মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
গোতাবায়া রাজাপাকসের বিজয়, মুসলমানরা চরম আতঙ্কে
গোতাবায়া রাজাপাকসের বিজয়, মুসলমানরা চরম আতঙ্কে





পালাবদল ডেস্ক
Sunday, Nov 17, 2019, 10:30 pm
Update: 17.11.2019, 10:39:49 pm
 @palabadalnet

কলম্বো: শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাবায়া রাজাপাকসে বিজয়ী হয়েছেন। মি. রাজাপাকসে - যিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসের ভাই - তিনি ৫২ শতাংশের বেশি ভোট পান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিথ প্রেমাদাসা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন, এবং সোমবারই হয়তো গোতাবায়া রাজাপাকসে শপথ নিতে যাচ্ছেন।

গোতাবায়া রাজাপাকসে এই বিজয়ে চরম আতঙ্কে পড়ে গেছে মুসলমানরা। তারা সাজিথ প্রেমাদাসাকে সমর্থন দিয়েছিল। নির্বাচনের দিন মুসলিম ভোটারদের বহনকারী ১০০ বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল উগ্রবাদী বৌদ্ধরা।

গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার সময় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের যেভাবে দমন করেছিলেন তা নিয়ে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু একজন বিতর্কিত রাজনীতিবিদ হয়েও কেন বিজয়ী হলেন তিনি?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, এই নির্বাচনকে ঘিরে শ্রীলঙ্কার জনগণের মধ্যে বিভক্তি ছিল স্পষ্ট । বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজাপাকসে সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বেশি ভোট পেয়েছেন, অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমাদাসার জনপ্রিয়তা ছিল সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের মধ্যে। কিন্তু নির্বাচনের আংশিক ফল বেরুনোর পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে গোতাবায়া রাজাপাকসেই বিজয়ী হতে যাচ্ছেন।

গোতাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলিদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রায় দশ বছর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং শ্রীলঙ্কায় তামিলদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের অবসানের কৃতিত্ব দেয়া হয় তাদের। সেসময় গোতাবায়া রাজাপাকসে ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যেরকম কঠোর এবং নিষ্ঠুরভাবে তিনি দমন করেছিলেন, সেজন্যে তিনি বেশ বিতর্কিত।

তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লংঘনেরও অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু গোতাবায়া রাজাপাকসে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে 'ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দেন।

এবারের নির্বাচনী প্রচারাভিযানেও গোতাবায়া রাজাপাকসে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার বিজয়ে শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিরা বেশ উৎফুল্ল।

সাংবাদিকদেরকে একজন ভোটার বলেন, তিনি সবসময়ই চেয়েছিলেন গোতাবায়া রাজাপাকসেই যেন প্রেসিডেন্ট হন। আরেকজন বলেন, গোতাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তার ব্যাপারে যেসব অঙ্গীকার করেছেন, তার সঙ্গে তিনি একমত বলেই তিনি তাকে সমর্থন দিয়েছেন।

অন্যদিকে এক টুইটে গোতাবায়া রাজাপাকসে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে বলেন, শ্রীলঙ্কার সব মানুষ এই নতুন যাত্রার সাথী।

অন্যদিকে সাজিথ প্রেমাদাসা ভালো করেছেন তামিল সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরাঞ্চলে। তিনি জোরালো সমর্থন পেয়েছিলেন তামিল এবং মুসলিমদের কাছ থেকে।

কিন্তু শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকারের সঙ্গে প্রেমাদাসার সম্পর্ক তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছিল।

শ্রীলংকা গত কিছুদিন ধরে যে অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে দেশটিকে স্থিতিশীল করতে গোতাবায়া রাজাপাকসে ভূমিকা রাখবেন বলে তার সমর্থকরা আশা করছেন।

গত এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় এক ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী হামলার পর এটি ছিল শ্রীলঙ্কায় প্রথম নির্বাচন। ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত জঙ্গিরা শ্রীলঙ্কার গির্জা এবং অভিজাত হোটেলগুলোকে টার্গেট করে এই হামলা চালিয়েছিল, যাতে নিহত হয় আড়াইশোর বেশি মানুষ।

গোতাবায়া রাজাপাকসে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেন, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকবেন অনেকে। অন্যদিকে তিনি আরো বলেছিলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করবেন।

চীনের কাছে শ্রীলঙ্কা যেরকম ঋণগ্রস্ত, সেটি নিয়ে দুদেশের সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এটি বেশ স্পর্শকাতর বিষয়।

সে কারণে বিশ্লেষকদের মতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজটি সহজ হবে না, বিশেষ করে যখন তাকে ভারতের সঙ্গেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ বজায় রাখতে হবে।

‘কোনো আশা থাকবে না’

দুই মাস আগে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোনে কল আসা শুরু হয়। শ্রীলঙ্কা মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ কণ্ঠস্বর চিনতে পারেননি। ফোনে তারা স্পষ্ট হুমকি দিয়েছে: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোতাবায়া রাজাপাকসাকে সমর্থন দাও। তা না হলে, আমরা তোমার বাড়িঘরে আগুন দেবো, তোমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করবো এবং পরিবারের সদস্যদের খুন করবো।

আহমেদ বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণা পুরো শ্রীলঙ্কার মুসলিম সম্প্রদায়কে খুবই আতঙ্কিত করে তুলেছে”। ওই ফোন কলের পর তার স্টাফদের সরাসরি হয়রানি করা হলে তিনি ভয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। “প্রায় সব জাতীয়তাবাদী চরমপন্থী গোতাবায়া রাজাপাকসার পেছনে জড়ো হয়েছে এবং তারই জেতার সম্ভাবনা বেশি। আমাদের আশঙ্কা, তারা তাদের বর্ণবাদী, মুসলিম-বিদ্বেষী এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে আসবে এবং আমাদের ওপর হামলা করবে”

প্রায় এক দশক আগে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটেছে এবং এই প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচন একটা বাঁক বদলের মুহূর্ত হতে পারে, কারণ মানবাধিকার থেকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি – সবকিছুই নড়বড়ে অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে সমস্যাশঙ্কুল অবস্থার মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কার মুসলিম সমাজ।

চলতি বছর ইস্টার সানডের  পর থেকেই বহু মুসলিমের জীবন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। কট্টর সিংহলী বৌদ্ধদের হামলার শিকার হয়ে বহু মুসলিমের দোকানপাট ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অনেককে বাছবিচারহীনভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। নারীদেরকে প্রকাশ্যে হিজাব পড়তে দেয়া হচ্ছে না। এর সাথে জুলাই মাসে পত্রিকাতে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যেখানে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করা হয় যে, একজন মুসলিম চিকিৎসক প্রায় ৮০০০ সিংহলী বৌদ্ধ নারীদের বন্ধ্যা করে দিয়েছেন।

শ্রীলংকায় মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা কয়েক বছর ধরেই বাড়ছিল। প্রাথমিকভাবে এটা উসকে দিয়েছিল বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী গ্রুপ বোদু বালা সেনা (বিবিএস)। উগ্র ভীক্ষুরা অপপ্রচার চালায় যে, মুসলিমদের দ্রুত বংশবৃদ্ধির কারণে সিংহলী বৌদ্ধরা হুমকির মুখে আছে। মুসলিমদের পরিকল্পনা হলো অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৌদ্ধদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাদেরকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা।

এই উগ্র আদর্শ মূলধারার অংশ ছিল না। কিন্তু ইস্টার সানডের হামলার পর থেকে সিংহলী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই জাতীয়তাবাদী ধারণা শক্তি পেয়েছে। এই গ্রুপগুলো প্রাথমকি পর্যায়ে মাহিন্দা রাজাপাকসার আমলে জোরালো হয়ে উঠেছিল। এখন তারা গোতাবায়াকে তাদের সমর্থন দিচ্ছে।

ফলে, আগেই মুসলমানরা আশঙ্কা করছিল রাজাপাকসে বিজী হলে শ্রীলঙ্কায় তারা সেই একই পরিণতি বরণ করবে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যে পরিণতি হয়েছে। মিয়ানমারে শ্রীলঙ্কার কট্টরপন্থী সিংহলীদের মতো একই আদর্শধারীরা ব্যাপক বর্ণবাদী সহিংসতা চালিয়েছে এবং ২০১৭ সালে সেখানে তারা হাজার হাজার মুসলিমদের হত্যা করেছে।

কলম্বোর মুসলিম শিক্ষক সুহাইব আলীর (৩১) খালা ইস্টার বোমা হামলায় নিহত হন। হামলার সময় সাংগ্রি-লা হোটেলে নাস্তা খাচ্ছিলেন তিনি। আলী বললেন: “মুসলিম-বিদ্বেষী ঘৃণা এখানে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এবং এবারের নির্বাচনে যত ধরনের জাতীয়তাবাদী প্রচারণা চালানো হয়েছে, তাতে এর মাত্রা আরও বেড়ে গেছে”।

আহমেদ বললেন, “মিয়ানমার-স্টাইলে গণহত্যা ঠেকানোর জন্য কিছুই হয়তো আর থাকবে না”।- সংবাদসংস্থা

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]