বিনোদন
হুমায়ূন আহমেদের সেরা ৩ ধারাবাহিক নাটক
হুমায়ূন আহমেদের সেরা ৩ ধারাবাহিক নাটক





নাজিম উদ্দিন নাহিদ
Monday, Jul 19, 2021, 5:44 pm
 @palabadalnet

"বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের তিনটি ধারাবাহিক নাটকের নাম বলতে পারবেন?" মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অনেক পাঠকই এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে কিছুটা থমকে গিয়েছেন। একটা জরিপ থেকে জানা যায় যে দেশের সিংহভাগ দর্শকই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন! দেশীয় সংস্কৃতির জন্য এমন তথ্য সত্যিই হতাশাজনক। হতাশা আরো বাড়বে পরের তথ্যটি শুনলে! যারা বর্তমান সময়ের তিনটি বাংলাদেশি ধারাবাহিকের নাম বলতে পারেননি তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ কলকাতার ধারাবাহিকের নাম ঠিকই বলতে পেরেছেন! 

এই সত্যিটা জানার জন্য আসলে খুব বেশি জরিপেরও দরকার হয় না, সন্ধ্যাবেলা কোনো বাসায় গেলেই দেখা যায় সেই বাসার টিভিতে জি বাংলা অথবা স্টার জলসা সদর্পে চলছে! একগাদা দেশীয় চ্যানেলে একগাদা নাটক তাহলে কাদের জন্য নির্মিত হচ্ছে? অথচ সময়টা কিন্তু সবসময় এমন ছিল না, এমন একটা সময় ছিল যখন বিটিভিতে নাটক শুরু হলে রাস্তাঘাট সব ফাঁকা হয়ে যেতো! এখনকার যা অবস্থা তাতে এই তথ্যটা শুনলে অনেকে চমকে উঠবেন, তা-ও বলি, একটা সময়ে কলকাতার মানুষেরা বিটিভির নাটকগুলো দেখার জন্য উঁচু করে টিভির অ্যান্টেনা টাঙাতো! বাংলাদেশি নাটকের সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম কারিগর ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। 

বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী হুমায়ূন আহমেদ একাধারে অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, গীতিকার ও সুরকার। তার হাতে সম্ভবত রুপকথার সোনার কাঠিটি ছিল, রূপকথার সেই কাঠি যেখানেই স্পর্শ করানো হতো সেটিই সোনায় পরিণত হতো। আর হুমায়ূন আহমেদ যেখানেই হাত দিয়েছিলেন সেখানেই সাফল্যের আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন। এতগুলো পরিচয়ের মাঝে কথাসাহিত্যিক সত্তাটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করলে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের ধারাকাছেও কেউ ছিল না। তবে ঔপন্যাসিক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তার একটা বড় কারণ ছিল নাট্যকার হিসেবে তার আবির্ভূত হওয়া! 

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ; Image Source : United News Bangladesh
উপন্যাসের মতো নাটকের জগতেও হুমায়ূন আহমেদ তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে সেরা দশটি নাটকের তালিকা করা হলে সেখানে এক হুমায়ূন আহমেদেরই একাধিক নাটক জায়গা পাবে। এমন একজন নাট্যকারের অসাধারণ কিছু নাটক থেকে মাত্র তিনটি ধারাবাহিক নাটক বেছে নেওয়া সত্যিই খুব দুরূহ কাজ। তা-ও আমরা চেষ্টা করেছি সেই দুরূহ কাজটি করার। সেরা তিন ধারাবাহিক নাটক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা, নাটকের মান ও সমালোচকদের মতামত - এই তিনটি বিষয়কেই আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। আগেও বলেছি, হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সবগুলো ধারাবাহিক নাটকই অসাধারণ, সেখান থেকে মাত্র তিনটি নাটক বাছাই করলে অনেকের প্রিয় কিছু ধারাবাহিক বাদ পড়তে পারে এটাও সত্য। তাই বলে আমরা সেই ধারাবাহিক নাটকগুলোকে অবমাননা করছি সেটা ভাবারও কোনো কারণ নেই। তাহলে চলুন কোন তিনটি নাটক এই তালিকায় স্থান পেয়েছে এবং সেই নাটকগুলোর ব্যাপারে কিছু তথ্য দেখে নেওয়া যাক।


এইসব দিনরাত্রি

আশা ও আনন্দের যে অপরূপ দিন
তার উল্টো পিঠেই দুঃখ ও বেদনার দীর্ঘ রজনী
আশা-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা নিয়েই 
আমাদের এইসব দিনরাত্রি

সাল ১৯৮৫। হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছেন কিন্তু অর্থের অভাবে দেশে ফেরার পর থেকেই নানান সমস্যার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ দিন কাটাচ্ছিলেন। লেখক হিসেবে ততদিনে বাংলা একাডেমি পুরস্কার হুমায়ূন আহমেদ জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে সেসময়ের হুমায়ূন আহমেদ আহামরি কিছু ছিলেন না। নূরজাহান রোডের ছোট্ট এক বাসায় মা, ভাই, স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে সেই সংসারে অনেক কিছুরই অভাব ছিল। তবে লেখকের তিন কন্যা পাশের বাসায় টিভি দেখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসার পরে হুট করে একটা রঙ্গিন টিভির অভাবটা হুমায়ূন আহমেদেকে একটু বেশিই কাবু করে ফেললো। 

এদিকে বিটিভির নওয়াজীশ আলি খানের সাথে হুমায়ূন আহমেদের পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্রধরে পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমানের সাথে হুমায়ূন আহমেদের আলাপ হয়। সেসময়ে তাকে একটা ধারাবাহিক নাটক লেখার প্রস্তাব দেন মুস্তাফিজুর রহমান। ধারাবাহিক নাটক লেখার ব্যাপারে হুমায়ূন আহমেদের তেমন আগ্রহ ছিল না, কিন্তু টিভি কেনার তাগিদেই তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন। সেই নাটকের নাম দেওয়া হলো এইসব দিনরাত্রি। 

নাটকের কাহিনী খুবই সাধারণ, একটা মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে যেসব ঘটনা ঘটে থাকে সেসব ঘটনা নিয়েই নাটকের কাহিনী। সেই পরিবারে দুই ছেলে এক মেয়ে থাকলেও মূলত বড় ছেলে সফিক ও তার স্ত্রী নীলুই নাটকের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র। সফিক গম্ভীর প্রকৃতির এক মানুষ, পুরো পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর চাপে কিছুটা পর্যুদস্ত। নীলু বুদ্ধিমতী, শান্ত স্বভাবের মেয়ে, পরিবারে নানা অশান্তি থাকা সত্ত্বেও সবকিছু সুন্দরভাবে সামলে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা তার আছে। তাদের একমাত্র সন্তান টুনি, দৈনন্দিন জীবনে নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও প্রতিদিনকার জীবন যুদ্ধে তাদের এগিয়ে যেতে হয়। 

সেই পরিবারেরই ছোট ছেলে রফিক, স্বভাবে সফিকের বিপরীত মেরুর এই রফিকের দায়িত্বজ্ঞানটাও কিছুটা কম। এ কারণেই চাকরি না থাকা সত্ত্বেও হুট করে বিশাল বড়লোকের এক মেয়ে শারমিনকে বিয়ে করে বাড়িতে উপস্থিত হয় রফিক। তবে কিছুটা গম্ভীর সময়ে রফিক চরিত্রটি দমকা হাওয়ার মতোই কাজ করেছে, যখনই সে পর্দায় এসেছে তখন তার সাধারণ সংলাপগুলোও দর্শককে হাসতে বাধ্য করেছে। পরিবারের একমাত্র মেয়ে শাহানা, কিছুটা বোকা প্রকৃতির এই মেয়ের জীবনেও আছে নানা গল্প। পরিবারের বাবা-মা চরিত্র দুটি মুদ্রার দুই ভিন্ন পিঠ, একজন সব বিষয়েই চ্যাঁচামেচি করেই যাচ্ছেন অন্যজন সব বিষয়েই কিছুটা নির্লিপ্ত। এই মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনের গল্পই হচ্ছে এইসব দিনরাত্রি। 

সাদামাটা কাহিনী হলেও মধ্যবিত্ত জীবনের দৈনন্দিন রূপ এইসব দিনরাত্রির আগে কোনো নাটক সম্ভবত তুলে ধরতে পারেনি। ঘরের চার দেয়ালে সুখ-দুঃখের কত কাব্যই তো রচিত হয়, কিন্তু সেগুলো সেলুলয়েডের পর্দায় নিপুণভাবে কয়জন তুলে ধরতে পারেন? সফিককে দেখে বহু মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। চাকরি করার জন্য নিজের পরিবারের সাথে নীলুর যুদ্ধটা যেনো নব্বইয়ের দশকে মেয়েদের সামাজিক অবস্থানটাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বেকার রফিকের কথাগুলো সমাজের অসংখ্য বেকার যুবকের প্রতিধ্বনি। নিজেদের জীবনের ঘটনাগুলোকে এভাবে দেখতে পাওয়ার কারণেই হয়তো এইসব দিনরাত্রিকে সেসময়ের দর্শকরা সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিল। সর্বস্তরে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় এই নাটকটি। বাস্তব জীবনের কাহিনীর সাথে বুলবুল আহমেদ, ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, লুৎফুন্নাহার লতা, দিলারা জামান, কাজী মেহফুজুল হক, অপু, খালেদ খান, আবুল খায়ের, রাইসুল ইসলাম আসাদদের প্রাণবন্ত অভিনয় নাটকের জনপ্রিয়তাকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে যায়।

এইসব দিনরাত্রি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে নাটক চলাকালীন ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে যেতো! অনেকের মতে, বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক হচ্ছে এইসব দিনরাত্রি! শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও এই নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই নাটকের জনপ্রিয়তা হুমায়ূন আহমেদের পুরো জীবনটাকে আক্ষরিক অর্থেই বদলে দিয়েছিল। পাঠকরা এই নাটকের কল্যাণেই হুমায়ূন আহমেদের নামের সাথে পরিচিত হয়, তার বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা শুরু করে। লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য প্রচারের যে সিঁড়িটা হুমায়ূন আহমেদের দরকার ছিল সেই সিঁড়িটা তিনি এইসব দিনরাত্রির মাধ্যমেই পেয়েছিলেন।

তবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও রঙ্গিন টিভি কেনার টাকা হওয়া মাত্র টুনি চরিত্রের মৃত্যুর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ নাটকটি শেষ করে দেন। এইসব দিনরাত্রি এভাবে শেষ হওয়ায় দর্শকরা কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলেন। এমনকি কলকাতা থেকে প্রকাশিত Statesman পত্রিকাতেও এ নিয়ে সংবাদ হয়েছিল। সেখানে লেখা হয়েছিল "আজ রাতে এইসব দিনরাত্রির শেষ পর্ব প্রচার হবে। এরপর আমরা কী দেখব?" তবে শেষটা কিছুটা তাড়াহুড়োর মাধ্যমে হলেও এইসব দিনরাত্রি যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং যেভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছিল তাতে একে বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা ধারাবাহিক নাটক বললেও অত্যুক্তি হবে না।

বহুব্রীহি

ধারাবাহিক নাটকে হুমায়ূন আহমেদের তেমন আগ্রহ না থাকলেও ১৯৮৮ সালে আবারো ধারাবাহিক নাটক রচনায় হাত দেন তিনি। এবারের নাটকে পরিচালক ছিলেন নওয়াজীশ আলী খান। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবার একটি হাসির নাটক বানানো হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরোদস্তুর হাসির নাটকের দুই পর্ব লিখে নিয়ে যান হুমায়ূন আহমেদ, নাম দেন নীরস গল্প। কিন্তু শেষপর্যন্ত নাটকে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে অবশেষে সেই নাটকের নাম দেওয়া হলো বহুব্রীহি। 

এইসব দিনরাত্রির মতো বহুব্রীহির গল্পের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল একটি পরিবার। তবে এইসব দিনরাত্রির পরিবারকে দেখলে সবার নিজের পরিবারের কথা মনে পড়লেও বহুব্রীহি দেখে সেরকমটা মনে হওয়ার অবকাশ লেশমাত্রই ছিল। বহুব্রীহির পরিবারে সমস্ত পুরুষ চরিত্র আধা-পাগল ধরনের, কিন্তু নারীরা সুস্থ ও স্বাভাবিক। 

পরিবারের প্রধান ব্যক্তি সোবহান সাহেব সমাজের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে খুবই চিন্তিত, সমস্যার সমাধান নিয়ে সোবহান সাহেবের বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমেই গল্প এগিয়ে যেতে থাকে। সোবহান সাহেবের পরিবারে স্ত্রী ও দুই কন্যা ছাড়া ফরিদ নামে তার এক শ্যালক রয়েছে, কিছুটা পাগলাটে চরিত্রের ফরিদ মামার হাস্যকর কিছু কাণ্ড গল্পের গতি বাড়িয়েছে। সেই পরিবারের বাইরে ছোট মেয়ে মিলির প্রেমিকের চরিত্রে মনসুর নামের একজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি কিছুটা বোকা ও নার্ভাস প্রকৃতির। এছাড়া সেই বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে দুই সন্তান নিয়ে বিপত্নীক যুবক আনিস এসে উপস্থিত হন, যিনি প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও যুক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ। 

নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আবুল হায়াত, আলী যাকের, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আফজাল আহমেদ, লুৎফুন্নাহার লতা, আফজাল শরীফ প্রমুখ শক্তিমান অভিনেতারা। পুরোদস্তুর হাসির নাটক হলেও সমাজের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বহুব্রীহি নাটকে ছিল। সেসময়ের প্রেক্ষাপটে তুই রাজাকার এর মতো কালজয়ী সংলাপ বহুব্রীহি নাটকেই দেখানো হয়েছিল। আজকালকার যুগে হাসির নাটক দেখলে মনে হয় কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু বহুব্রীহিতে সাধারণ সংলাপ একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমেই খুব স্বাভাবিক হাসির উপলক্ষ্য এনে দিয়েছিল। সবমিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে যতগুলো হাসির ধারাবাহিক প্রচারিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বহুব্রীহি সবার উপরেই থাকবে। 

কোথাও কেউ নেই

বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, কুত্তাওয়ালী জবাব চাই
বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে

উপরের স্লোগানগুলো কোনো রাজনৈতিক নেতার ফাঁসি ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়নি, নাটকের একটা চরিত্রকে বাঁচানোর জন্যে এসব স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছিল। নাটকের একটা চরিত্রের ফাঁসি ঠেকানোর জন্য এসব স্লোগানে একটা দেশ মুখরিত হচ্ছে, নাট্যকারের বাসায় হামলা চালানো হচ্ছে- এরকম অদ্ভুত ঘটনা ইতিহাসে খুব কমই আছে। এমন অভূতপূর্ব ঘটনাই ঘটেছিল কোথাও কেউ নেই  নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটিকে বাঁচানোর জন্য।

যে নাটক নিয়ে একসময় এত তোলপাড় হয়েছিল প্রথমে কিন্তু সেই নাটক নির্মাণের পরিকল্পনাই ছিল না! বরকতউল্লাহর অনুরোধে হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯৩ সালে একটি ধারাবাহিক নাটক লেখার সিদ্ধান্ত নেন। ছায়াসঙ্গী নামের একটা ভৌতিক নাটকের গল্প লিখে হুমায়ূন আহমেদ জমা দেন, কিন্তু যথেষ্ট কারিগরি সহায়তার অভাবে সেই নাটক নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদকে নতুন কোনো ধারাবাহিক লিখতে বলা হয়। তবে আগের গল্প নিয়ে কাজ করতে না পারায় তিনি কিছুটা বিমর্ষ ছিলেন।

নতুন গল্প লেখার পরিবর্তে হুমায়ূন আহমেদ তার আগে প্রকাশিত কোথাও কেউ নেই উপন্যাসটিকে নাটকে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উপন্যাসের কাহিনী অনেকেরই আগে জানা থাকবে বলে বরকতউল্লাহ প্রথমে এই প্রস্তাবে রাজি হতে চাননি। শেষপর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ নিজে দায়িত্ব নেওয়ায় বরকতউল্লাহ রাজি হন। উপন্যাসের কাহিনীর কাঠামো মোটামুটি অপরিবর্তিত রেখে নাট্যরূপ দেওয়া হয়। নাটকের গল্প আবর্তিত হয় মুনা নামক এক তরুণীকে নিয়ে, যিনি ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে মামার সংসারেই মানুষ হয়েছেন। মুনা চরিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফাকে নেওয়া হয়। গল্পের একপর্যায়ে মুনার মামা চুরির মামলায় ফেঁসে জেলে গেলে সেই পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব মুনার কাঁধে আসে। জীবনযুদ্ধে লড়তে থাকা অবস্থায় একে একে সমস্ত আপনজন মুনার জীবন থেকে চলে যেতে থাকে।

সেসময়ে এলাকার বখাটে যুবক বাকের ভাই একমাত্র মানুষ হিসেবে মুনার জীবনে আলো দিতে থাকে। কিন্তু একটা মিথ্যা খুনের মামলায় বাকের ভাইকে জড়ানো হলে মুনার সেই একমাত্র ভরসার প্রদীপটাও নিভে যেতে বসে। বাকের ভাইকে বাঁচানোর জন্য মুনা একাই লড়তে থাকে। নাটকের এই অংশেই অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করে। উপন্যাসে বাকের ভাইর ফাঁসির মাধ্যমেই গল্পের সমাপ্তি ঘটে। নাটকেও এমনটা হবে নাকি এটা জানার জন্য সেসময়ে অসংখ্য মানুষ হুমায়ূন আহমেদকে চিঠি লিখতে শুরু করে! হুমায়ূন আহমেদ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, উপন্যাসের মতো নাটকেও বাকের ভাইয়ের মৃত্যুর মাধ্যমে নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটবে। 

কিন্তু সাধারণ মানুষ কিছুতেই এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিল না। শেষ পর্বের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল জল ততই ঘোলা হচ্ছিল। শেষ পর্ব প্রচারের দিন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে সারাদেশে সভা সমাবেশের আয়োজন করা হয়! অবস্থা বেগতিক দেখে নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ ও নির্দেশক বরকতউল্লাহকে তাদের নিজেদের বাড়ি থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়! সেদিন হুমায়ূন আহমেদের বাড়ির সামনে ককটেল ফাটানোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় আশঙ্কাটি মোটেই অমূলক ছিল না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাকের ভাইয়ের জন্য মানুষ এতটা ব্যাকুল হয়েছিল? এই আবেগের কারণটা ঠিক কী ছিল?

এক্ষেত্রে বলে নেওয়া দরকার, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের মূল কাঠামোটা অপরিবর্তিত রাখলেও বাকের ভাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। উপন্যাসে বাকের ভাই অতটা প্রভাবশালী চরিত্র ছিল না, চরিত্রটির সংলাপও তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু নাটকে বাকের ভাইয়ের চরিত্রটি অনেক বেশি প্রভাবশালী ছিল। যদিও নাটকের মূল গল্প মুনা নামক এক তরুণীর জীবনযুদ্ধ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দর্শকদের কাছে বাকের ভাইয়ের জীবনের গল্পটাই বেশি আকর্ষণীয় লেগেছিল। বাকের ভাই ছিলেন রাস্তার এক বখাটে ছেলে, এলাকার চায়ের দোকানে তার দুই সাগরেদ বদি ও মজনুকে নিয়ে সারাক্ষণ আড্ডা দেওয়াই তার একমাত্র কাজ ছিল। কিন্তু রাস্তার ছেলে হলেও বাকের ভাইয়ের নৈতিকতাবোধ ছিল অন্য অনেকের চেয়ে বেশি। 

এ কারণেই এলাকার একটি বাড়িতে তিনটি মেয়েকে অসৎ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে একথা জেনে বাকিরা চুপ থাকলেও বাকের ভাই চুপ থাকতে পারেন না, বারবার ছুটে এসে প্রতিবাদ করেছেন। এলাকার কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে বাকের ভাই সেখানে ছুটে যান। বাকের ভাইয়ের এই জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল তার সহজ-সরল মন। বাকের ভাই জানেন, তার মতো রাস্তার ছেলেকে মুনা কখনোই ভালোবাসবে না, তা-ও সে নিঃস্বার্থভাবে মুনাকে ভালোবেসে গিয়েছে। সেই ভালোবাসা এতটাই নিঃস্বার্থ যে মুনার প্রেমিক মামুন মুনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, এ খবর শুনে মুনার দুঃখের কথা ভেবে বাকের ভাইয়ের চোখে পানি চলে আসে। বাকের ভাই চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অনবদ্য অভিনয় চরিত্রটাকে এতটাই প্রাণবন্ত করে তুলেছিল যে, বাকের ভাইয়ের ফাঁসি আটকাতে এতকিছু করাকেও তাই অতিরঞ্জিত মনে হয় না। 

এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে মোজাম্মেল হোসেন, লাকী ইনাম, আব্দুল কাদের, লুৎফর রহমান জর্জ, আফসানা মিমি, তমালিকা কর্মকার, হুমায়ূন ফরীদি, আবুল খায়েরদের মতো শক্তিমান অভিনেতারা নাটকের গাঁথুনিকে আরো শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে বাকের ভাইর উকিল চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদির অভিনয় ছিল অনবদ্য। এই সমাজে বিচার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কত মানুষের জীবন বিনা অপরাধে ঝরে যাচ্ছে - এই বার্তাটি কোথাও কেউ নেই বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরতে পেরেছিল। বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে কোথাও কেউ নেই যে সর্বাধিক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই।

নিজেকে সবসময় লেখালেখির জগতের মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই হুমায়ূন আহমেদ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কিন্তু নাট্যজগতে হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা লেখালেখির জগতের তুলনায় খুব একটা কম নয়। হুমায়ূন আহমেদের হঠাৎ প্রস্থান শুধুমাত্র বইমেলাকেই বিবর্ণ করেনি, টেলিভিশনে নাটক দেখার আগ্রহেও বিশাল এক ভাটা নিয়ে এসেছে। সৃষ্টির এই মহান কারিগরের প্রস্থান বাংলাদেশের শিল্পজগতে নিয়ে এসেছে বিশাল এক শূন্যতা। তবে অসময়ে চলে গেলেও হুমায়ূন আহমেদ যেসব অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম রেখে গিয়েছেন, সেসবের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল ধরে। 


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]