দক্ষিণ এশিয়া
ভারতের নাগরিকত্ব বিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হয়েছে যেভাবে
ভারতের নাগরিকত্ব বিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হয়েছে যেভাবে





পালাবদল ডেস্ক
Friday, Dec 6, 2019, 11:57 am
 @palabadalnet

বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ভারতের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী আনার জন্য নির্ধারিত বিল অনুমোদন দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদির প্রথম প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় ভারতীয় জনতা পার্টি এই বিলটি পার্লামেন্টে পাস করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সেই দফা তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। এখন আবার আগামী সপ্তাহে পার্লামেন্টে এই বিলটি তোলা হবে এবং এবার এটা পাস হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই বিলে কি বলা হয়েছে এবং কেন এটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, সেটা এখানে তুলে ধরা হলো।
 
সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলটি কি?

বিলের নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে ১৯৫৫ সালের সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছে। এই আইনেই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিয়ম নীতি উল্লেখ রয়েছে।

এই বিলে বলা হয়েছে যে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না।

ভারতের নাগরিকত্বের প্রক্রিয়ায় আগে বিদেশীদের নাগরিকত্বের যে বিধান ছিল, এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা মৌলিকভাবে বদলে যাবে। ভারতের বর্তমান আইনের অধীনে, অবৈধ অভিবাসীরা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী – যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে, তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল পাস হলে উপরে উল্লেখিত সম্প্রদায়গুলো এই আইনের আওতায় পড়বে না। এই আইন অনুসারে বাংলাদেশী হিন্দু – যারা এই আইনের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য – তারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও বা ভিসার মেয়াদ শেষের পরও এখানে অবস্থান করে থাকলেও ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য তারা আবেদন করতে পারবে।

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলে ধর্মীয় শর্ত কেন রাখা হয়েছে?

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক সাক্ষাতকারে দাবি করেছেন যে, এই বিলে যে বাছাইয়ের শর্ত রাখা হয়েছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য হলো শুধুমাত্র ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরকে এখানে সুযোগ দেয়া হবে। বিজেপি এমপিরাও যৌথ পার্লামেন্টারি কমিটির সামনে একই কথা বলেছেন।

তবে, এই কথা দিয়ে বিলের কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা স্পষ্ট হচ্ছে না। যেমন, মিয়ানমার – যেখানে মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে – তাদের কথা তালিকায় নেই, কিন্তু আফগানিস্তানের নাম এখানে রয়েছে। এটা করা হয়েছে যদিও আফগানিস্তানের সাথে ভারতের কোন সীমান্ত নেই, যেখানে মিয়ানমারের সাথে রয়েছে। তাছাড়া, শ্রীলংকাও এই তালিকায় নেই, যদিও সেখানকার তামিল সম্প্রদায় – যাদের অধিকাংশই হিন্দু – তারা শ্রীলংকার রাষ্ট্রের হাতে গণহত্যার শিকার হয়েছে।

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো এটা ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনীতির অংশ, যেখানে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ট দেশগুলোর নির্যাতিত হিন্দু অভিবাসীদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, যাতে এই জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগিয়ে ভারতের ভোটের রাজনীতি বদলে দেয়া যায়। তাছাড়া ভারতকে যেভাবে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে বিজেপি, সেটাও এখানে ফুটে উঠেছে।

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলটি কিভাবে এনআরসির সাথে জড়িত?

ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স একটি প্রক্রিয়া, যেটি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আসামে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করাই এটার উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজেপি স্বতস্ফূর্তভাবে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এটাকে শক্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

কিন্তু আসামের এনআরসি এক পর্যায়ে এসে বিজেপির স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে গেছে। কারণ তালিকা থেকে বাদ পড়াদের বড় অংশই দেখা গেছে হিন্দু। এই জবাবে বিজেপি সমাধান হিসেবে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলকে হাজির করেছে। দলের নেতারা দাবি করেছেন যে, আসামে এনআরসি থেকে বাদ পড়া হিন্দুরা এই আইনের অধীনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে, যদিও এটা এখনও স্পষ্ট নয় যে, সেটা কিভাবে করা হবে।

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের বিরোধিতা কেন করা হচ্ছে?

এই বিলের বিরোধিতা তিনটি অংশে বিভক্ত। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এতে ধর্মীয় শর্ত জুড়ে দেয়া নিয়ে আপত্তি করেছেন, কারণ এতে ভারতের অন্যতম প্রধান নীতি সেক্যুলারিজম বিঘ্নিত হবে।

উত্তর পূর্ব ভারতে এই বিলের সাথে জনসংখ্যার মানচিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে, এর ফলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল মানুষ এখানে প্রবেশ করবে। কিছু মিডিয়া রিপোর্টের ভাষ্য অনুসারে, বিলের সংশোধিত খসড়ায় উত্তর পূর্বাঞ্চলের বহু জায়গাকে বাদ দেয়া হয়েছে, যে জায়গাগুলো ইনার লাইন পার্মিট সিস্টেম বা সিক্সথ শিডিউলের অধীনে পড়ে, যে সব জায়গায় উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোর এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন দেয়া রয়েছে।

আসামের সাবেক কংগ্রেস এমপি সুস্মিতা দেব এই বিল নিয়ে বলেছেন যে, যে হিন্দু অভিবাসীদের সাহায্য করার জন্য এই বিলটি তৈরি করা হচ্ছে, সেটাও এখানে কাজে আসবে না। দেব উল্লেখ করেছেন যে, ধর্মীয় নির্যাতনের বিষয়টি প্রমাণ করাটা খুব কঠিন হবে। দেব একই সাথে এই প্রশ্নও তুলেছেন যে, যে সব হিন্দু বাঙালি আসামের এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন, তাদের কিভাবে সিএবির মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেয়া হবে – যেটা বিজেপি দাবি করে আসছে। কারণ এই দুটি বিষয়ই একটি অন্যটির সাথে সাংঘর্ষিক। এনআরসির জন্য যারাই দরখাস্ত করেছেন, তারা দাবি করেছেন যে, তারা ভারতের নাগরিক ছিলেন। অন্যদিকে, সিএবি থেকে সুবিধা পেতে হলে স্পষ্টভাবে দাবি করতে হবে যে, তারা বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছে। সূত্র: স্ক্রল.ইন

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]