচারিং, কৃষি ও এমনকি ভারতের বিশাল আইটি খাতে হতাশাজনক অবস্থার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

এখন তেল আমদানির ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে তা অর্থনীতিকে বিচ্যুত করতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা বলেন, ২০১৬ সালে মোদির নোট বাতিল করার ফলে ভারতের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়তে থাকে। এখন তার ‘ভালো বন্ধু ট্রাম্প’ যদি ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন, তবে তিনি মোদিকে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারেন।

ভারতীয় চায়ের একক বৃহত্তম আমদানিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ইরান। ২০১৯ সালেই কিনেছে ৫০ মিলিয়ন কেজির বেশি। পরিমাণটি সিআইএস দেশগুলোর (রুশ ফেডারেশনসহ) চেয়ে বেশি। এটি ভারতের মোট চা রফতানির ১০ ভাগ। চা শিল্প হলো ভারতের খামারভিত্তিক বৃহত্তম বিনিয়োগকারী খাত। ইরানি বাজার হাতছাড়া হওয়া ভারতের জন্য খুবই খারাপ বিষয়, যেমনটা হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর।

ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নের সাথে ভারত ব্যাপকভাবে জড়িত। ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ছাড় পেয়েছিল দিল্লি।

ভারত-ইরান-আফগানিস্তান ত্রিমুখী সমঝোতার কারণে চাবাহার-হাজিজাগ করিডোরের জন্য ২১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ভারতের চাহাবার বন্দরের জন্য ৮৫ মিলিয়ন ডলারও রয়েছে। আর ইরানকে ঋণবাবদ দেয়ার কথা রয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ডলার। চাবাহার বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের জন্য ভারত-ইরান সমঝোতা স্মারকে ভারতের শিল্প বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে ৮ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া হাজিজাগ লোহা ও স্টিল খনি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার। আর আফগানিস্তানের বিভিন্ন সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ধার্য করা হয়েছে ২ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ইউরোপ ও তুরস্ককে সংযুক্তকারী ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাল্টি মোড নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোরের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তারপর আসে আর২৯৭ আমুর মহাসড়ক ও ট্রান্স-সাইবেরিয়ান হাইওয়ে, যা রাশিয়ায় যাওয়ার কথা। তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্থানে যাওয়ার সুবিধা-সংবলিত হেরাত থেকে মাজার-ই-শরিফ রেলওয়ের কথাও আলোচনায় রয়েছে।

চাবাহার বন্দরের ফলে তাজিকিস্তানে অবস্থিত ভারতের ফার্কহর বিমান ঘাঁটিতে সরাসরি যাওয়া যাবে। এর ফলে মধ্য এশিয়ায় যেতে জাহাজ খরচ ৬০ ভাগ হ্রাস পাবে। পাকিস্তানকে এড়িয়েই মধ্য এশিয়ার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এলাকায় প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল ভারতের সামনে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে চাহাবার ও অন্যান্য প্রকল্পের কাজে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে।

ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীরা আইএস/আল কায়েদা ধরনের ইসলামি উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে রক্ষাপ্রাচীর মনে করে ইরানকে। দিল্লির অনেকে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করায় উদ্বিগ্ন। কারণ এতে দায়েশের প্রত্যাবর্তনের আশঙ্কা বাড়ল। হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো ইরানি প্রক্সিগুলো হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ আরব সরকারগুলোকে ভয় পায়, কিন্তু তারা ভারতকে নিয়ে চিন্তিত নয়।

সর্বোপরি ১৭ মিলিয়ন ভারতীয় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। যুদ্ধ মানে মানবিক সঙ্কট এবং তা সামাল দিতে তাদেরকে ভারতে ফিরে আসতে হবে।

ফলে ভারতীয় জনমতে ঐকমত্য রয়েছে যে ট্রাম্পকে সংযত রাখা প্রয়োজন এবং তার ইমপিচমেন্ট জনিত মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার এই চেষ্টা থেকে বিরত থাকা উচিত। নিউ ইয়র্কে ইতোমধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেইওর সাথে দুবার কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তখন নিশ্চিতভাবেই উত্তেজনা ত্বরান্বিত হওয়া নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। আর মোদি কথা বলেছেন ট্রাম্পের সাথে।

সূত্রগুলো জানায়, মোদি ও জয়শঙ্করের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হলো এই যে ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলো মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারের ইস্যুটি ইতোমধ্যেই উত্থাপন করেছেন। ওয়াশিংটনে ২+২ সংলাপে পম্পেইও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এস্পার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। তবে তাতে ভারত আপত্তি জানায়।

দিল্লির এলিট সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের প্রসেফর এমিরেটাস ভারত কারনাড তার কলামে লিখেছেন, যুদ্ধের সময় ভারতের বিমান ও সেনা ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে আগ্রহী হবে যুক্তরাষ্ট্র।

মোদির মতো ট্রাম্পও নজর সরিয়ে নেয়ার রাজনীতিতে দক্ষ। ফলে একে অপরকে ভালোমতোই বোঝেন। ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ও মার্কিন নির্বাচন এগিয়ে আসায় ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মোদির মতো জয় নিশ্চিত করার জন্য বালাকোট ধরনের কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন। ফলে তার পক্ষে সংযত হওয়ার পরামর্শ অগ্রাহ্য করাই স্বাভাবিক।

পাকিস্তানসহ ইসলামি এশিয়ার বেশির ভাগেরই ট্রাম্পের যুদ্ধ চেষ্টায় সমর্থন না দেয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানতে পশ্চিমে তুরস্ক ও পূর্বে ভারতের সমর্থন পাওয়ার আশা করতে পারে ভারত।

কিন্তু তুর্কি লৌহমানক এরদোগন ২০১৪ সাল থেকেই ইরানের সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কাজ করে আসছেন। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনা নিয়ে বিবাদের জের ধরে আঙ্কারার পক্ষে তার দেশের ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ভারতের ওপরই বেশি চাপ সৃষ্টি হবে। ট্রাম্পের সাথে ব্যক্তিগত উষ্ণ সম্পর্ক নিয়ে সবসময়ই গর্ব করেন মোদি, যদিও মোদিকে নিয়ে কৌতুক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তথাকথিত বন্ধুত্ব ভারতের জন্য লাভজনক হয়েছে সামান্যই। আর ট্রাম্পের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মোদি বেশি বেশি মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি ভারত।

ভারতের প্রযুক্তিবিদদের জন্য ভিসা বাড়ানোর আবেদনেও সাড়া দেননি ট্রাম্প, অথচ মার্কিন পণ্যের জন্য শুল্ক ছাড় দেয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। ভারতে ৫জি পরীক্ষায় যোগ দিতে চীনের হুয়াওয়েকে আমন্ত্রণ জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছে নয়া দিল্লি। তবে তা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

বেশির ভাগ ভারতীয় মনে করে, ভারতের উচিত স্বকীয়তা প্রদর্শন করা। তবে পুরনো আমলের লোকজন বলেন যে ভারত বেশির ভাগ সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করতে গিয়ে সাহস হারিয়ে ফেলে। ব্যতিক্রম ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী ও তার ছেলে রাজীব গান্ধী।

বাংলাদেশ সঙ্কটের সময় ১৯৭১ সালে নিক্সন-কিসিঞ্জারকে সামাল দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। আর মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যান করে শ্রীলঙ্কায় সৈন্য পাঠিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। চেন্নাইয়ের কছে এলটিটিইর আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হওয়ার দুদিন আগে আগরতলা বিমানবন্দরে রাজীব গান্ধীর একটি সংবাদ সম্মেলনের কথা মনে পড়ছে। তিনি তখন দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছিলেন যে বাংলাদেশে সাইক্লোন ত্রাণের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বিষয়।

ওই সময় রাজীব কংগ্রেসকে ক্ষমতায় ফেরানোর প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। তার কথাগুলো এত বছর পরও আমার কানে বাজে: ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ক্রমবর্ধমান হারে একক মেরুর হতে থাকা বিশ্বের জন্য একটি বিপর্যয়। আর ভারতের মতো আত্মমর্যাদাশীল দেশের জন্য পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়ানো বেশি বেশি কঠিন হয়ে পড়ছে।’

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

সুবীর ভৌমিক: ভারতীয় সাংবাদিক 


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]