সোমবার ২৭ জানুয়ারি ২০২০ ১৩ মাঘ ১৪২৬
 
প্রতিরক্ষা
রাশিয়ার অস্ত্র কিনছে পাকিস্তান, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় উদ্বিগ্ন ভারত
রাশিয়ার অস্ত্র কিনছে পাকিস্তান, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় উদ্বিগ্ন ভারত





পালাবদল ডেস্ক
Wednesday, Jan 8, 2020, 2:46 pm
 @palabadalnet

দক্ষিণ এশিয়া অস্ত্র বাণিজ্যে চাঙ্গাভাব ভারতের জন্য আঞ্চলিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের উদ্বেগের মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশজুড়ে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ পরিস্থিতি, স্থবির অর্থনীতি, চাঙ্গা হওয়া বিরোধী দলের কারণে দিল্লির নীতি নির্ধারকদের জন্য ২০২০ সাল খুব শুভ হবে না।

এখন পর্যন্ত ভারতের চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ার ক্রমাগত সম্পর্ক বৃদ্ধি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বেশ বিব্রতকর। কিছুদিন পূর্বে রাশিয়া প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমারা পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করে নিয়ে আসার সুযোগে রাশিয়া ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে। পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে দশটি এমআই ৩৫ হেলিকপ্টার কিনতে যাচ্ছে। প্রথম চালান আসার পর আরও ২৪টি হেলিকপ্টার কেনার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। এছাড়া রুশ সেনাবাহিনী দ্বারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি প্রস্তাবও রয়েছে।

এছাড়া পাকিস্তান একটি কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে চাইছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৩০০ বা এস-৪০০ কিনতে চায় চারা। এর সঙ্গে সঙ্গে ট্যাংক ও ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। পাকিস্তানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা মনে করেন, ২০১৯ সালে ভারতের বিরুদ্ধে খণ্ড বিমানযুদ্ধের এসব অস্ত্র কেনা অত্যাবশ্যক। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সামরিক সহযোগিতার একটি চুক্তি স্বাক্ষতি হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও শোনা যাচ্ছে। যদিও পাকিস্তানের এই বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট কার্যত ৭.৮ বিলিয়ন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে এমন বড় চুক্তি করা পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের বোঝা হতে পারে। যদিও উভয় দেশের মধ্যে রুপি-রুবলের একটি চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে ভারত-রাশিয়া চুক্তির মতো। রাশিয়া হয়ত ইসলামাবাদকে আগাম ঋণও দিতে পারে। ইসলামাবাদের জন্য রাশিয়ার অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা ছাড়া বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিলেও পরে তা বন্ধ করে দেয় জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে।

ভারতের জন্য পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দিল্লি-মস্কোর বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ব্রিকস ও এসসিও সম্পর্কিত কর্মকান্ডে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় রুশ প্রবণতা মোদি প্রশাসনের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।

কলকাতাভিত্তিক এক বিশ্লেষকের মতে, গত ৩-৪ বছর ধরে রাশিয়া টুডে চ্যানেলে ভারত নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা খুব হতাশাজনক। বেশিরভাগই নেতিবাচক খবর- ভারতের জনসংখ্যার আধিক্য, ভারতীয় কলগার্লদের কঠিন জীবন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার করুণ অবস্থার প্রতিবেদন দেখেছি আমি।

ষাট ও সত্তর দশকে এমন প্রবণতা কল্পনা করা যেত না। ওই সময় জোট বহির্ভুত আন্দোলন চাঙ্গা ছিল। ক্রুশ্চেভের রাশিয়া বিশ্বের মানচিত্র থেকে পেশাওয়ারকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছিল। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানি শহর থেকে মার্কিন গোয়েন্দা বিমান উড্ডয়ন করেছিল। ইসলামাবাদ আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক মুজাহিদিনদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের জায়গা দিয়ে রাশিয়ার ওই হুমকির জবাব দেয়। এই মুজাহিদিনরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে গেরিলা যুদ্ধ করছিল। ১৯৭৯ সালে দখলের পর রাশিয়া আফগানিস্তান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়, ক্ষয় হয় শক্তি।

মজার বিষয় হলো, এখন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় দেশগুলোর সহযোগিতা চাইতে পারছে না সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য। অতীতের এত বিপরীত আর কিছু হতে পারে না। বেশ কয়েক বাজার জাতিসংঘে পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। হোক তা কাশ্মির বা ইসলামি জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে। সময় কীভাবে সবকিছু বদলে দেয়!

আগেই বলা হয়েছে, এই অবস্থার মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গিদের তাদের মাটিতে নিষ্ক্রিয় করতে পাকিস্তানের অস্বীকৃতি। পাকিস্তানের খারাপ হলে ভারতের জন্যও তা সুখবর নয়। আঞ্চলিক ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে রাশিয়া সুসম্পর্ক রাখে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে মস্কো খুব খুশি নয়। বিশেষ করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি বা কৌশলগত অংশীদারিত্ব কিংবা উভয়দেশের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া। ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাববৃদ্ধি ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নৌবাহিনীর উপস্থিতি রাশিয়ার মাথা ব্যথার কারণ নয়।

আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে পাকিস্তান ব্যর্থ ফড়িয়া রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে খুব ভালো অবস্থানে নেই দেশটি। কয়েক বছর ধরে মিয়ানমার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছে। এই দুই দেশকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছে চীন। কিন্তু চীনের উপহারের বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অদৃশ্য থাকে। সাধারণ শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার বা পাকিস্তানের মতো ছোট দেশের বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে দরকষাকাষির খুব সামান্য সুযোগ থাকে।

মস্কো-ইসলামাবাদের বর্তমান সম্পর্কে খুশি নয় ভারত। অনেক বছর ধরেই রাশিয়া ছিল ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। সোভিয়েত সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে দিল্লি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না কেনার জন্য চাপ দিয়েছেন। ভারত এখন পর্যন্ত অনঢ় রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় প্রতিরক্ষা খাতে একাংশে এ নিয়ে কিছুটা ফাটল ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ সমর্থক বলে পরিচিত এই একাংশ। আরেকটি বিব্রতকর ইস্যু হলো ট্রাম্পের নেতৃত্বের ধরণ। হুট করে যে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করে বসতে পারেন।

রাশিয়া নিশ্চিয়তা দিয়েছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ। তবে এটা স্পষ্ট নয় যে, কূটনৈতিক এই আশ্বাস পাকিস্তানকে নতুন অস্ত্র কেনা থেকে বিরত রাখতে পারবে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মস্কো দিল্লিকে কোনও নিশ্চয়তা দেয়নি।

এই অবস্থায় ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বদলে রাশিয়ার কাছ থেকে মিগ-৩৫ কিনে তাহলে আবার ভারসাম্য ফিরে আসতে পারে। কিন্তু এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারে ভারত। ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের পথে হাঁটতে পারে।

পাকিস্তানের গতি-প্রকৃতিও বোঝা সম্ভব নয়। রাশিয়ার প্রতি পাকিস্তানের নির্ভর হয়ে পড়া সম্পর্কে সচেতন যুক্তরাষ্ট্র। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেবে না। ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরামর্শ ইতোমধ্যেই উঠে এসেছে। যদি এমনটি ঘটে তাহলে জটিল আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিলতর হয়ে পড়বে।- সংবাদমাধ্যম

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]