শনিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
মতামত
মহারাষ্ট্র বিশৃঙ্খলার শিক্ষা: হিন্দুত্ববাদ অজেয় নয়
মহারাষ্ট্র বিশৃঙ্খলার শিক্ষা: হিন্দুত্ববাদ অজেয় নয়





পি কে বালাচন্দ্রন
Thursday, Nov 14, 2019, 12:25 am
 @palabadalnet

ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের পরে সরকার গঠন নিয়ে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে চারটি বিষয় উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে। মূলত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যাতে এ সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, সেজন্যেই এটা করা হয়েছে। কিন্তু এতে রাজ্যের রাজনীতির চেহারা বদলাচ্ছে না যেটা পরবর্তী প্যারাগুলোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রথম শিক্ষা হলো ক্যারিশম্যাটিক মাস্কট নরেন্দ্র মোদি এবং ‘চানক্য’ অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অজেয় কোন রাজনৈতিক শক্তি নয়, যদিও তারা মহারাষ্ট্রের মতো ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজ্যে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো হিন্দুত্ববাদ একেবারে একাট্টা কোন ক্যাম্প নয়, যেমনটা এর সমর্থকরা দাবি করে থাকে। অন্যান্য আদর্শিক ও সেক্যুলার গ্রুপগুলোর মধ্যে যেমন বিভাজন রয়েছে, ‘সঙ্ঘ পরিবারের’ মধ্যেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তেমনটাই তিক্ত ও প্রকট হতে পারে।

তৃতীয় শিক্ষনীয় হলো কট্টর আদর্শিক বিভাজন ভারতীয় রাজনীতির কোন চিহ্ন নয়, বরং একটা নমনীয় ও পরিবর্তনযোগ্য পরিচয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলো নিজেদেরকে বামপন্থী বা উদারপন্থী, সেক্যুলার বা ধর্মীয়, হিন্দুত্ববাদী বা অ-হিন্দুত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আদর্শিকভাবে তারা আসলে ততটা দৃঢ় নয় এবং সময়ের স্রোতের সাথে তাদের তাল মেলানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

রাম জন্মভূমি ও কাশ্মির বা পাকিস্তানের মতো বহু জটিল ইস্যুতে সেক্যুলার কংগ্রেস আর হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মধ্যে বিভাজনটা খুবই সামান্য। বাস্তবতা হলো সেই ত্রিশের দশক থেকেই কংগ্রেস হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে সুক্ষ্মভাবে খেলে এসেছে এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পেছনে এটা একটা বড় কারণ। স্বাধীনতার পর, নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজিব গান্ধীও ‘কোমল হিন্দুত্ববাদ’কে বেছে বিভিন্ন মাত্রায় বেছে নিয়েছেন যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সাথে সেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে ‘কোমল হিন্দুত্ববাদে’ আর কাজ হয়নি, কারণ জনগণ আসল জিনিস – বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদকে বেছে নিয়েছে।

চতুর্থ শিক্ষা হলো ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা অর্জন ও সেখানে টিকে থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়, আদর্শিক প্রতিশ্রুতিকে নয়। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তারা যে কোন দলের সাথে সহাবস্থানে যেতে রাজি, তা তাদের আদর্শিক পার্থক্য যা-ই হোক না কেন। যে পোষাকের আড়ালে এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়, সেটা নেয়া হয়েছে গান্ধীর আদর্শ থেকে: “অস্পৃশ্য বলে কিছু নেই”।

মহারাষ্ট্রের ইস্যু

মহারাষ্ট্রে সবকিছুর শুরু হয়েছে আদর্শিক যুদ্ধ থেকে। ২১ অক্টোবরের রাজ্য অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে বিজেপি আর শিব সেনার হিন্দু পরিবার জোট বেধে নির্বাচন করে। অন্যদিকে কংগ্রেস আর ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) ছিল তাদের ‘সেক্যুলার’ প্রতিদ্বন্দ্বি।

শিব সেনা যেহেতু মহারাষ্ট্রকে নিজেদের স্বাভাবিক পরিমণ্ডল মনে করে এবং মারাঠি হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনের আগে তারা প্রবলভাবে মনে করেছে যে, মন্ত্রিসভায় তাদের ৫০:৫০ অংশগ্রহণ থাকা উচিত এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদও দুই দল থেকে পর্যায়ক্রমে থাকা উচিত। বিজেপি আগে এ বিষয়ে রাজি হয়েছিল। কারণ সে সময় তাদের এই আত্মবিশ্বাস ছিল না যে, সরকার-বিরোধী মনোভাবকে পাড়ি দিয়ে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে। কৃষি খাতে বিপর্যয় ছিল চরম, এবং রাজ্যে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করেছে।

কিন্তু হিন্দুত্ববাদের ব্যাপক আবেদনের কারণে বিজেপি একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২৮৮ আসনের অ্যাসেম্বলিতে তারা ১০৫টি আসন পেয়েছে আর শিব সেনা পেয়েছে ৫৬টি। অন্যদিকে এনসিপি ৫৪টি এবং কংগ্রেস পেয়েছে ৪৪টি আসন।

এই হিসাব অনুযায়ী বিজেপি আর শিব সেনা সহজেই সরকার গঠন করতে পারতো কারণ তাদের সম্মিলিত আসনের সংখ্যা হলো ১৬১টি। সরকার গঠনের জন্য আসন দরকার ছিল ১৪৫টি।

কিন্তু মহারাষ্ট্র রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপিকে হঠাৎ করে লোভে পেয়ে বসে। নির্বাচনের আগে শিব সেনাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তারা রাজি হয়নি। তারা এমনকি এ ধরনের চুক্তির বিষয়টিই অস্বীকার করে বসে। শিব সেনা শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে যে, আস্থা ভঙ্গ করার কারণে তারা জোট থেকে বেরিয়ে যাবে।

শিব সেনার সহায়তা ছাড়া বিজেপি সরকার গঠন করতে পারবে না। যদিও রাজ্য গভর্নর তাদেরকে আহ্বান জানিয়েছে। বিজেপির হাত-পা বাঁধা রয়েছে, কারণ তারা তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের সহায়তা চাইতে পারছে না। তারা এনসিপির দ্বারস্থ হয়েছে, যারা রাজ্যে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এনসিপি কংগ্রেসের মতো নয় এবং বিজেপির সাথে তাদের ততটা বিরোধ নেই। দলের প্রধান শারদ পাওয়ারের আদর্শিক জায়গাটাতে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে যদিও তিনি মূলত পুরনো কংগ্রেস ব্লকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন।

তবে, শারদ পাওয়ার এটা অনুভব করেছেন যে, জাতীয় সেক্যুলার নীতির পক্ষে তার যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, বিজেপির সাথে যোগ দিলে সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিজেপি ও শিব সেনার মিলিতভাবে সরকার গঠন করা উচিত কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদেরকে সম্মিলিতভাবে ভোট দিয়েছে।

এদিকে, শিব সেনা তাদের আদর্শিক পরিচয় সরিয়ে রেখে এখন এনসিপি আর কংগ্রেসের সমর্থন চেয়েছে।

বিজেপি সরকার গঠনে তাদের ব্যর্থতা জানানোর পর গভর্নর শিব সেনাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং তাদেরকে এ জন্য অল্প সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিব সেনা ওই সময়ে কিছু করতে পারেনি এবং আরও দুই দিন সময় চেয়েছে। গভর্নর সেটা প্রত্যাখ্যান করে ১২ নভেম্বর এনসিপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ফলে সবগুলো দল এক ধরনের জটিলতার মধ্যে পড়ে গেছে।

একদিকে বেশি রাজনীতিতে জড়ালে গভর্নরের শাসন জারি হতে পারে এবং ব্যয়বহুল নতুন নির্বাচনের দিকে যেতে হবে। অন্যদিকে, এমন দলগুলোকে নিয়ে একটা স্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রশ্ন রয়েছে, যারা আদর্শিকভাবে একে অপরের চেয়ে ভিন্ন।

শারদ পাওয়ার শুরুতে বলেছিলেন যে, নির্বাচনে ভোটাররা বিজেপি-শিব সেনাকে সমর্থন দিয়েছে, এবং এনসিপি ও কংগ্রেসের বিরোধী অবস্থানে বসা উচিত। তবে এখন তিনি তার অবস্থান বদলেছেন। তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন যে, ক্ষমতা তার নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং এখন তিনি কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর সাথে আলোচনায় ব্যস্ত যাতে শিব সেনা-এনসিপি-কংগ্রেসকে নিয়ে একটা সরকার গঠনের উপায় বের করা যায়।

এনসিপি ও কংগ্রেসের সাথে সরকার গঠনের জন্য শিব সেনা কতটা আন্তরিক, সেটা পরীক্ষার জন্য পাওয়ার দাবি করেছেন যাতে শিব সেনা বিজেপির জোট থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসে। এমনকি নয়াদিল্লীতে তারা মোদি সরকারকে যে সমর্থন দিচ্ছে, সেখান থেকেও বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন তিনি। মরিয়া শিব সেনা সেই শর্ত মেনে নিয়েছে এবং তাদের সদস্যদেরকে মোদি সরকার থেকে পদত্যাগ করিয়েছে।

বল এখন কংগ্রেসের কোর্টে

বল এখন কংগ্রেসের কোর্টে, যে দলটিকে ‘মৃতপ্রায়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মিডিয়া, টক শো আর টিভি চ্যানেলগুলোর চিন্তাবিবর্জিত পণ্ডিতরা। কিন্তু দলটির রহস্যময় প্রধান সোনিয়া গান্ধী এখনও তার কার্ড প্রকাশ করেননি। কংগ্রেসের যেহেতু সময় রয়েছে, তাই তিনি তাড়াহুড়া করছেন না। সরকার গঠনের মতো বা সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মতো আসন কংগ্রেসের কাছে নেই, যেটা এনসিপি বা শিব সেনার রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অন্যেরা যে ধরনের চাপের মধ্যে আছে, সেই ধরনের কোন চাপ ছাড়াই কংগ্রেস বর্তমান পরিস্থিতি উৎরে যেতে পারবে।

কিন্তু কংগ্রেসকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারণ সরকার গঠনে সহায়তা করতে দেরি হলে গভর্নর পার্লামেন্টকে বিলুপ্ত করে নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারেন। যদিও নতুন নির্বাচন হলে কংগ্রেস হয়তো হিন্দুত্ববাদী ক্যাম্প থেকে ভোট ভাগিয়ে আনার সুযোগ পাবে এবং তাদের আরও বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু কোন এমএলএ-ই চাইবেন না আগের নির্বাচন হওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন হোক।

সে কারণে সোনিয়া গান্ধীর উপর মহারাষ্ট্র কংগ্রেসের একাংশের চাপ রয়েছে যাতে তিনি শিব সেনা ও এনসিপির সাথে মিলে সরকার গঠন করেন। বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস শিব সেনা-এনসিপি সরকারকে ইস্যু-ভিত্তিক সমর্থন দিতে পারে।

বাস্তবে যা-ই হোক না কেন, মুম্বাই ও নয়া দিল্লিতে উন্মত্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট যে, বিজেপি এমনকি তার ‘শক্ত অবস্থানের’ জায়গাতেও অজেয় নয়। ভারতীয় রাজনীতিতে এমন কোন সুপারম্যান নেই যিনি দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভঙ্গুর। জোট গড়ার ক্ষেত্রে আদর্শকে ছাড় দেয়া হতে পারে। এবং দিন শেষে রাজনীতি মূলত ক্ষমতার খেলা, হিন্দুত্ববাদ বা সেক্যুলারিজমের সেখানে জায়গা নেই।

মহারাষ্ট্র বিশৃঙ্খলার শিক্ষা: হিন্দুত্ববাদ অজেয় নয়
পি কে বালাচন্দ্রন

ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের পরে সরকার গঠন নিয়ে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে চারটি বিষয় উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে। মূলত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যাতে এ সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, সেজন্যেই এটা করা হয়েছে। কিন্তু এতে রাজ্যের রাজনীতির চেহারা বদলাচ্ছে না যেটা পরবর্তী প্যারাগুলোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রথম শিক্ষা হলো ক্যারিশম্যাটিক মাস্কট নরেন্দ্র মোদি এবং ‘চানক্য’ অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অজেয় কোন রাজনৈতিক শক্তি নয়, যদিও তারা মহারাষ্ট্রের মতো ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজ্যে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো হিন্দুত্ববাদ একেবারে একাট্টা কোন ক্যাম্প নয়, যেমনটা এর সমর্থকরা দাবি করে থাকে। অন্যান্য আদর্শিক ও সেক্যুলার গ্রুপগুলোর মধ্যে যেমন বিভাজন রয়েছে, ‘সঙ্ঘ পরিবারের’ মধ্যেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তেমনটাই তিক্ত ও প্রকট হতে পারে।

তৃতীয় শিক্ষনীয় হলো কট্টর আদর্শিক বিভাজন ভারতীয় রাজনীতির কোন চিহ্ন নয়, বরং একটা নমনীয় ও পরিবর্তনযোগ্য পরিচয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলো নিজেদেরকে বামপন্থী বা উদারপন্থী, সেক্যুলার বা ধর্মীয়, হিন্দুত্ববাদী বা অ-হিন্দুত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আদর্শিকভাবে তারা আসলে ততটা দৃঢ় নয় এবং সময়ের স্রোতের সাথে তাদের তাল মেলানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

রাম জন্মভূমি ও কাশ্মির বা পাকিস্তানের মতো বহু জটিল ইস্যুতে সেক্যুলার কংগ্রেস আর হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মধ্যে বিভাজনটা খুবই সামান্য। বাস্তবতা হলো সেই ত্রিশের দশক থেকেই কংগ্রেস হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে সুক্ষ্মভাবে খেলে এসেছে এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পেছনে এটা একটা বড় কারণ। স্বাধীনতার পর, নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজিব গান্ধীও ‘কোমল হিন্দুত্ববাদ’কে বেছে বিভিন্ন মাত্রায় বেছে নিয়েছেন যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সাথে সেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে ‘কোমল হিন্দুত্ববাদে’ আর কাজ হয়নি, কারণ জনগণ আসল জিনিস – বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদকে বেছে নিয়েছে।

চতুর্থ শিক্ষা হলো ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা অর্জন ও সেখানে টিকে থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়, আদর্শিক প্রতিশ্রুতিকে নয়। এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তারা যে কোন দলের সাথে সহাবস্থানে যেতে রাজি, তা তাদের আদর্শিক পার্থক্য যা-ই হোক না কেন। যে পোষাকের আড়ালে এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়, সেটা নেয়া হয়েছে গান্ধীর আদর্শ থেকে: “অস্পৃশ্য বলে কিছু নেই”।

মহারাষ্ট্রের ইস্যু

মহারাষ্ট্রে সবকিছুর শুরু হয়েছে আদর্শিক যুদ্ধ থেকে। ২১ অক্টোবরের রাজ্য অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে বিজেপি আর শিব সেনার হিন্দু পরিবার জোট বেধে নির্বাচন করে। অন্যদিকে কংগ্রেস আর ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) ছিল তাদের ‘সেক্যুলার’ প্রতিদ্বন্দ্বি।

শিব সেনা যেহেতু মহারাষ্ট্রকে নিজেদের স্বাভাবিক পরিমণ্ডল মনে করে এবং মারাঠি হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনের আগে তারা প্রবলভাবে মনে করেছে যে, মন্ত্রিসভায় তাদের ৫০:৫০ অংশগ্রহণ থাকা উচিত এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদও দুই দল থেকে পর্যায়ক্রমে থাকা উচিত। বিজেপি আগে এ বিষয়ে রাজি হয়েছিল। কারণ সে সময় তাদের এই আত্মবিশ্বাস ছিল না যে, সরকার-বিরোধী মনোভাবকে পাড়ি দিয়ে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে। কৃষি খাতে বিপর্যয় ছিল চরম, এবং রাজ্যে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করেছে।

কিন্তু হিন্দুত্ববাদের ব্যাপক আবেদনের কারণে বিজেপি একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২৮৮ আসনের অ্যাসেম্বলিতে তারা ১০৫টি আসন পেয়েছে আর শিব সেনা পেয়েছে ৫৬টি। অন্যদিকে এনসিপি ৫৪টি এবং কংগ্রেস পেয়েছে ৪৪টি আসন।

এই হিসাব অনুযায়ী বিজেপি আর শিব সেনা সহজেই সরকার গঠন করতে পারতো কারণ তাদের সম্মিলিত আসনের সংখ্যা হলো ১৬১টি। সরকার গঠনের জন্য আসন দরকার ছিল ১৪৫টি।

কিন্তু মহারাষ্ট্র রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপিকে হঠাৎ করে লোভে পেয়ে বসে। নির্বাচনের আগে শিব সেনাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তারা রাজি হয়নি। তারা এমনকি এ ধরনের চুক্তির বিষয়টিই অস্বীকার করে বসে। শিব সেনা শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে যে, আস্থা ভঙ্গ করার কারণে তারা জোট থেকে বেরিয়ে যাবে।

শিব সেনার সহায়তা ছাড়া বিজেপি সরকার গঠন করতে পারবে না। যদিও রাজ্য গভর্নর তাদেরকে আহ্বান জানিয়েছে। বিজেপির হাত-পা বাঁধা রয়েছে, কারণ তারা তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের সহায়তা চাইতে পারছে না। তারা এনসিপির দ্বারস্থ হয়েছে, যারা রাজ্যে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এনসিপি কংগ্রেসের মতো নয় এবং বিজেপির সাথে তাদের ততটা বিরোধ নেই। দলের প্রধান শারদ পাওয়ারের আদর্শিক জায়গাটাতে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে যদিও তিনি মূলত পুরনো কংগ্রেস ব্লকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন।

তবে, শারদ পাওয়ার এটা অনুভব করেছেন যে, জাতীয় সেক্যুলার নীতির পক্ষে তার যে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, বিজেপির সাথে যোগ দিলে সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিজেপি ও শিব সেনার মিলিতভাবে সরকার গঠন করা উচিত কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদেরকে সম্মিলিতভাবে ভোট দিয়েছে।

এদিকে, শিব সেনা তাদের আদর্শিক পরিচয় সরিয়ে রেখে এখন এনসিপি আর কংগ্রেসের সমর্থন চেয়েছে।

বিজেপি সরকার গঠনে তাদের ব্যর্থতা জানানোর পর গভর্নর শিব সেনাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং তাদেরকে এ জন্য অল্প সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিব সেনা ওই সময়ে কিছু করতে পারেনি এবং আরও দুই দিন সময় চেয়েছে। গভর্নর সেটা প্রত্যাখ্যান করে ১২ নভেম্বর এনসিপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ফলে সবগুলো দল এক ধরনের জটিলতার মধ্যে পড়ে গেছে।

একদিকে বেশি রাজনীতিতে জড়ালে গভর্নরের শাসন জারি হতে পারে এবং ব্যয়বহুল নতুন নির্বাচনের দিকে যেতে হবে। অন্যদিকে, এমন দলগুলোকে নিয়ে একটা স্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রশ্ন রয়েছে, যারা আদর্শিকভাবে একে অপরের চেয়ে ভিন্ন।

শারদ পাওয়ার শুরুতে বলেছিলেন যে, নির্বাচনে ভোটাররা বিজেপি-শিব সেনাকে সমর্থন দিয়েছে, এবং এনসিপি ও কংগ্রেসের বিরোধী অবস্থানে বসা উচিত। তবে এখন তিনি তার অবস্থান বদলেছেন। তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন যে, ক্ষমতা তার নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং এখন তিনি কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর সাথে আলোচনায় ব্যস্ত যাতে শিব সেনা-এনসিপি-কংগ্রেসকে নিয়ে একটা সরকার গঠনের উপায় বের করা যায়।

এনসিপি ও কংগ্রেসের সাথে সরকার গঠনের জন্য শিব সেনা কতটা আন্তরিক, সেটা পরীক্ষার জন্য পাওয়ার দাবি করেছেন যাতে শিব সেনা বিজেপির জোট থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসে। এমনকি নয়াদিল্লীতে তারা মোদি সরকারকে যে সমর্থন দিচ্ছে, সেখান থেকেও বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন তিনি। মরিয়া শিব সেনা সেই শর্ত মেনে নিয়েছে এবং তাদের সদস্যদেরকে মোদি সরকার থেকে পদত্যাগ করিয়েছে।

বল এখন কংগ্রেসের কোর্টে

বল এখন কংগ্রেসের কোর্টে, যে দলটিকে ‘মৃতপ্রায়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মিডিয়া, টক শো আর টিভি চ্যানেলগুলোর চিন্তাবিবর্জিত পণ্ডিতরা। কিন্তু দলটির রহস্যময় প্রধান সোনিয়া গান্ধী এখনও তার কার্ড প্রকাশ করেননি। কংগ্রেসের যেহেতু সময় রয়েছে, তাই তিনি তাড়াহুড়া করছেন না। সরকার গঠনের মতো বা সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মতো আসন কংগ্রেসের কাছে নেই, যেটা এনসিপি বা শিব সেনার রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অন্যেরা যে ধরনের চাপের মধ্যে আছে, সেই ধরনের কোন চাপ ছাড়াই কংগ্রেস বর্তমান পরিস্থিতি উৎরে যেতে পারবে।

কিন্তু কংগ্রেসকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারণ সরকার গঠনে সহায়তা করতে দেরি হলে গভর্নর পার্লামেন্টকে বিলুপ্ত করে নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারেন। যদিও নতুন নির্বাচন হলে কংগ্রেস হয়তো হিন্দুত্ববাদী ক্যাম্প থেকে ভোট ভাগিয়ে আনার সুযোগ পাবে এবং তাদের আরও বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু কোন এমএলএ-ই চাইবেন না আগের নির্বাচন হওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন হোক।

সে কারণে সোনিয়া গান্ধীর উপর মহারাষ্ট্র কংগ্রেসের একাংশের চাপ রয়েছে যাতে তিনি শিব সেনা ও এনসিপির সাথে মিলে সরকার গঠন করেন। বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস শিব সেনা-এনসিপি সরকারকে ইস্যু-ভিত্তিক সমর্থন দিতে পারে।

বাস্তবে যা-ই হোক না কেন, মুম্বাই ও নয়া দিল্লিতে উন্মত্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট যে, বিজেপি এমনকি তার ‘শক্ত অবস্থানের’ জায়গাতেও অজেয় নয়। ভারতীয় রাজনীতিতে এমন কোন সুপারম্যান নেই যিনি দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভঙ্গুর। জোট গড়ার ক্ষেত্রে আদর্শকে ছাড় দেয়া হতে পারে। এবং দিন শেষে রাজনীতি মূলত ক্ষমতার খেলা, হিন্দুত্ববাদ বা সেক্যুলারিজমের সেখানে জায়গা নেই।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

পি কে বালাচন্দ্রন: কলম্বোভিত্তিক সাংবাদিক। হিন্দুস্থান টাইমস ও ইনডিয়ান এক্সপ্রেসের হয়ে কাজ করার পর বালাচন্দ্রন গত নয় বছর ধরে নিউ ইনডিয়ান এক্সপ্রেসের শ্রীলঙ্কা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। 


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]