বুধবার ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ১ কার্তিক ১৪২৬
 
মতামত
এক নতুন ভারতের উদয়, চলছে আতঙ্কের শাসন
এক নতুন ভারতের উদয়, চলছে আতঙ্কের শাসন





অমিত চৌধুরী
Wednesday, Oct 9, 2019, 12:49 pm
Update: 09.10.2019, 12:50:24 pm
 @palabadalnet

নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার পর চার মাস মাত্র গেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে গত ৪০ বছরের চেয়ে বেশি কিছু ঘটে গেছে এর মধ্যে। আজ যে বিচ্ছিন্নতা অনুভূত হচ্ছে, সেটা এমনকি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থা ও নাগরিক অধিকারবিহীন সময়ে মানুষের যে অসহায়তা ছিল, সেটা এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ট্রমার মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

এর কারণ হলো – বেশি বিশদভাবে না লিখেও বলা যায় যে, নাগরিককে নাগরিকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে: শুধু মুসলিমের বিরুদ্ধে হিন্দুকে নয়, বা কাশ্মিরের বিরুদ্ধে বাকি ভারতকে নয়, বরং বিজেপির নতুন জাতির ধারণাকে যারা গ্রহণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বাকি জাতিকে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে যে একজনের প্রতি অন্যের আর কোন আস্থা নেই।
 
কিভাবে এই চার মাসকে বিচার করা হবে? ধারাবাহিকভাবে এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে যেগুলোর সামনে ২০১৬ সালে মোদির অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ডিমনিটাইজেশানের কর্মসূচি পর্যন্ত ম্লান হয়ে ঢাকা পড়ে গেছে। আগস্ট মাসে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে, যেখানে কাশ্মিরের স্বতন্ত্র ইতিহাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ‘বিশেষ সুবিধা’ দেয়া ছিল। এই ঘোষণার সাথে সাথেই কাশ্মিরের নির্বাচিত নেতাদের গৃহবন্দী করা হয়েছে। এবং আরও হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।

আমরা যেটা দেখছি, সেটা হলো একটা কঠিন ও বিভাজন সৃষ্টিকারী ইস্যুকে স্বজ্ঞানে দূরে সরিয়ে রাখা হলো যাতে এটা নিয়ে আর আলোচনা করতে না হয়। এ রকম একটা ধারণা হচ্ছে যে, এখানে শুধু কাশ্মিরীদের নয়, বরং আমাদের বাকি সবার পরিণতি নিয়ে যেন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া হলো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে, কাশ্মিরে ‘বিধিনিষেধের’ বিষয়টি আমাদের কল্পনা মাত্র। একজন কাশ্মিরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তিনি কিভাবে এই কথার অর্থ করবেন। তিনি বলেছেন যে, যেটা বোঝানো হচ্ছে, সেটা হলো কাশ্মিরে বিক্ষোভ না হওয়ার অর্থ হলো সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে বিক্ষোভ না হওয়াটা একটা অদ্ভুত বিষয়, এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ না হওয়াটা উদ্বেগজনক। ভারতীয়রা তাদের সরকারের মাধ্যমে তাদের উপর কি এই ‘স্বাভাবিক’ অবস্থাকে চাপিয়ে দিতে চায়?

এরপর অন্য দিক থেকেও সমস্যা রয়েছে: সরকার রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে নজিরবিহীন পরিমাণ অর্থ ধার করছে; সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের ভাতা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে; অর্থনীতি ব্যর্থ হচ্ছে আর মোদি বলছেন যে, ভারতের উত্থান হচ্ছে। আমরা একই সাথে বিপরীতমুখী বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি: একটা ‘স্বাভাবিক’ কাশ্মির, একটা অস্বাভাবিক দেশ; একটা দেউলিয়া অর্থনীতি; একটা উদীয়মান ভারত – একটার সাথে আরেকটার কোন মিল নেই।

সরকারের একটি বড় অর্জন কি হতে পারে, এ রকম প্রশ্নের জবাবে কিছু মানুষ হয়তো বলতে পারেন যে, দরিদ্র স্যানিটেশানের দেশে কত বিপুল সংখ্যক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যরা, যাদের নতুন মিডিয়া সম্পর্কে ভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা বলবেন তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো আতঙ্কের একটা পরিবেশ তৈরি করা। ফলে, বিরুদ্ধ মত এখন বিশুদ্ধ রূপ ধারণ করেছে। মানুষকে আগে যেমন বুঝিয়ে মত পরিবর্তন করা হতো, এখন ঠিক তেমনটা নেই। এমনকি অপছন্দনীয় বিষয়গুলোর দিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পর্যায়েও নেই। এখন শুধু এটার প্রদর্শনী করা হচ্ছে যে, এই পরিস্থিতির মধ্যেও বিরুদ্ধ মত পোষণ করা সম্ভব।

ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির বাইরে ভারত আর কখনও এ রকম অবস্থায় ছিল না। এখন যে জনসমর্থন সরকারের রয়েছে, এ রকম সমর্থনধারী সরকারগুলোর আমলে তো একেবারেই সেটা ছিল না। বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেখা যাচ্ছে, সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক, সরকারের পক্ষ নিয়ে আছে এবং উচ্চ-পর্যায়ের যারাই আইন ভাঙছেন, দেখা যাচ্ছে তারা কোন না কোনভাবে বিজেপির চেয়ে ভিন্ন মতের অনুসারী। ‘দেশদ্রোহীতার’ অভিযোগে মামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

বিরোধী মতকে এইভাবে নির্দয় ও সফলভাবে অনুৎসাহিত করাটাকেই কি মোদি ভারতীয় ভোটারদের সামনে ‘আচ্ছে দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন? ভিন্নমত-মুক্ত দেশ হলো ‘স্বাভাবিক’ দেশ; ভিন্নমত-মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তাদের শাসকদের জন্য ‘সুসময়’।

এটা অস্বাভাবিক যে, আমরা আমাদের অতীত থেকে বহুত্ববাদ এবং ভিন্নমতকে ধারণ করার মূল্য এবং প্রয়োজনীয়তাটা শিখতে পারিনি। তার বদলে আমাদের অনেকে নিজেদেরকে উত্তর ভারতের হতাশ ব্রাহ্মণদের মতো নতুনভাবে তুলে ধরছি এবং হিন্দিকে জাতীয় অফিশিয়াল ভাষা করার দাবি করছি। আমরা যেটা না সেটা হতে চাচ্ছি, আমাদের জাতি যেটা হতে পারে না, সেটা করার চেষ্টা করছি। নিজের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতনভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন থাকলেই কেবল আমাদের পক্ষে এখানে আসা সম্ভব। ভিন্নমত-মুক্ত ভারতকে মেনে নেয়ার চেয়ে, আমাদেরকে নিজেদের দিকে তাকানো উচিত: আমাদের ফেলে আসা সফরের কথা স্মরণ করা উচিত, এবং আমাদের পর্যালোচনা করা উচিত, যেখানে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি, সেখানে আমরা দাঁড়াতে চেয়েছিলাম কি না।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

অমিত চৌধুরী: ভারতীয় লেখক



  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]