বুধবার ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ১ কার্তিক ১৪২৬
 
ধর্ম ও জীবন
নাখোদা মসজিদ
নাখোদা মসজিদ





সুজিত আঢ্য
Thursday, Jun 6, 2019, 12:10 am
 @palabadalnet

নাখোদা বা নাখুদা - একটি ফার্সি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হল জাহাজের ক্যাপ্টেন, অধ্যক্ষ বা নাবিক। অথবা যে ব্যক্তি জাহাজ যোগে আমদানি রফতানির কারবার করে থাকেন। 

কলকাতার বুকে এই "নাখোদা মসজিদ" সম্বন্ধে বই পুস্তক ঘেঁটে যে ইতিবৃত্ত পাওয়া যাচ্ছে তা এই রকম - গুজরাট প্রদেশের কচ্ছের একটি ক্ষুদ্র সুন্নি সম্প্রদায় মুসলিম ‘কাচ্ছি মেমন জামাত’। তাদের নেতা আব্দুর রহিম ওসমান ছিলেন পেশায় সমুদ্র বণিক। তিনিই এই মসজিদ তৈরির অর্থ প্রদান করেন। অর্থাৎ এক মল্লার নাও চালানো, তার নামে - অনুকরণে মসজিদটির নামকরণ হয় ‘নাখোদা মসজিদ’। 

কচ্ছের মেমন সম্প্রদায় কলকাতায় পা রাখেন ১৮২০ নাগাদ। তারা বেশির ভাগ জাহাজ, চিনি ও অন্যান্য ব্যবসা সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ প্রতিপত্তিশালী হন। দিনে দিনে তারা এই শহরের শিক্ষা সংস্কৃতি স্থাপত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যে অবদানের সাক্ষী রাখেন তা হলো "নাখোদা মসজিদ"। 

ঐতিহাসিকদের মতে, কলকাতায় মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বসবাস শুরু হয় ১৭৫৬ সালে সিরাজদৌল্লার কলকাতা আক্রমণের পর। পরে কর্নাটকের টিপু সুলতান ও অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ র পরিবার নির্বাসনের নামে বৃটিশ ভারতের রাজধানী এই কলকাতা শহরে ঠাঁই হয়। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জনবসতি। 

কলকাতার রবীন্দ্র সরণি ও মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে দক্ষিণে ৫ মিনিট উজান পথে জাকারিয়া স্ট্রিটের সংযোগ স্থলে এই মসজিদটি। তার আগে অবশ্য এখানেই ছিল রৌশন হাক্কার ও সামসুন্নেসা বেগমের নামে দুটি মসজিদ যা পরবর্তীতে মেমনদের অনুরোধে একটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। ১৯২৬ সালে ১১ই সেপ্টেম্বর নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৪২ নাগাদ। খরচ হয়েছিল ১৫ লক্ষ টাকা যা আজকের দিনে কয়েক কোটি টাকার সামিল। নির্মাতা ম্যাকিনটোস বার্ণ কোম্পানি। বিহারের তোলেপুর থেকে গ্রানাইট পাথর আনা হয়। ইন্দো-সেরাসেনিক পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা কলকাতার সবচেয়ে বড় আকারের মসজিদ এই চিৎপুরের নাখোদা, যা লোকমুখে ‘বঢ়ি মসজিদ’ নামেও বিশেষ পরিচিত। 

মসজিদের মূল ফটক ফতেপুর সিক্রির ‘বুলন্দ দরওয়াজার’ ধাঁচে তৈরি। সেকেন্দ্রায় আকবরের সমাধি ও লালাকেল্লার স্থাপত্য শৈলীও বর্তমান। চারতলা এই মসজিদে রয়েছে ১৫১ ফুট উঁচু ৩টি গম্বুজ ও ২টি স্তম্ভ। সাদা মার্বেল পাথরের মেঝে, ঝাড়বাতি, বেলজিয়াম কাচ, বিশাল নমাজ পড়ার জায়গা, প্রাচীন কাঠের ঘড়ি। সূক্ষ্ম অলংকরণ এবং শৈল্পিক কল্পনার একটি অনন্যসাধারণ নিদর্শন। দেওয়ালের গায়ে যেন ইতিহাস ফিস ফিস করে কথা বলে। একসঙ্গে ১৫ হাজার মানুষ প্রার্থনা করতে পারেন। ২০০৮ সালে রাজ্য সরকার নাখোদা মসজিদকে "হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের" মর্যাদা দিয়েছেন। কলকাতার এই মসজিদ কতটা প্রাচীন তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মত- ভেদ থাকলেও শহরের মুসলিম সমাজের কাছে নাখোদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিৎপুরের প্রতিটি কোণা যেন বাদশাই মেজাজ। 

সাম্প্রতিক অতীতে মুর্শিদাবাদ থেকে দক্ষ কারিগর ও শিল্পী আনিয়ে তাদের রীতিমত ইন্টারভিউ নিয়ে হেরিটেজ স্থাপত্যের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে গত দু বছর ধরে রং ও সংস্কারের কাজ করা হয়েছে।
অতীতে নাখোদা মসজিদ তৈরি ও পরবর্তীতে তার সংস্কারের পিছনে গুজরাটের কচ্ছের মেমন সম্প্রদায়ের যে পরিবারগুলির সর্বাধিক কৃতিত্ব আছে সেই পরিবারেরই উত্তর পুরুষ মহঃ ইকবাল বলেন - নাখোদা মসজিদ কোন একজন ব্যক্তির দ্বারা নির্মিত নয়। বহু পরিবারের মিলিত ঐকান্তিক ইচ্ছা ও ভালোবাসার ফলই হল কলকাতার এই ‘বঢ়ি মসজিদ’ । 

বহু দিন আগে আমার একবার খুব সৌভাগ্য হয়েছিল ওই মসজিদের ভিতরে নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখা। তখন সন্ধ্যার নমাজ পড়ার জন্য সমস্ত চত্বরটা একদম নীরব। আমরাও খুব ধীরে ধীরে সমস্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। নমাজীরা আপন মনে প্রার্থনা করছেন। আমরা নিজেদের মতো করে সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দুটো ছেলে যে এত বড় মসজিদের ভেতরে ঘোরা ফেরা করছে তা কেউ গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না। 

উত্তর কলকাতার মসজিদটি কেন্দ্র করে এখানে এমন কিছু জিনিস কেনাবেচা হয় যা কলকাতার অন্যান্য অঞ্চলে পাওয়া গেলেও এখানকার মতো তেমনটি হয় না। উৎকৃষ্ট আতর, মোগলাই খানা, জামাকাপড়, জর্দা, নকশি করা টুপি, কিংখাব, চুরিদার, কুর্তা পাঞ্জাবী, সেরওয়ানী, বোরখা, লুঙ্গি, হিজাব সব, সব কিছু। এছাড়াও ইসলামী চিকিৎসার বিখ্যাত - ইউনানী ওষুধ। এমনকি বাদ্যযন্ত্রেও এখানে একটি বড় বাজার আছে। খুঁজলে আসল কস্তুরী মৃগ-নাভীর আতরও মিলতে পারে। তবে খুব ভালো ভাবে জানা না থাকলে ঠকে যাবার সম্ভাবনা আছে। 

রমজান বা ঈদের চাঁদের ব্যাপারে নাখোদা মসজিদের ঘোষণাই চরম কথা। মসজিদের উঁচু মিনারের সবুজ আলো জ্বালা- নেভার দ্বারা বোঝানো হয় রমজানের উপবাস শুরু ও শেষ। 

ঈদের সময় কলকাতা যেন থমকে যায় নাখোদার চারপাশে। আলোর ঝলমলানি, চুড়ির টুংটাং শব্দ নতুন পোশাক ও আতরের ম ম করা গন্ধে ভরে ওঠে পুরো জাকারিয়া স্ট্রিট। বিভিন্ন ধরনের কাবাব, নানা রঙের ফিরনি, হালিম, সিমাই রুটি, মিষ্টি, ফালুদা, শুকনো ফল বা খেজুরই তো হরেক রকমের। সামনের "রয়াল ইন্ডিয়ান হোটেলে"র বিখ্যাত বিরিয়ানি ও চিকেন চাপ। খাদ্যরসিকের যেন স্বর্গরাজ্য। ঈদের সময় জাকারিয়া স্ট্রিটে এক ধরনের মাছ ও মাংস ভাজা অন্য এক স্বাদের হদিস দেয়। মাছটি হলো- ‘মাহি আকবরি’ - এটি কাতলা মাছ। আর ভাজা চিকেন - ‘চিকেন চাংজেজি’। আর আছে দই হলুদ মাখনো অবস্থাতেই ওজন করা মাছ বা মাংস। তারপর ভাজা হলে টুকরো টুকরো করে বিক্রি। 

রমজান মাসেই কলকাতার বুকে ঐতিহ্যবাহী মসজিদের নজিরবিহীন একটি সিদ্ধান্তে খুশির বাতাবরণ এনে দিয়েছে মুসলিম সমাজের মধ্যে। বেঙ্গল ইমাম অ্যাসোশিয়েশন লিখিত অনুরোধের ভিত্তিতে ‘নাখোদা মসজিদ’ এবং ‘টিপু সুলতান মসজিদ’ এর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে মহিলাদের জন্য নামাজ পড়ার আলাদা জায়গা ও গোসল - বিশ্রামের ঘরের ব্যবস্থা  করা হয়েছে। ইতিহাসের নিরিখে কলকাতার এই দুই প্রাচীন মসজিদের এহেন আধুনিক ভাবনাচিন্তায় রমজান মাসেই খুশির হাওয়া মুসলিমদের মধ্যে। 

নাখোদা মসজিদ কেবলমাত্র কলকাতার একটি উপাসনা গৃহ নয়, উপরন্তু অসামান্য স্থাপত্য ও শিল্পময়তার পরিপ্রেক্ষিতে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে একান্ত দর্শনীয় স্থানও বটে। খোলা - সকাল ৬ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত। কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। 

ট্রাস্টির সদস্যরা বলেন - নাখোদা মসজিদের সবচেয়ে বড় গর্ব হলো এটা সম্পূর্ণ ভারতীয়দের প্রজন্মবাহিত গৌরব। আর যে রমজান বা ঈদের সময় মসজিদের ওপর চাঁদ নেমে আসে সে চাঁদ বিশেষ কোন ধর্মের বা সম্প্রদায়ের নয়। সে চাঁদ ভারতের সকল মানুষের, নাখোদা স্মরণ করায় সে কথা । ওই চাঁদ সকলের জানে নাখোদা মসজিদ।। 

সুজিত আঢ্য: সদস্য, পুরনো কলকাতার গল্প 



  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]