বুধবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ৭ ফাল্গুন ১৪২৬
 
শিল্প-সাহিত্য
নেপোলি‌য়ন বলেছিলেন, অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে একটা জীবন কাটে না
নেপোলি‌য়ন বলেছিলেন, অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে একটা জীবন কাটে না





পীতম সেনগুপ্ত
Tuesday, Feb 11, 2020, 12:51 am
 @palabadalnet

‘পড়িতেছিলাম গ্রন্থ বসিয়া একেলা
সঙ্গীহীন প্রবাসের শূন্য সন্ধ্যাবেলা.‌.‌.‌’‌

১৩০২ সনের অঘ্রান মাসের দশ তারিখে শিলাইদহ বাসকালে রবীন্দ্রনাথ ‘পূর্ণিমা’ নামে এই কবিতাটিতে একজন পাঠকের পূর্ণাঙ্গ ছবি তুলে ধরেছেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ওই সময়ে অর্থাৎ ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ এডওয়ার্ড ডাউডেনের লেখা ‘নিউ স্টাডিস ইন লিটারেচার’ বইটি পড়ছিলেন। সৌন্দর্যের তত্ত্ব জানার আগ্রহেই চৌত্রিশ বছরের কবির হাতে এই বইটি তুলে নেওয়া। বই লিখিয়ে রবীন্দ্রনাথ বই পড়ুয়া হিসেবে কেমন ছিলেন, এ প্রশ্নের উত্তরে কবিকে দীর্ঘ তিরিশ বছর কাছ থেকে দেখার এবং শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারে থাকার সুবাদে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপ্যাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি বড় পড়ুয়া ছিলেন। যখন যেখানে যেতেন তার সঙ্গে থাকত নানা ধরনের বই। ছিন্নপত্রাবলীতে এই বই পড়া প্রসঙ্গে অসংখ্য মন্তব্য দেখা যায়। বাংলা ছাড়া সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষার বই–সহ হিন্দি, মৈথিলি, অসমিয়া ভাষায় তার বই পড়ার কথা জানা যায়। রবীন্দ্রনাথের পাঠের জগৎটি এতই বিস্তৃত যে, সাহিত্য থেকে ইতিহাস, দর্শন, জীবনী, ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, চিকিৎসাশাস্ত্র, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাষাতত্ত্ব, সমবায় তত্ত্ব, আহার— সবেতেই তিনি স্বচ্ছন্দ পাঠক ছিলেন। তিনি বই পড়ার সময় পেনসিল এবং কখনও কখনও কলম রাখতেন। পাতার মার্জিনে নোটও রাখতেন। 

ছেলেবেলায় বই পড়ার অভ্যাসের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ছেলেবেলায় একধার হইতে বই পড়িয়া যাইতাম, যাহা বুঝিতাম এবং যাহা বুঝিতাম না, দুই–ই আমাদের মনের উপর কাজ করিয়া যাইত।’

শুধু তো রবীন্দ্রনাথ নন, সেই সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র থেকে শিবনাথ শাস্ত্রী-সকলেই ছিলেন বইপোকা। জীবনের শেষ চোদ্দোটি বছর কলকাতার বাদুড়বাগানে নিজের বাড়িতে বিদ্যাসাগর কাটিয়েছিলেন শুধুমাত্র গ্রন্থপাঠ, গ্রন্থসংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য। শোনা যায়, তার সংগ্রহে ষোলো হাজারেরও বেশি বই ছিল, যা কিনা ভাড়াবাড়িতে রাখা সম্ভব ছিল না। বাড়িটির দোতলার পশ্চিমের ঘরে বিদ্যাসাগর একটি আরামকেদারায় পা এলিয়ে বসে বই পড়তেন। বইগুলি সুন্দর করে চামড়া দিয়ে বাঁধানো ছিল। বইয়ের আলমারির প্রতিটি তাক ভেলভেট কাপড় দিয়ে মোড়া থাকত। বইয়ের প্রতি তার অসম্ভব ভালবাসা ছিল। তাই তিনি শেষ জীবনে নিজে বাড়ি বানিয়েছিলেন বইয়ের যত্ন নেবেন বলে। নেপোলি‌য়ন বোধহয় এই কারণেই বলেছিলেন, অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে জীবন অচল।

রবীন্দ্রনাথ বা বিদ্যাসাগরের মতো পাঠকের খোঁজ করলে দেশে–বিদেশে অনেকই মিলবে।

শোনা যায়, আব্রাহাম লিঙ্কনের পড়ার নেশা ছিল সাঙ্ঘাতিক। যখন যেখানে সুযোগ পেতেন, বই পড়তে লেগে যেতেন। তার প্রিয় বইগুলির মধ্যে উল্লেখ করা যায় রবিনসন ক্রুশো, পিলগ্রিম’স প্রোগ্রেস, ইশপ’‌স ফেব্‌ল–এর নাম। ঐতিহাসিকদের মতে, রুজভেল্টও একজন পাক্কা পড়ুয়া ছিলেন। অমন মেলা ভার। রাজনীতির পাশাপাশি বই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। ১৯১৬ সালে নিজেই এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ লিখেছিলেন, বুক লাভার’স হলিডেস ইন দ্য ওপেন‌। বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ এবং বই পড়ে তিনি কেমন উপকৃত হয়েছিলেন সবই বিধৃত আছে এই বইয়ে। অবসর পেলেই ম্যাকবেথ থেকে টুয়েলফথ নাইট যেমন পড়তেন, তেমনই টম স্যায়ের থেকে দ্য পিকউইক পেপারস -ও তিনি গোগ্রাসে গিলতেন। 

এমনই আরেক বইপড়ুয়া রাজনীতিক ছিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। নিজেই কবুল করেছেন বিশ্ব সাহিত্য পাঠ করে তার রাজনীতি ক্ষুরধার যেমন হয়েছিল, তেমনই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও সাহায্য করেছিল। নিজে লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, মত বিনিময় করতেন। তার প্রিয় গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ করা যায় দ্য টাইম মেশিন, এক্সোডাস, গন উইথ দ্য উইন্ড, নাইন্টিন এইট্টি-ফোর নামগুলি। 

রাজনীতির মঞ্চ পেরিয়ে বিজ্ঞানের জগতে ঢুঁ মারলে সবার আগে যে নামটির কথা স্মরণে আসে তিনি স্বনামখ্যাত আইনস্টাইন। বিজ্ঞানের বই ব্যতিরেকে তাকে অন্য গ্রন্থপাঠেও দেখা গেছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তেমন চোখে না পড়লেও পৃথিবী বিখ্যাত বাস্কেটবল খেলোয়াড় লেব্রন জেমস মাঠের বাইরে বলের পরিবর্তে বই হাতেই বেশি পরিচিত ছিলেন। নিজে বই শুধু পড়েই ক্ষান্ত হননি, সহ–খেলোয়াড়দেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন পড়ার জন্য। 

পৃথিবীর দ্বিতীয় ধনী বিল গেটসও বই পড়ায় পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি তার একটি ব্লগে তিনি লিখছেন, ‘নিজের পছন্দের নতুন কোনও বিষয়ে জানতে গেলে বই হচ্ছে সেরা উপায়’। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বইয়ে মুখ গুঁজে রাখার আরেকটি নাম কনিষ্ঠতম নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার একটি সাক্ষাৎকারে মালালা বলেছে সে সমকালীন লেখকদের লেখা বই পড়েই বেশি আনন্দ পায়। খালেদ হোসেইনি বা ডেবোরা এলিস তার প্রিয় লেখক। 

ব্যক্তিগত পড়ার ক্ষেত্র ছেড়ে যদি উঁকি মারা যায় জাতিগতভাবে বই পড়ার অভ্যাসের দিকে তবে ফিনল্যান্ড বা রাশিয়া বাজিমাত করে সবার ওপরে ঠাঁই নিয়ে নেবে। 

একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় জানা গেছে, পৃথিবীর মধ্যে রাশিয়ায় বই পড়ুয়ার শতকরা হার সবচেয়ে বেশি। পড়ুয়া হিসেবে রুশদের খুবই সুনাম আছে। আসলে রুশরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে লেখক এবং পাঠকদের জন্য রাশিয়ার এত সুনাম। কত যে নামীদামি লেখক রাশিয়ার মাটিতে জন্মেছেন তা চেকভ থেকে তলস্তয়; দস্তয়ভস্কি থেকে গোর্কি, কিংবা পুশকিন থেকে পস্তারনাক, কত যে নাম আছে সেই তালিকায়। স্থানীয় কিংবদন্তিই বলে, ‘বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পড়ুয়া রয়েছে রাশিয়াতে।’‌

ধরা যাক, রাশিয়ার কোনো একটি শহর থেকে আরেকটি শহরে সফর করা হচ্ছে হয় ট্রেনে, নয়তো বাসে যেদিকেই তাকানো যায়, দেখা যায় শতকরা নব্বই জন যাত্রীর হাতেই বই। তারা নিবিড় মনে পড়তে পড়তে চলেছেন। কেউ কারও দিকে ফিরেও দেখছেন না, সকলেই বুঁদ হয়ে আছেন বইয়ের পাতায়। শান্ত, সৌম্য একটা পরিবেশে কখন যে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না। শুধু তো যাত্রী পরিবহণে নয়, পথেঘাটে রুশ ছেলেমেয়েদের হাতে বই ছাড়া অন্য কিছু সচরাচর চোখেই পড়বে না। এমন কী হাতের মোবাইল ফোন বা ট্যাব ব্যবহারের পরই তা পরিণত হয়ে যায় কোনো বইয়ের পাতায়। 

বছর দশেক আগের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে এখানকার ৫৪ শতাংশ মানুষ বই পড়েন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। এদের মধ্যে শতকরা ৪০ জন মানুষ নিয়মিত বই কেনেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপারটি হলো এখানকার শতকরা ৭০টি পরিবারে ব্যক্তিগত পাঠাগার আছে। যদিও অল্পবয়সি আধুনিক ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বই সংগ্রহ করে থাকেন। সমীক্ষাটি এও জানাচ্ছে যে পৃথিবীর বড় ও সেরা দশটি লাইব্রেরির দুটোই হলো রাশিয়ায়। একটি মস্কোর রাশিয়ান স্টেট লাইব্রেরি আর অন্যটি সেন্ট পিটার্সবার্গের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ রাশিয়া।

গত ২০০৭ সালকে রুশ সরকার সেদেশে ‘অধ্যয়নবর্ষ’ ঘোষণা করেছিল। হিসাব বলে সেই বছরে বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বই বিক্রি ও বইপাঠও সর্বকালীন রেকর্ডমাত্রা ছাপিয়ে গিয়েছিল। এদেশে যেমন প্রতি বারো বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভমেলা হয়, তেমন রাশিয়ার মানুষেরা প্রতি বারো বছর অন্তর একটি করে ‘অধ্যয়নবর্ষ’ চায়। প্রতি বারো বছরের মধ্যে একটি বছরকে রুশরা বইয়ের জন্য উৎসর্গ করতে আগ্রহী। এরা পড়াকে জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিয়েছে। পড়ার জন্য আলাদা কোনও সময় কিংবা পড়ার কোনও আলাদা স্থান থাকতে পারে এমনটি ওরা বিশ্বাস করেন না। রুশরা জানেন এবং ভাবেনও যে পড়ার সময় সবসময়ই হতে পারে। সব জায়গাতেও পড়া যেতে পারে। তা বাড়িতে হোক, পার্কে হোক, ট্রেনে, বাসে, রেস্তোরাঁয়, প্লেনে যেখানেই হোক না কেন। 

সেই সমীক্ষাতেই জানা যায় রুশরা কী ধরনের বই পড়েন! দেখা গেছে, গল্প–উপন্যাস ছাড়াও খেলাধুলা, বিজ্ঞান, দর্শন, জাদু, ফ্যাশনের পাশাপাশি শরীরচর্চা, লাইফস্টাইল, এসব বইয়ের পাঠকও এখানে যথেষ্ট। দেখা গেছে, যাঁরা পেশাদার কর্মজীবী, তাদের নিজেদের কাজে আরও বেশি পারদর্শিতার জন্য পেশাদারি বইপত্তর পড়ে থাকেন। 

একটি সমীক্ষায় প্রতি সপ্তাহে জনপ্রতি বই পড়ার মোট সময় বিচার করে দেখা গেছে পৃথিবীর মধ্যে ভারতীয়রা ১০:৪২ ঘণ্টা বই পড়ায় ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় স্থানে থাইল্যান্ড ৯:২৪ ঘণ্টা, এবং তৃতীয় চীন, ঘণ্টার হিসেবে  ৮:০০। ঘন ঘন বই পড়ার সমীক্ষা থেকে জানা যায়, প্রতিদিন বই পড়ে বেশি চীন (৩৬%), স্পেন ও বৃটেন (৩২%), ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৩০%), রাশিয়া ও কানাডা (২৯%)। ঘরপ্রতি বইয়ের সংখ্যার সমীক্ষায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় ঘরপ্রতি বই ১৪৮টি, এস্তোনিয়ায় তা ২১৮টি, নরওয়েতে ২১০টি, চেক প্রজাতন্ত্রে ২০৪টি। 

বেশ কিছুদিন আগে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, মানুষ যে ধরনের বই পড়ে থাকে, তা সেই মানুষটির জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। রোজকার নানা কাজকর্মে তার প্রভাবও দেখা যায়। এমনকী তাদের লেখার শৈলীও প্রভাবিত হয়। এই সমীক্ষা বলছে একটি ভাল মানের লেখা বই মানুষের সহানুভূতিশীলতা এবং চিন্তাশীলতাকে স্পষ্ট করে গড়ে তোলে শুধু নয়, নির্দিষ্ট করে ভাবতেও শেখায়। অবাক করার বিষয় এই যে ভাবাতে শেখানোর জন্য গল্পের থেকে কবিতার গুরুত্ব অনেক বেশি।

গ্রেট বৃটেনের ৯১ বছর বয়সি লুইজ ব্রাউনকে পৃথিবীর সেরা বই পড়ুয়াদের একজন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার কাছ থেকে জানা গেছে যে, এক বা দুই হাজার নয়, কম করে তিনি ২৫ হাজার বই পড়েছেন। এই বই তিনি গ্রন্থাগার থেকে নিয়েই পড়েছেন। এটা গ্রন্থাগার থেকে নেওয়া বইয়ের হিসাব। এর বাইরেও তিনি আরও বই পড়েছেন, সেগুলোর হিসেব রাখা সম্ভব হয়নি। লুইজের যখন বছর পাঁচ বয়স, তখন তার বাবা–মা তার হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি পড়ে চলেছেন। লুইজ কবুল করেছেন যে, ছয় যুগ ধরে গড়ে প্রতি ছয়দিনে ছয়টি বই পড়েছেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অভ্যাস পাল্টে গেছে। এখন প্রতি সাতদিনে তিনি ১২টি বই পাঠ করেন। পারিবারিক কাহিনি এবং ঐতিহাসিক বই তার পড়তে বেশি ভাল লাগে। এর সঙ্গে হালকা মেজাজের, এবং নানান যুদ্ধের ওপর লেখা বইও তার প্রিয়। এত বই পড়ার পরও নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন। টেলিভিশন দেখেন।

ভারতের  প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের বিলাসিতা বলতে ছিল কয়েক হাজার বই। তিনি বইয়ের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের আত্মাকে। 

এক নেশাখোর বই পড়ুয়া হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারেন বাফে। পৃথিবী বিখ্যাত এই ধনী ব্যবসায়ী অবসর সময়ের ৮০ ভাগই ব্যয় করেন বই পড়ে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দিনের পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তার বই পড়ার পিছনেই কেটে যায়। ছোটদের উদ্দেশে একবার বলেছেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৫০০ পৃষ্ঠা পড়ো। জ্ঞান হলো চক্রবৃদ্ধি সুদের মতো। যত পড়বে তত বাড়বে।’

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে যে গড়পড়তা এক একজন মানুষ মিনিটে ২০০ থেকে ৩০০টি শব্দ পড়ার ক্ষমতা রাখেন। এদের থেকে দ্রুততর পাঠকও আছেন। তারা শব্দের ওপর জোর না দিয়ে কী বিষয় নিয়ে পড়েছেন সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বিশ্ব দ্রুততর পড়া প্রতিযোগিতায় সেরারা মিনিটে ১০০০ থেকে ২০০০ শব্দ পড়ার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন। এদের মধ্যে হাওয়ার্ড বার্গ সবচেয়ে দ্রুত পাঠ করে সেরা নির্বাচিত হন। গিনেস বুক বলছে হাওয়ার্ড বার্গ ১৯৯০ সালে ২৫ হাজারেরও বেশি বই পড়েছিলেন। 

তাড়াতাড়ি বই পড়া নিশ্চয়ই আর্টের মধ্যে পড়ে। এ ব্যাপারে আবার শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের। একবার নিত্যানন্দ-বিনোদ গোস্বামী কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখেন তিনি একখানা বই নিয়ে নিবিষ্ট মনে পড়ছেন। এও দেখলেন যে কবির ডান পাশে একগাদা মোটা মোটা বই টেবিলের ওপর সাজানো আছে। সম্ভবত বইগুলি তার পড়ার অপেক্ষায় টেবিলে সাজানো। নিত্যানন্দ-বিনোদ গোঁসাইজিকে দেখতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ পাঠরত বইটিকে সরিয়ে রাখতেই গোঁসাইজি কবিকে ‘পরে আসবেন’ বলে চলে গেলেন। ঘণ্টা দেড়েক পর নিত্যানন্দ-বিনোদবাবু ফের এলেন কবির কাছে। এসে দেখলেন ডানদিকের সাজানো মোটা মোটা বইগুলো সব বাঁদিকের টেবিলে জড়ো হয়েছে। সত্যিই খুবই বিস্মিত হওয়ার ঘটনা। নিত্যানন্দ-বিনোদবাবু বিস্মিত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেই বসলেন, ‘বইগুলো কি আপনার পড়া হয়ে গেল?’ রবীন্দ্রনাথ মাথা নেড়ে জানালেন, ‘হ্যাঁ।’ এবার নিত্যানন্দ গোঁসাইয়ের পুরো ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সবগুলো বই-ই পড়লেন?’ এবারে রবীন্দ্রনাথ স্মিত হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, সবগুলোই।’ কবির কাছ থেকে উত্তর পেয়ে গোঁসাই ইতস্তত করতে করতে ফের বললেন, ‘এত অল্পসময়ে এতগুলো বই আগাগোড়া পড়ে শেষ করলেন?’ 

রবীন্দ্রনাথ গোঁসাইয়ের কৌতূহল এবং বিস্ময় কাটানোর জন্য মৃদু হেসে বললেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি তোমার! ভাবছ রবি ঠাকুর ভেলকিবাজি বা জাদুবিদ্যা জানে নিশ্চয়ই।’ সঙ্গে জুড়লেন আরও, ‘বিদ্যা একটা আছে বটে, তবে কারও কাছে ফাঁস করে না দিলে তোমাকে চুপি চুপি বলতে পারি, সে জাদুবিদ্যা নয়।’ এরপর সুন্দর করে ব্যাখ্যা করে বোঝালেন গোঁসাইকে, ‘ছোট শিশু যখন ‘অ’, ‘আ’ শিখতে শুরু করে, তখন প্রতিটি অক্ষর তাকে আলাদা করে পড়তে হয় এবং তাতেই তার কত সময় লাগে। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞ দৃষ্টি, জ্ঞান, ও বোধশক্তি বাড়লে ক্রমশ ‘অক্ষর’ ডিঙিয়ে একেবারে গোটা শব্দ এবং ‘শব্দ’ ডিঙিয়ে এক এক ‘ছত্র’ একসঙ্গে পড়তে পারে। পাঠের গতিও হয় দ্রুততর।’ রবীন্দ্রনাথ এরপর বলেছিলেন, এমনভাবেই এগিয়ে চলতে পারলে কোনও কোনও বইয়ের একসঙ্গে এক পাতা, এমনকী পুরো এক এক অধ্যায়ের ওপরে চোখ বুলিয়ে গেলেও তার সারবস্তু সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য নয়। সব বই যে খুঁটিয়ে পড়ার মতো মনকে টানে তাও তো নয়।‌‌‌‌‌‌

 পীতম সেনগুপ্ত: কলকাতার লেখক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]