লাইফস্টাইল
বিয়েতে করোনা-সংকট
বিয়েতে করোনা-সংকট





ডয়চে ভেলে
Sunday, May 23, 2021, 1:14 am
 @palabadalnet

করোনাকালে বাংলাদেশে বিয়ে কমে গেছে৷ রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার বিবাহ নিবন্ধকের ধারণা, অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে, সেটার প্রভাব সেই এলাকায়ও পড়েছে৷

বাংলাদেশেবিবাহ নিবন্ধনের কাজটিনানা ব্যবস্থাপনায় হয়ে থাকে৷ এর মধ্যে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধকরা স্থানীয়ভাবে কাজী হিসাবে পরিচিত৷ বাংলাদেশ কাজী সমিতির দেয়া তথ্য অনুসারে, দেশে ১০ হাজারের মতো কাজী রয়েছেন৷ সব বিবাহের ডেটা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয় না৷ কাজীরা তাদের বালাম বইয়ে তথ্য সংরক্ষণ করেন৷

বাংলাদেশ কাজী সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জলিল মিয়াজী গুলশান এলাকার কাজী৷ তার যাতায়াত উচ্চবিত্তদের বিয়েতে৷

তিনি বলেন, ‘‘গুলশান-বনানীতে সাধারণ কোনো বিবাহ হয় না৷ অনেক বড় বড় আয়োজন থাকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, বাইরের সংস্কৃতি থাকে৷ এসব  আয়োজনের মাঝে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাও যত্নের সাথে করা হয়৷” তিনি জানান, গুলশানের অনেক বিয়েতে অনেকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য অনেক বড় বড় আলেম-পীর-মাশায়েখদেরও নিয়ে আসেন৷

আবদুল জলিল মিয়াজী বলেন, ‘‘গত বছর করোনার প্রথম ধাপে সরকার যেমন সচেতন ছিল, আমরাও সচেতন ছিলাম৷ লকডাউনের পুরোটাই আমাদের অফিস বন্ধ ছিল৷ কিছুদিন পর পরিস্থিতির উন্নতি হলে টেলিফোনে বা স্কাইপে কিছু বিয়ে শুরু হয়৷”

বাংলাদেশে টেলিফোনে বিয়ের চল হয় প্রবাসীদের কারণে৷ পাত্র প্রবাসে থাকে, সেখান থেকে টেলিফোনে বিয়ে আর রেজিস্ট্রি ডাকে নিবন্ধন- এমন চিত্র বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় দেখা যায়৷ গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রেও টেলিফোনের বিয়ে উঠে এসেছে৷

করোনাভাইরাসের এই সময়ে একাধিক স্থানে বসে একত্রে বিয়ের এই আনুষ্ঠানিকতা একেবারে পাল্টে গেছে৷ টেলিফোনে বিয়েতে বর-কনে প্রবাসে থাকলেও কাজীসহ বাকিরা সবাই একই জায়গায় থাকতেন৷

আবদুল জলিল মিয়াজী করোনাভাইরাসের সময়ে এমন অনেক বিয়ের কাজ করে দিয়েছেন, যেগুলো হয়েছে স্কাইপ/জুমের মতো প্ল্যাটফর্মে৷ সেখানে কাজী-বর-কনে সবাই ছিলেন যার যার বাসায়/অফিসে৷ ভিডিও কলে সম্পাদন করা হয় বিয়ের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা৷ এর আগে বা পরে সময়-সুযোগ মতো সাবধানতার সাথে নিয়ে আসা হতো বিবাহ নিবন্ধনের স্বাক্ষর৷

করোনা মহামারির মাঝে গুলশানের মতো এলাকায়ও কমে গেছে বিবাহের সংখ্যা৷ সেই এলাকার বিবাহ নিবন্ধক বলছেন, বিয়ের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে৷ আগে যেখানে মাসে ২৫টা বিয়ে হতো, এখন সেখানে বিয়ে হয় ৫টা৷

তিনি বলেন, ‘‘২০২০ সালে ডকডাউন শুরুর পর টানা অনেকদিন বন্ধ ছিল অফিস৷ লকডাউন শিথিল হওয়ার পর ধীরে ধীরে অফিস খোলা হয়৷”

তার মতে, ‘‘পাসপোর্ট করানো বা বিদেশ যাত্রার আগে অনেকে বিবাহ বা কাবিন করে৷ এগুলো জরুরিভিত্তিতে করতে হয়৷ এরকম কিছু কাজ তখন আসতো৷ এরপর আস্তে আস্তে বিবাহ বেড়েছে৷ তবে সেটাও আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ৷”

বাংলাদেশ কাজী সমিতির এই সভাপতি বলেন, ‘‘কেবল গুলশান নয়, বিবাহ কমার এই চিত্র সারা দেশের৷ গ্রামে গঞ্জে অনেক এলাকায় মাসেও একটা বিয়ে হয় না৷ ”

বিয়েতে উৎসব নেই, পথে বসছে অনেকে

বিয়ে মানেই নানা আয়োজন, নানা উৎসব৷ এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকের জীবন-জীবিকা৷ নিবন্ধনে বাধ্যবাধকতা থাকায় বিবাহ কমলেও কাজীরা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারছে৷ কিন্তু একেবারেই যেন পথে বসতে শুরু করেছেন ঢাকাসহ সারাদেশের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটরের ব্যবসায়ীরা৷

বাংলাদেশ ডেকোরেটর সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘‘সারা দেশে দুই-তিন হাজার ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আছে৷ এক সময় এদের বেশ বড় আকারের ব্যবসা ছিল৷”

তার মতে, ‘‘ডেকোরেটরদের ডেকে প্যান্ডেল সাজাতে হলে জায়গার দরকার হয়৷ কিন্তু ঢাকাসহ অন্যান্য নগরে এই রকম খোলা জায়গা ক্রমেই কমে যাচ্ছে৷ এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ঢাকায়৷ এখানে একটু খানি জায়গা খুঁজে পাওয়া যেন চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার৷ তাই আগে থেকেই চাপে ছিল ডেকোরেটর ব্যবসা৷ এটা কমিউনিটি সেন্টারকেন্দ্রিক হয়ে যায়৷”

তিনি বলেন, ‘‘এরপর আসে করোনাভাইরাস৷ এসে সব বন্ধ করে দেয়৷ গত ১৪ মাস ধরে যে সেক্টরে কোনো কাজ নেই, সেটা হচ্ছে এই সেক্টর৷”

এর সমাধান কী- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘সমাধান তো নাই৷ করোনাভাইরাস বলছে, একত্রিত হওয়া যাবে না৷ আর একত্রিত না হলে আমাদেরকে মানুষ ডাকবে কেন?”

করোনার মাঝে বিয়ে করতে গিয়ে অনেক বর-কনেকে যেতে হয়েছে বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টিনে৷ বিশেষ করে, বিদেশ থেকে এসে দুই সপ্তাহের আগেই বিয়ে করতে যাওয়ার কারণে অনেক প্রবাসীকে পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েছে কোয়ারান্টিনে৷ সংক্রমণের প্রথম দিকে সংবাদপত্রে প্রায়ই দেখা গেছে এমন খবর৷

তবে অনেক ছোট আয়োজনে বিয়ে করেও নিজেদের ইচ্ছায় কোয়ারান্টিনে যাওয়ার একটি ঘটনা পাওয়া গেছে৷ এটা করেছেন দম্পতি মার্জিয়া শরমিন প্রপা ও মোরশেদ তওসীফ হাসান দীপ্র এবং তাদের পরিবার৷

তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের মার্চের শেষের দিকে৷ বিয়ের কেনাকাটা, আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত, পার্লার বুকিং, মেহেদি বুকিং, হানিমুন বুকিং থেকে সব প্রস্তুতি সেরে ফেলেছিলেন বিবাহ মাসের শুরুর দিকেই৷ এমনকি বিয়ের কার্ডের ডেলিভারিও নিয়ে ফেলেছিল উভয়পক্ষ৷ বাকি ছিল কেবল সেই কার্ড বিতরণ৷ এর মাঝেই করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর সব আয়োজন স্থগিত করে দেয়া হয়৷

মার্জিয়া শরমিন প্রপা বলেন, ‘‘আমার তো ইচ্ছা ছিল ধুমধাম করে বিয়ে করবো৷ সেই আমার ক্ষেত্রেই কী ঘটলো৷ গত বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে শপিং করেছি৷ অথচ সেই শপিংয়ের অনেক কিছু এখনো খোলা হয়নি৷”

তিনি বলেন, ‘‘গত বছর সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর আস্তে আস্তে কঠোর থেকে কঠোরতর বিধিনিষেধ আসতে থাকে৷ সেই সঙ্গে আমরাও ঘরবন্দি হয়ে যাই৷ বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হলে সবাই মিলে একেবারে ছোট আয়োজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেই৷”

প্রপা বলেন, ‘‘বিয়ের আগের রাতে মেহেদিও আমি একা একা পরেছি৷ সেজেছিও একা একা৷ বিয়েতে দুই পরিবারের মোট ১২ জন উপস্থিত ছিল৷ বরপক্ষের এসেছিল ৬ জন৷ তারা আসার সময় অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে এসেছিল, যেন এখানে এসে ক্লিন হয়ে চেঞ্জ করতে পারে৷ এমনকি কাজীকেও সেদিন ঘরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি৷ কাজী বাইরে থেকে আমাদের বিয়ের স্বাক্ষর নিয়ে চলে গেছেন৷ বিয়ে পড়িয়েছেন আমার বাবা৷ সাধারণভাবে বিয়ে হলে এটাও হতো না৷”

"বিয়ের পর আমার সকল সাজ-পোশাক খুলে সাধারণ পোশাকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে রাস্তায় পুলিশ দেখে ঝামেলা করতে না পারে৷ শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পর পরের দিন ফিরানি থাকে৷ আমার কিছুই ছিল না৷ বরং দুই পরিবার মিলে যার যার বাসায় ১৪ দিনের কোয়ারান্টিনে চলে গিয়েছিলাম৷”

ওয়েডিং ফটোগ্রাফি-ভিডিওগ্রাফির সুদিন

‘‘ঢাকার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্তদের মধ্যে করোনার মাঝেও দাপটের সাথে চলছে ওয়েডিং ফটোগ্রাফি-ভিডিওগ্রাফির কাজ৷ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় আর কিছু থাকুক না থাকুক, ফটোগ্রাফার-ভিডিওগ্রাফার যেন লাগবেই”-এমনটাই বলছিলেন ফিল্মিজম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা কাওসার আহমেদ রোহান৷

করোনার মাঝে সাদামাটাভাবে যাত্রা শুরু করলেও তাদের করা বিয়ের ভিডিওর এখন মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হয়৷ এই দর্শকপ্রিয়তার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়েই বেড়েছে তাদের কাজের ভলিউম৷ গত বছর লকডাউন শিথিল হওয়ার পর যাত্রা শুরু করা ফিল্মিজম এখন প্রতিদিনই একাধিক ইভেন্ট কাভার করে৷

কাওসার আহমেদ রোহান বলেন, ‘‘লকডাউনে কাজ একটু কম থাকে৷ তবে লকডাউন শেষ হলেই আবার কাজ বেড়ে যায়৷ আমরা তখন বেশি পরিশ্রম করে কাজ শেষ করি৷”

তার মতে, ‘‘নতুনদের জন্য এখানে এখনো এক্সপ্লোর করার অনেক সুযোগ রয়েছে৷”

অবশ্য এই খাতের অনেকে কাজ কিছুটা কমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন৷

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]