জাতীয়
করোনাকালে কোনো সরকারি সহায়তা পাননি শ্রমিকরা
করোনাকালে কোনো সরকারি সহায়তা পাননি শ্রমিকরা





সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ, পালাবদল ডটনেট
Thursday, Oct 1, 2020, 11:55 am
 @palabadalnet

ঢাকা: করোনাকালে শ্রমিকরা কোনো ধরণের সরকারি সহায়তা পাননি। 

‘কোভিড-১৯ অভিজ্ঞতা: শ্রমিকদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শিরোনামে এক ওয়েবিনারে এসব তথ্য উঠে আসে।  গতকাল রাতে (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অন্ট্রেপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিইডি)-এর প্রকল্প  ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি)  এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে। 

এতে আরো বলা হয় করোনাকালে ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মে মাসে কম মাছ, মাংস ও ডিম খেয়েছে ৬৯ শতাংশ শ্রমিক। কিন্তু বেশি ডাল খেয়েছেন ৪০ শতাংশ শ্রমিক। এই দুই সময়ে সমপরিমাণ ভাত ও গম জাতীয় খাবার খেয়েছেন ৭৪ শতাংশ শ্রমিক।  

ওয়েবিনারে সম্প্রতি পরিচালিত ‘গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় কোভিড -১৯ এর প্রভাব’ শীর্ষক  জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এবং সেন্টার ফর অন্ট্রেপ্রেণারশিপ ডেভেলপমেন্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি-এর সুবির ও মালিনী চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এর তত্ত্বাবধানে জরিপটি করা হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকেরা কীভাবে অতিমারির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন তা অনুধাবন করার প্রয়াস নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে। 

ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফলগুলো তুলে ধরেন ড. সঞ্চিতা ব্যানার্জি সাক্সেনা, নির্বাহী পরিচালক, ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, এবং পরিচালক, সুবির ও মালিনী চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি।
 
ওয়েবিনারের এ ব্যাপারে প্রধান অতিথি হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান শ্রমিকদের উপজীব্য করে গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ জানান। পোশাক কারখানাগুলো চালু রাখার জন্য শ্রমিকদের কল্যাণের লক্ষ্যে তিনি সরকার গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।  যার মধ্যে রয়েছে পোশাক খাতের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা, ক্রাইসিস কমিটি গঠন, শ্রমিকদের টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহায়তায় শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা গাইড প্রণয়ন ইত্যাদি।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা হয়, ৮২ শতাংশ শ্রমিক (উত্তরদাতা) জানিয়েছেন এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এপ্রিল ও মে মাসে তারা কম উপার্জন করেছেন এবং ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এপ্রিল ও মে মাসে কম সঞ্চয় করেছেন। ৬০ শতাংশ শ্রমিক উত্তর দিয়েছেন যে তারা ওই সময়ে খাবার কেনার জন্য তারা সঞ্চয় করেননি বা সঞ্চয় ব্যবহার করেননি এবং ৯২ শতাংশ বলেছেন মানিয়ে নেবার জন্য তারা তাদের অন্যান্য  খরচ কমিয়ে ফেলেছেন। ৭৭ শতাংশ শ্রমিক (৮০ শতাংশ নারী ও ৭২ শতাংশ পুরুষ) মত দিয়েছেন যে তাদের পক্ষে করোনার সময়ে ঘরের সবার জন্য খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মে মাসে কম মাছ, মাংস ও ডিম খেয়েছে ৬৯ শতাংশ শ্রমিক। কিন্তু বেশি ডাল খেয়েছেন ৪০ শতাংশ শ্রমিক এবং এই দুই সময়ে সমপরিমাণ ভাত ও গম জাতীয় খাবার খেয়েছেন ৭৪ শতাংশ শ্রমিক।
  
তবে করোনাকালীন কীভাবে তারা মানিয়ে নিয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে ৬০ শতাংশ শ্রমিক (৬৫ শতাংশ নারী ও ৫৫ শতাংশ পুরুষ) উত্তর দিয়েছেন যে তারা এই সময়ে খাবার কেনার জন্য সঞ্চয় করেননি বা সঞ্চয় ব্যবহার করেননি। এবং ৯২ শতাংশ (৯০ শতাংশ নারী ও ৯৬ শতাংশ পুরুষ) বলেছেন মানিয়ে নেবার জন্য তারা তাদের খরচ কমিয়ে ফেলেছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের মধ্যে ৯০৬ জন শ্রমিক ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ১৪০ জন শ্রমিক জানিয়েছেন তাদের কারখানা মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হবার পর থেকে শ্রমিক লে অফ (ছাটাই) করছে। উত্তরদাতাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গড়ে ২৩২ জন শ্রমিক লে অফ করা হয়েছিল। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, তারা তাদের কারখানার যেসকল শ্রমিক অতিমারির কারণে কারখানা থেকে লে অফ হয়েছেন অথবা লে অফ হতে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে  চিন্তিত রয়েছেন ।

৮৭ শতাংশ উত্তরদাতার বক্তব্য অনুযায়ী কারখানাগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের জন্য প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম সরবারহ (৯১ শতাংশ), স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করা (৭৭ শতাংশ), উপসর্গ থাকা শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া (৬৬ শতাংশ) এবং শ্রমিকদের মধ্যে দূরত্ব রাখতে উৎসাহিত করা (৭৫ শতাংশ)। যদিও ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করছে কারখানা থেকে তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন যেখানে ২৯ শতাংশ মনে করছেন তাদের নিজ বাসা থেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ নারী ও ৪৫ শতাংশ পুরুষ মনে করেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও তাদের পক্ষে নিজ বাসায় নিজেদের পৃথক রাখা সম্ভব হবে না। ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন অতিমারি চলাকালীন সময়ে তারা কোন ধরণের সরকারি সহায়তা লাভ করেননি। সরকারের থেকে যেসব বিষয়ে সাহায্য পাবার প্রত্যাশা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্থিক সহায়তা (৭০ শতাংশ), স্বাস্থ্য সেবা (৫৮ শতাংশ), চাকরির নিরাপত্তা (৫৩ শতাংশ) এবং খাবার রেশন (৪৫ শতাংশ)।

জরিপটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এর অ্যাসোসিয়েট সাইন্টিস্ট ড. অতনু রাব্বানী শ্রমিকদের থেকে লেঅফ এর তথ্য সংগ্রহের চেয়ে কারখানা থেকে সংগ্রহ করা যথাযথ হবে বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া তিনি জরিপে সংগৃহীত তথ্য ব্যাখ্যার জন্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মন্তব্য করেন, তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলোর জন্মই হয়েছে রফতানি করার জন্য, যার কারণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বেশ মৌলিক। কেননা পোশাক খাতের একটি বড় অংশই রফতানির সাথে জড়িত। ফলে এই খাতকে বিশ্বের অন্য কোনো অংশের তুলনায় ভিন্নভাবে অতিমারির ধাক্কা সামলাতে হবে। তার মতে, এই খাত অতীব শ্রমঘন হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।  

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএর)-এর প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হকের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অনাকাক্সিক্ষত প্রভাবের জন্য ব্র্যান্ডদেরকে দায়িত্ব নিতে হবে। তার মতে, অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী পোশাক কারখানা চালু রাখার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ ইতিমধ্যে পোশাক খাত নিয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান প্রণোদনার উদ্যোগ নেয়ার জন্য। যার ফলে পোশাক শ্রমিকদের বেতন ভাতা ডিজিটাল পেমেন্টের আওতায় পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি এ খাতের বিদ্যমান যে ব্যবধান রয়েছে তা নির্ণয়ে সকল গোষ্ঠীকে এক সাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সমন্বয়ক তাসলিমা আক্তার বলেন, অতিমারি চলাকালীন শ্রমিকদের ঝুঁকি কোনো অংশেই কম নয়। এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যে লেঅফ-এর ভয় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি সরকার ও কারখানার মালিকদের কাছে শ্রমিকদের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ করেন।  

ওয়েবিনারে চেয়ার হিসেবে সিইডি-ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রহিম বি.তালুকদার সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে ওয়েবিনার সমাপ্ত ঘোষণা করেন। ওয়েবিনারটি উপস্থাপনা করেন এমআইবি-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হুসাইন। 

পালাবদল/এসএ


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]