মঙ্গলবার ২৮ জানুয়ারি ২০২০ ১৫ মাঘ ১৪২৬
 
শিল্প-সাহিত্য
মুশাররাফ করিমের কবিতা
মুশাররাফ করিমের কবিতা





রেজা ফারুক
Sunday, Jan 12, 2020, 1:43 pm
 @palabadalnet

আধুনিক বাংলা কবিতার প্রান্তরে পঞ্চাশ বছর ধরে বরিষণমুখর ক্রিস্টালের জ্বলজ্বলে অবিরাম কবিতার চন্দ্রোজ্জ্বল পঙ্ক্তি ঝরিয়ে ঝরিয়ে যিনি এখনো অনিঃশেষ দিগন্তে তারার মতো জ্বলে আছেন তিনি কবি মুশাররাফ করিম। ষাটের কবি মুশাররাফ করিমের নিভৃত কিন্তু অনুভূতিময়, অনুচ্চ কিন্তু ছুঁয়ে যাওয়া কবিতার প্রথিতযশা বর্ণোজ্জ্বল নির্জন কণ্ঠস্বর পাঠকের মনের অন্দরমহলে এক পশলা বৃষ্টির পর নিসর্গের প্রবল আর খরস্রোতা সবুজের মতো দোলা দিয়ে যায়। এখানেই কবি মুশাররাফ করিমের কাব্য-চরিত্রের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেঘলা বিকেলের মতো তার কবিতা পাঠকের শুধু নয়- কাব্যবোদ্ধাদের মাঝেও গভীরভাবে রুপোর ছায়া ফেলে ফেলে তা হয়ে উঠেছে হীরাঙ্কিত এক মনোমুগ্ধকর আবেশের নিবিড় অনুরণনের মায়াবী স্নিগ্ধতাজ্বলা গ্রহণ প্রহর। সান্ধ্য-জ্যোৎস্নার ঝাড়বাতির মতোই চার দশক ধরে তাঁর কবিতা আলো ছড়াচ্ছে চলমান কবিতার প্রধান অঞ্চলে। 

তাঁর কবিতার অন্তরোজ্জ্বল করা শব্দের মোহন আকর্ষণ বাংলা কবিতাকে ক্রমে এক মনোজাগতিকতার ভালো লাগায় ভরিয়ে তুলছে। কাব্য রচনায় কবি মুশাররাফ করিম সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম চরিত্র ধারণ করে ইতোমধ্যে নিজের মতো করেই রৌদ্রের গুঁড়োঝরা নয়ানজুলির মতো কাব্যোদ্যানে প্রবাহিত হচ্ছেন। শুদ্ধতম কবি মুশাররাফ করিম চন্দ্রডোবা ভোরের মতোই কবিতার সমুদ্রে জেগে ওঠেন প্রতিদিন ভোরে। নিঃসঙ্গ নাবিকের মতো তাঁর কবিতা খুঁজে ফেরে নীলিমার নিঃশব্দ বাতিঘর। যে বাতিঘরে জ্বলে আছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসুর মতো একেকটি শতাব্দী বিজয়ী নক্ষত্র। আর সেই নক্ষত্রের আলোতেই একদিন এসে রাজধানীর কবিতাঙ্কিত জ্যোৎস্নাহারা জংশনে ডাউন ট্রেনের মতো থামেন কবি মুশাররাফ করিম- তাঁর বুকের ভেতরের তরঙ্গ থেকে ঝাড়তে ঝাড়তে কবিতার বিষণ্ণ শব্দবীথি। তারপর এক পড়ন্ত রোদজাগা গলিতে দাঁড়িয়ে ফেরি করতে থাকেন ভালোবাসা, কষ্ট, প্রেম, দুঃখ, আনন্দ, নির্জনতা, ধূসর, বিষণ্ণ, কুয়াশা, রোমান্স, আবেগ আর মায়াময়তাবিজড়িত কবিতার মাল্টিস্টোরিড ভবন। যে ভবনে বসবাস করে তাঁরই কবিতার কুহকজ্বলা রমণীর খোঁপার প্যাগোডা থেকে ঝরে পড়া গোলাপের নৈঃসঙ্গ আর নিস্তব্ধতা। সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই মুশাররাফ করিমের কবিতার পদযাত্রা ষাট দশকের মাতাল পেভমেন্টে। সরল, সহজবোধ, সুখপাঠ্য কবিতা নির্মাণে তিনি অনবদ্য এক বাদলাঝরা রাত্রির মতোই অনর্গল। তাঁর কবিতার প্যাটার্ন যেন অতি আধুনিকতার উপকূলে গভীর লক্ষ্য নিয়ে ভিড়ে থাকা শান্ত এক ট্রলার। আর এভাবেই কবি নিজেকে নিজেই মেলে ধরেছেন দেবদারুপাতার নির্জন ড্রয়ার খুলে।

‘এই যে মুশাররাফ করিম, একটু দাঁড়ান, শুনুন
মানুষের কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে আপনি কেন অযথা চটেন
সামান্যতেই প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপতে থাকেন, ধৈর্য্য ধরেন
ধীরস্থির শান্ত হয়ে বসুন।’

(এই যে মুশাররাফ করিম/সুদূর সুন্দরে)

‘আমাকে কোথায় নামিয়ে দিয়ে গেলো স্বপ্নের ট্রেন!
এ কখনো ঈশ্বরগঞ্জ নয়, তার চেয়ে উন্নত
তারও চেয়ে অধিক গোছগাছ করার
এক অচেনা শহর।

অচেনা এ শহরে কোথায় দিই হালচাষ,
বুনি বীজ
গোলা ভরে তুলি ধান শুনি ভাতের বলক?’

(অচেনা শহর-অন্তরের ব্যাকুল ব্যাধি)

রাজধানীর ইট, কাঠ, সুরকি আর যান্ত্রিকতাকে অনুষঙ্গ করে মুশাররাফ করিম অন্বেষণ করেছেন তার গ্রামীণ জনপদের। লোকজ আধুনিক শব্দের প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় তাঁর কবিতা এক হাহাকার-জ্বলা অনুভূতির জুঁইফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিয়েছে। সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটেছে উল্লিখিত কবিতার পঙ্ক্তিবীথিতে। আর এখানেই তিনি হয়ে উঠেছেন একটি আলাদা মাঠের অন্দরে আরো একটি মাঠের উপচ্ছায়া।

‘তোমাদের প্রত্যেকের কথাই আমার মনে আছে।
ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে শীতের রোদে
কে শুকাতো ভিজা চুল;

আমিও আজ ব্যতিব্যস্ত, অতিমাত্রায় বৈষয়িক
তল্লাশ করি না তোমাদের সঠিক ঠিকানা;
হয়তো বা তোমরাও সুখে আছো-
শান্তিতে করছো ঘর।
কখনো কি মনে পড়ে না পলকার মতন
সেই ছেলেটির কথা?’
(তোমাদের কথা মনে আছে- অ. ব্যা. ব্যাধি)

আছে কি মনে, কবি জানতে চেয়েছেন তাঁর ফেলে আসা অতীতকে। শীতের ঋতুকে। নস্টালজিয়ায় পর্যুদস্ত হয়ে নিজের চলমান অবস্থাকেও স্মৃতির কাসকেটে জ্বলে থাকা রৌদ্রাঙ্কিত প্রহরকে জানিয়েছেন অনায়াসে, নির্দ্বিধায়। বৈচিত্র্যময়তার বিন্যাসে মুশাররাফ করিমের কবিতার কণ্ঠে জেগে ওঠে-

‘ভোর নামলো মুয়াজ্জিনের মধুর আযান
আর লাল মোরগের ডাকে।

সরল ধুলোর মধ্যে খোয়া গেছে কিশোরীর
নাকের নোলক
শুধু মনে আছে চুড়ির মতো শব্দ করে ভেঙে যাচ্ছে
গৃহবধূর কপাল।’

(ভোর নামলো- অ. ব্যা. ব্যাধি)

রাজনীতিময় প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে যাওয়ার মতো পঙ্ক্তি রচনাতেও মুশাররাফ করিম তাঁর স্বভাবগত অনুচ্চস্বরের নীরবতাকে বিসর্জন দেননি। উপরন্তু উদ্ধৃত কবিতামালাতেও তিনি আশ্রয় দিয়েছেন নির্জন শব্দাবলি। একজন সম্পূর্ণ কবিমানসকে ধারণ করে কবি মুশাররাফ করিম কিশোরীর লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রিবনের ফুল তোলা পনিটেলের মতো ফুটিয়েছেন অজস্র কবিতা মঞ্জরী। কাব্যাকাশের নির্মল বারান্দায় যেমন মুশাররাফ করিমের কবিতার অবিশ্রাম ভোরের রোদ এসে পড়ে। তেমনি গদ্য রচনাতেও তাঁর নির্মাণশৈলী এক অভিনব গদ্যপথ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ভিন্ন মেজাজের কথাশিল্পী। কবিতার লিরিকেল মৌন সাউন্ড এসে ট্র্যাম্পেটের মতো বাজে তাঁর কাব্যমগ্ন কথাসাহিত্যের বিজন দিগন্তে। কিশোর সাহিত্যের প্রচলিত ধারার বাইরে নিঝুম আর কোজাগরী এক রাস্তা নির্মাণ করেও তিনি স্ববৈশিষ্ট্যের অভিষেক ঘটিয়েছেন। বিরহজাগা নীলগ্রীব পাখির রোয়া জ্বলা লাল গলার মতো কাব্যময় পঙ্ক্তিতে তাঁর কথাসাহিত্যও হয়ে উঠেছে একেকটি কবিতা রচনা। গদ্য হয়েও সেসব রচনায় কাব্যিক ছাপ ফুটে উঠেছে বোগেনভিলিয়ার মতো। স্বাতন্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্যস্নিগ্ধ না ফেরা এক ঝর্নার মতোই কবি ও কথাসাহিত্যিক মুশাররাফ করিম তাঁর সৃষ্টির ধারাকে প্রবাহিত করে চলেছেন। 

তিনি কি কবি, না কথাশিল্পী! দ্বৈত পরিচয়ের মধ্যে মুশাররাফ করিম কোন পরিচয়ের উত্তরীয় মেলে ধরবেন পাঠকের সম্মুখে! এটা একান্তই তাঁর নিজস্ব বিষয়। তবে কবি হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত ও আদৃত। কিন্তু তাঁর কথাসাহিত্যকেও অলক্ষ্যে রাখার অবকাশ নেই। বিশেষ করে তাঁর তিনটি পাঠকপ্রিয় কিশোর উপন্যাস ও দুটো দীর্ঘ উপন্যাস তাঁকে কথাশিল্পী রূপেও আসন করে দিয়েছে- বাংলা কথাসাহিত্যের অবিভক্ত শিরিষের পথে। দীর্ঘ উপন্যাস ‘পূর্ব পুরুষগণ, প্রথম বৃষ্টি’, এবং ২০১৪-এর বইমেলায় প্রকাশিত উপন্যাস ‘স্বপ্নকাব্য’ এক আরণ্যক নির্যাসে ভেজা ভোরের মতোই যেন নৈসর্গিকতার মৌনতাকে টেনে এনে বুকের গহনে বিছিয়ে দেয় গভীর ভালো লাগায়। তাই বলা চলে কবি মুশাররাফ করিম ভালোবাসা, ইতিহাস, রাজনীতি এবং যন্ত্রণার যে নিমগ্ন বুনন করে চলেছেন তা নিঃসন্দেহে কথাসাহিত্যে তাঁর স্বনির্বাচিত পথের স্থান করে দেবে। 

কবিতায় আন্তর্জাতিকতাবাদ, কখনো কখনো পরাবাস্তবতার নির্বিঘ্নে বিচরণ কবি মুশাররাফ করিমের কবিতাকে আরো পরিশীলিত করেছে। আপাদমস্তক কবিতার শিশিরে মোড়ানো একজন কবির মতোই কবি তিনি। নিঃসঙ্গ একটি ছায়াবৃক্ষের মতোই কবিতার অরণ্যে, কাব্য স্বজনের মতো বুক পেতে বসে আছেন পরম মমতায়। ফ্রেবিকোর মতো নরম ভোরবেলাকার কুজ্ঝটিকায় এক টুকরো স্বর্ণোজ্জ্বল নির্জনতার মতো কবি মুশাররাফ করিমের কবিতা ও কথাসাহিত্য জ্বলে আছে আকণ্ঠ উজ্জ্বলতায়। জেগে আছে মেঘের বুকসেলফে, জ্যোৎস্নার ব্যালকনি আর বিকেলের ইজিচেয়ারে নিঃশব্দে শুয়ে থাকা মখমলি রোদের ছায়ায় তাঁর অশ্রুসজল কবিতার অনর্গল তরুগুচ্ছ।


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]