মতামত
কেবল ইচ্ছাকৃত অন্ধরাই বলবে যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না
কেবল ইচ্ছাকৃত অন্ধরাই বলবে যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না





শরৎ প্রধান
Thursday, Oct 1, 2020, 3:25 pm
 @palabadalnet

আশির দশকের শুরু থেকে যে ব্যক্তি অযোধ্যার ঘটনাপ্রবাহের উপর নজর রেখে আসছে এবং ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর কালো রোববারে যে অযোধ্যাতে উপস্থিত ছিল, তার পক্ষে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশানের বিশেষ আদালতের রায় মেনে নেয়াটা খুবই কঠিন। ষোড়শ শতকের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে যে ৩২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদেরকে খালাস দিয়ে দিয়েছে আদালত। 

একমাত্র ইচ্ছাকৃত অন্ধ ব্যক্তির পক্ষেই এটা বিশ্বাস করা সম্ভব যে, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না এবং হঠাৎ করেই অসামাজিক একদল উত্তেজিত জনতার ক্ষোভ উসকে উঠার কারণে এই ঘটনা ঘটেছিল, যারা কর সেবকদের ছদ্মবেশে প্রাচীন এই মন্দিরের শহরে ঢুকে পড়েছিল। আর একমাত্র স্বেচ্ছা-বধির কোন ব্যক্তির পক্ষেই আদালতের এই তত্ত্ব মেনে নেয়া সম্ভব যে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ভারতীয় জনতা পার্টি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা আসলে মসজিদ রক্ষার চেষ্টা করেছিল, এবং তারা কোন উসকানি দেয়নি। 

আমার মতো যারা সেদিনের ঘটনাকে কাছ থেকে দেখেছে এবং বিশেষ আদালতের বিচারে প্রধান সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাদের পক্ষে এই সব সাজানো মিথ্যা হজম করাটা অসম্ভব। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সে সময় রায়বারেলি ও লাক্ষ্ণৌর দুটো বিশেষ আদালতে ১৪ দিন ধরে যে সাক্ষ্য দেয়া ও সেগুলো পুনর্যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলাম আমি, সেগুলো সবই ছিল ব্যর্থ প্রচেষ্টা। আমার মতো আরও বহু সাক্ষীর হয়তো একই রকম অনুভূতি হচ্ছে। 

বিজেপি আর ভিএইচপি’র শীর্ষ নেতারা যেখানে বসা ছিলেন, সেখান থেকেই জনতার উদ্দেশে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, এবং নেতারা সেখানে বসে বাবরি মসজিদের পরিণতি দেখছিলেন। সেই শব্দগুলো এখনও আমার কানে বাজে। এটা আমার কাছে সম্পূর্ণ পরিস্কার ছিল যে, সেখান থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ মসজিদ ধ্বংসের জন্য উসকানি দিয়েছিল। 

“ইয়ে ধানচা (পড়ুন বাবরি মসজিদ) আব গিরনে ওয়ালা হ্যায়; আপ লোগো সে অনুরোধ হ্যায় কি গম্বুজ সে নিচে উতার আয়ে” মসজিদের বিপরীত দিকে তৈরি পিএ সিস্টেম থেকে এই কথাগুলো বারবার ঘোষণা দেয়া হচ্ছিল। এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, উমা ভারতী এবং তাদের মতো নেতারা সেখানে সাজানো চেয়ারে বসে এই দৃশ্য দেখছিলেন। 

মাইক্রোফোনে উসকানিমূলক শ্লোগানই দেয়া হচ্ছিল বেশি। তবে গম্বুজের নিচ থেকে সরে আসার এই ঘোষণাটা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় বারবার দেয়া হচ্ছিল, যাতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা কর সেবকরা সেটা বুঝতে পারে। 

এই ঘোষণাকে মসজিদ রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাটা পুরোপুরি অসম্ভব। এরপরও বিশেষ আদালতের বিচারে সেই অসম্ভবটাকেই সম্ভব করা হয়েছে। এটা শতভাগ পরিস্কার যে, যারা জানতো যে মসজিদ ধ্বংস হতে যাচ্ছে, তাদের পক্ষেই কেবল এই ঘোষণা দেয়া সম্ভব। 

যারা প্রতি মিনিটের ঘটনার উপর চোখ রেখেছিল, তারা দেখেছে যে, যথেষ্ট প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে এই ধ্বংসের প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল, যারা সঙ্ঘবদ্ধভাবে সেটা করেছিল। আমি নিজে দেখেছি, এবং আদালতে সেটা বলাও হয়েছে যে, একদল লোক প্রায় আড়াই ফুট পুরু দেয়ালের দুইপাশে ধারালো লোহার অস্ত্র দিয়ে গর্ত করে করে দেয়ালের পুরুত্ব এক ফুটে নামিয়ে আনে। এরপর দেয়ালে ফুটে করে সেখানে দড়ি ঢুকিয়ে কর সেবকদের দড়ির দুই প্রান্ত ধরে টানতে বলা হয়। পাতলা করে ফেলা দেয়াল তখন সহজেই ভেঙে যায় এবং গম্বুজগুলো একে একে প্রচন্ড শব্দে ধসে পড়ে। 

দেশের প্রধান তদন্ত সংস্থা – সিবিআই যত তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, সেগুলোর সবকিছুকেই অপর্যাপ্ত ও দুর্বল মনে হয়েছে আদালতের। আর সেটার ভিত্তিতেই কাউকে দোষি সাব্যস্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। বিজেপির শীর্ষ নেতা এবং ভিএইচপি ও অন্যান্য কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন থেকে আসা তাদের সহযোগীদেরকে আনন্দের সাথে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, কারণ সিবিআই যে সব ভিডিও ও অডিও ক্লিপগুলোকে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সেগুলোকে আদালত সাজানো আখ্যা দিয়েছে। 

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার শেষে ৩২ জন জীবন্ত অভিযুক্তের প্রত্যেককে নির্দোষ গণ্য করেছে আদালত। ২৮ বছরের মধ্যে অভিযুক্ত অন্য ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

অবাক ব্যাপার হলো বিশেষ আদালতের বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার যাদব এমনকি সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের মন্তব্যকে পর্যন্ত বিবেচনায় নেননি, যে বেঞ্চ ২০১৯ সালের নভেম্বরে বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত মসজিদ ধ্বংসের বিষয়টিকে ‘পরিকল্পিত কাজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেল, যার অর্থ হলো এর পেছনে নিঃসন্দেহে একটা ষড়যন্ত্র ছিল। 

ভারতের তৎকালিন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগৈর নেতৃত্বাধীন এই বেঞ্চ সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিল, “জনগণের প্রার্থনার একটি জায়গাকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মসজিদের পুরো কাঠামো ভেঙ্গে দেয়া হয়”। এতে আরও বলা হয়, “৪৫০ বছরের বেশি আগে যে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল, সেই মসজিদে প্রার্থনা করার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে”।

মসজিদ ধ্বংসের পরপরই তৎকালিন পি ভি নরসীমা রাওয়ের সরকার যে বিচারপতি লিবারহান কমিশন গঠন করেছিলেন, সেই কমিশনের রিপোর্টেও একই ধরনের মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। ১৭ বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিচারপতি এম এস লিবারহান বলেছিলেন, “এই ধ্বংসের বিষয়টি ছিল পরিকল্পিত”।

কিন্তু বিচারপতি যাদবের নেতৃত্বাধীন বিশেষ আদালতের কাছে এর কোনটাই যেন গুরুত্ব বহন করেনি। সুপ্রিম কোর্টের দয়ায় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরির মেয়াদ শেষের পরও দুই দফা তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। যুক্তি ছিল মামলার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। এটা সম্ভবত একটা কাকতালীয় ব্যাপার যে, ২০১৯ সালের নভেম্বরে মন্দিরের ব্যাপারে রায় দেয়ার পরই অবসরে যান তৎকালীন প্রধান বিচারতি রঞ্জন গোগৈ। 

আজকের রায়কে যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে যে, অন্য যে কোন অপরাধের বিপরীতে, এই ধ্বংসের কাজটা কোনভাবেই সাজানো ছিল না, বা অবহেলাও ছিল না। কিন্তু মসজিদটি ঠিকই মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। 

সূত্র: দ্য ওয়্যার

শরৎ প্রধান: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]