শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
 
শিল্প-সাহিত্য
বিশ্বমানবতার প্রেমে উৎসর্গীত এক মহান কবি
বিশ্বমানবতার প্রেমে উৎসর্গীত এক মহান কবি





মুহাম্মদ এহছানুল হক মিলন
Tuesday, Aug 27, 2019, 5:06 pm
 @palabadalnet

সভ্যতার পরিক্রমায় যুগে যুগে বহু প্রতিভাধর মানুষের অবির্ভাব হয়, যারা তাদের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ থেকে অতি সাধারণে পরিণত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে তার সৃষ্টি সম্ভারগুলো আপন আলোয় আলোকিত।

বৃটিশ শাসন ও শোষণের মহা দুর্যোগময় মুহূর্তে পরাধীনতার জিঞ্জিরাবদ্ধ এদেশের দুঃখময় নিমর্ম বাস্তবতা এড়িয়ে দূরে-বহুদূরে নিভৃতে নিরালয় ফুলের সৌরভ মাখানো নিকুঞ্জে বসে হৃদয়ে ভালবাসার জোয়ার তুলে অনেকেই যখন প্রেমের ছন্দ সাজাতেন, নির্যাতিত অসহায় মানুষের আর্ত চিৎকার এবং করুণ আহাজারিতে শব্দ শুনে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে অনেকে যখন না শোনার ভান করতেন’ উপরন্তু অত্যাচারী ঔপনিবেশিক শোষক শ্রেণীর স্মৃতিগান গাওয়ায় মগ্ন থাকতেন । তখন একটি মাত্র হৃদয় কেঁদে উঠতো সে হৃদয় মানবতাবাদী এক মহান কবির সংবেদনশীল, প্রেমিক হৃদয় । তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম । তবে তাঁর সে কান্নার চোখ থেকে অশ্রু ঝরার পরিবর্তে, মন থেকে বেদনার বহিঃপ্রকাশের পরিবর্তে হৃদয় হতে রক্তক্ষরণের পরিবর্তে জ্বলে উঠতো বিদ্রোহ আর বিপ্লবের লেলিহান শিখা । তাই তো আর বসে না থেকে যে বিপ্লবের পথে নব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নতুন শপথে নতুন উদ্দীপনায় অত্যাচারের রাহু গ্রাস থেকে মানবতার মুক্তির জন্য সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সংগ্রামী আহ্বানের গান গেয়েছেন তিনি ”আনন্দময়ীর আগমনী”তে বলেছেন-

”আর কতকাল থাকবি বেটি/মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ করেছে/অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল!../রণাঙ্গণে নামবে কে আর/তুই না এলে কৃপাণ ধরে?”

জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কবি নজরুল মর্মে মর্মে পলে পলে অনুভব করেছেন আর্ত মানবতার ব্যথা-বেদনা । মানবতার উপর এতটুকু নির্যাতন তাঁর চোখ এড়ায়নি । যেখানেই অত্যাচার হয়েছে সেখানেই বারুদের মতো জ্বলে উঠেছেন তিনি; মসীর ঘায়ে অত্যাচারীর শরীরকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন বারবার । তিনি শুধু অত্যাচারীকে আঘাত করেই ক্ষান্ত হন নি অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন আশার আলোকবর্তিকা হাতে- নিরাশার মনে জুগিয়েছেন ভরসা, দুর্বলের প্রাণে তুলে দিয়েছেন শক্তির তোহফা । তাইতো সে সময় যখন অবচেতন হয়ে শোষকদের পদতলে মানবের দল নিষ্প্রাণ দেহের মত পড়ে থাকত-ওদের পদাঘাতকেও অমৃত মনে করে একান্ত বাধ্যানুগতের মত তা মেনে নিত নিঃসঙ্কোচে-নির্দ্বিধায়; কবি তখন মানবের ঘুমন্ত বিবেককে আঘাত করেছেন জাগরণের গান দিয়ে, নিজস্ব ব্যক্তিত্বের অহংকারে জেগে উঠার উদাত্ত আহ্বানে তাঁর ”যুগবাণীতে” অবচেতনের চেতনা জাগাতে চেয়েছেন এভাবে- 

”তুমি কি চাও? কুকুরের মত ঘৃণ্য মরা মরিতে,/না মানুষের মত মরিয়া অমর হইতে?/তুমি কি চাও?শৃংখল না স্বাধীনতা?/তুমি কি চাও? তোমাকে লোকে মানুষের মত ভক্তি-শ্রদ্ধা করুক,/না পা-চাটা কুকুরের মত মুখে লাথি মারুক?”

মাটির কাছাকাছি থেকে কবি মানুষকে একান্তভাবে ভালবেসে ছিলেন বলেই সাত তলা আর গাছ তলার পার্থক্য তিনি বুঝতে পেরেছিলেন । তিনি বুঝেছিলেন- সমাজের প্রভাবশালী অর্থাৎ জমিদার, রায়ত, ঘাতক,বাবুসাব আর কৃষক, শ্রমিকম কুলি মজুরসহ সর্বস্তরের মেহনতি মানুষের মাঝে বিরাট এক পাথ্যক্যের দেয়াল উঠেছে । তাঁর  উপলদ্ধিতে এসেছিল- বিদেশী ঔপনিবেশিক শোষকরাই শুধু নয়, দেশীয় ঠাকুররাও লেখনীতে তাই স্খরিত হয়েছে এদের অত্যাচারী হাত মানবতাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে । তারঁ লেখনীতে তাই স্খরিত হয়েছে আরেক বেদনাময় সুরের ব্যঞ্জনা-

”তোমাদের সেবিতে হইল যারা মজুর, মুটে ও কুলি,/তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগালো ধূলি!/তারাই মানুষ-তারাই দেবতা!/জনগণকে যারা জোঁকস মশোষে তারে মহাজন কয়,/সন্তানসম পালে যারা জমি তারা জমিদার নয়/মাটিতে যাদের ঠেকেনা চরণ/মাটির মালিক তাহারাই হন ।” 

ধর্মীয় শৃংখল আর ধ্বংসাত্মক সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে সর্ব পর্যায়ের অসহায় মানবতার কল্যাণ কামনা করেছেন তিনি।

সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে প্রথিতযশা ব্যক্তিগণ তাদের কর্মভিত্তিক এক একটি বিশেষ অভিধায় অভিষিক্ত হন। এই সকল অভিষিক্ত নাম দিয়ে কিছু কিছু ব্যক্তিকে খুব সহজে চেনা যায়। যেমন- বাউল সম্রাট বললে লালন কে, বিশ্বকবি বললে রবীন্দ্রনাথকে, পল্লীকবি বললে জসীম উদ্দীনকে বোঝায়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তার সাহিত্য কর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন অভিধায় অভিহিত করা হয়ে থাকে।

বাঙালির জাতীয় কবি

কবি তার সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রায় অধিকাংশ জাতি, উপজাতি, শ্রেণি, গোষ্ঠীর জীবনাচরণ, কথা, ভাষা, সংস্কৃতি উঠে এসেছে। দখলদার বৃটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং বিপ্লবী ধারার লেখালেখির জন্য ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর উপস্থিতিতে তাকে বাঙালি জাতির ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে সংবর্ধনা দেয়া হয়। বিশ্বে যত বাঙালি আছেন তার সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি- কবি নজরুল ইসলাম তাদের ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালে ”বাংলাদেশ” রাষ্ট্র” গঠিত হওয়ার ৪১ বছর আগে কবি কাজী নজরুল ’বাঙলাদেশ’ নামে পূর্ণাঙ্গ কবিতা রচনা করেন- নম, নম, বাংলাদেশ মম....। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই অকপটে বলেছিলেন. ’সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করো নি।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ , তোমার সে কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে । তুমি এসে দেখে যাও, আমার বাঙালি মানুষ হয়েছে ।’ 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি

তারপর ৪ মাস ১৪ দিনের মাথায় ভারতের কলকাতা থেকে ১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত আন্তরিক প্রচেষ্টায় কবি নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে এসে ধানমন্ডির ২৭ নম্বরের পাশে ২৮ নম্বর রোডে কবি ভবনে(বর্তমান নজরুল ইনস্টিটিউটে) বাঙালির জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের অসংখ্য গান, কবিতা- আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার স্বীকৃতিস্বরুপ তাকে এ মর্যাদা দেয়া হয়। ২৫ মে, ১৯৭২ সালে প্রথম নজরুল জন্মজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলকে নিয়ে এক বাণীতে বলেন, ’কবি নজরুল বাঙলার বিদ্রোহী-আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার । বাঙলার শেষ-রাতের ঘনান্ধকারে নিশীথ-নিশ্চিন্ত নিদ্রায়  বিপ্লবের রক্তলীলার মধ্যে বাঙলার তরুণরা শুনেছে রুদ্র-বিধাতার অট্টহাসি, কাল-ভৈরবের ভয়াল গর্জন-নজরুলের জীবনে, কাব্যে, সঙ্গীতে ও তাঁর কণ্ঠে।  প্রচণ্ড সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো, লেলিহান অগ্নিশিখার মতো, পরাধীন জাতির তিমির-ঘন অন্ধকারে বিশ্ববিধাতা নজরুলকে এক স্বতন্ত্র ছাঁচে গড়ে পাঠিয়েছেন এই ধরার ধূলায়।

বিদ্রোহী কবি: ‘বিদ্রোহী কবিতাকে বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্ব সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতার একটি বলে উল্লেখ করেন আমেরিকান অধ্যাপক জনাব হেনরি গ্লাসি। হেনরি গ্লাসির এই উক্তির সাথে  অসংখ্য সাহিত্য সমালোচক সহমত পোষণ করেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের ভাড়াবাড়িতে এক রাতেই কবি নজরুল বিদ্রোহী কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সাংবাদিক অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের মাধ্যমে ‘বিজলী’ পত্রিকায় ৬ জানুয়ারি ১৯২২ সালে। তবে সময়ের এক হিসাবে ‘মুসলিম ভারত’ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যা ১৩২৮-এ। যদিও পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়  পৌষ ১৩২৮ সালে। সে কারণে কবিতাটির প্রথম প্রকাশকারি হিসাবে ‘মুসলিম ভারত পত্রিকা’ দাবিদার। তবে যাইহোক, বিজলী পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্য প্রথম বিদ্রোহী কবিতাটিকে দেখতে পায়। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর এর চাহিদা এত বেশি হয় যে, বিজলী পত্রিকার ঐ সংখ্যা দুইবারে মোট ২৯ হাজার কপি ছাপানো লাগে। কোন কবিতার জন্য একটি পত্রিকা দুইবার মুদ্রণ করার নজির আর কোন সময় হয়েছে বলে জানা নেই। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর সমগ্র ভারতে হৈ চৈ  পড়ে যায়। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বৃটিশ সরকার নড়েচড়ে ওঠে। কবি নজরুলের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে শুরু করে। এরপর নজরুল তার সাহিত্য কবিতা, গানে, নাটকে বিদ্রোহাত্মক বিভিন্ন লেখা লিখতে শুরু করেন। সকল মহলে ‘গোদা কবি’ থেকে হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’। বিশ্ব সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ ‘বিদ্রোহী কবি’ বলতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকেই বোঝায়। বিদ্রোহী সাহিত্য চর্চার কারণে নজরুলের পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ ইংরেজ বৃটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং আরও পাঁচটি গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত তালিকায় রাখে। বিশ্বে আর কোন কবি নেই যার এতগুলো গ্রন্থ বাজেয়াপ্তের কবলে পড়ে।

বিশ্বকবি

কবি নজরুল তার কাব্যের ভাষা, বিষয়মান, গুরুত্ব সবকিছু বিবেচনায় বর্তমান বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। বর্তমানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সকল ভাষায় নজরুল সাহিত্য অনুদিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এখন বিশ্বের প্রায় চল্লিশটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল সাহিত্য পড়ানো হচ্ছে। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর কবি নজরুলকেও অনেকে ‘বিশ্বকবি’ বলেন। এর কারণ বিশ্ব বাংলাভাষার ওপর ভিত্তি করে একটি মাত্র দেশ বাংলাদেশ, বিশ্বের যত দেশ আছে সকল দেশে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসাবে নজরুলের বিশেষ পরিচয় বহন করছে। তাছাড়া নজরুল সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত, মানুষের পক্ষের কণ্ঠস্বর, বিশ্বের শ্রমিকের অধিকার, নারীর অধিকার, পরাধীন জাতির অধিকার, কৃষকের অধিকার প্রভৃতি বিষয়ে নজরুলের লেখনী যেভাবে কথা বলেছে তার তুলনা খুব কমই আছে। এ কারণেও নজরুলকে অনেকে ‘বিশ্ব মানবতার কবি’ বলে থাকেন। ২০০৫ সালে খুলনার স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক নজরুল মেলাও আয়োজন করা হয়। মেলা শেষে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে এক প্রতিবেদনে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় অভিহিত করা হয়। এছাড়া নজরুলকে ‘বিশ্বমাপের’, বিশ্বমানের, ‘বিশ্বকবি’, ‘বিশ্ব মানবতার’, ‘বিশ্ব মানুষের মুক্তির কবি প্রভৃতি বলেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ড. সুনীল ভট্টাচার্য (সাহিত্যকণ্ঠ ১ আগস্ট, ২০০৮, পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫)

সাম্যের কবি 

এই অভিধাটিও নজরুলে জন্য একান্ত নিজস্ব। বিশ্বের কোনো কবিকেই এই অভিধায় অভিহিত করা যায় না। মানবিক সাম্যের বাণী নিয়ে নজরুল অপেক্ষা এত উদাত্ত সোচ্চার বলিষ্ঠ বক্তব্য আর কেউ রেখেছেন কিনা সন্দহ । যেমন-

ক) গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/নহে কিছু মাহিয়ান।
খ) উহারা প্রচার করুক হিংসা-বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ/আমরা বলিব সাম্য, শান্তি -এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
গ) চাষা বলে কর ঘৃণা দেখ চাষা রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এল কিনা/যত নবী ছিল মেষের রাখাল তারাও ধরিল হাল/ তারাই আনিল অমর বাণী যা আছে রবে চিরকাল (মানুষ কবিতা, সর্বহারা।
ঘ) ওকে? চাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব/ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র ওই শ্মাশনের শিব।
ঙ) দেখিনু সে দিন রেলে/কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে। চোখ ফেঁটে এলো জল/এমনি করিয়া কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
চ) শোন মানুষের বাণী/জন্মের পরে মানব জাতির থাকে নাকো কোন গ্লানি।
ছ) সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি/এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোন এক মিলনের বাঁশি।

উপরের উদাহরণসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কাজী নজরুল ইসলাম কতখানি মানবতাবাদী ও সাম্যের কবি ছিলেন। এই বক্তেব্যের সাথে সহমত পোষণ করেন বিশিষ্ট প্রবন্ধকার রহমান শেলীসহ আরো অনেকে।

নারী চেতনার কবি

আমার জানা মতে, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বের প্রথম পুরুষ কবি, যিনি নারীদের মর্যাদা, অধিকার, সম্মান প্রতিষ্ঠায় সর্বাপেক্ষা সোচ্চারভাবে তার কাব্যে ও সাহিত্যে বক্তব্য রেখেছেন। উদাহরণ হিসাবে তার ‘নারী’ কবিতার কথা বলা যায়। এই একটি কবিতাই বিশ্বের তাবৎ নারীদের পক্ষে যে সুদৃঢ় বক্তব্য ব্যক্ত করেছে তার নজির বিশ্ব সাহিত্য বিরল।

ক) বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর....।
খ) কোন কালে একা হয়নি ক জয়ী পুরুষের তরবারি/প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী।

বস্তুত উপরে উল্লেখিত উদাহরণ-ই বলে দেয়, নজরুল কত বলিষ্ঠ ‘নারীবাদী কবি’ ছিলেন। নজরুল একমাত্র কবি যার সাহিত্যে নারীকে পুরুষের সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। 

মানবতাবাদী কবি 

কবি নজরুলকে সাম্যবাদী কবি বলার পাশাপাশি তাকে ‘মানবতাবাদী কবি’ও বলা হয়। নজরুল কাব্যে মানবতাবোধ অত্যন্ত গভীরভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। যেমন- 

ক) আমি সেই দিন হব শান্ত যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারির খড়গকৃপান ভীম রণভুমে রণিবে না। 

এছাড়া নজরুলের ‘সামাবাদী’ ‘মানুষ’ ‘নারী’ প্রভৃতি অসংখ্য কবিতা ও গানে বিশ্ব মানবতার আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। তাই নজরুলকে ‘মানবতাবাদী কবি’ বলা হয়। নজরুল ব্যক্তিগত জীবনেও যথেষ্ঠ মানবতাবাদী ছিলেন। ধর্মীয় বেড়াজাল, বংশীয় আশরাফ, আতরাফের শ্রেণীবিভেদ, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ধনী-গরীব অঙ্গীয় সৌষ্ঠবের সাদা-কালো বিভেদ এসব কিছুই নজরুল অত্যন্ত সজাগ ও আত্মজ অনুভূতিতে একাকার করে দেখেছেন। তাই নজরুল ছিলেন স্বভাবজাত ‘মানবতাবাদী কবি’।

তারুণ্যের কবি

নজরুলকে ‘তারুণ্যের কবি’ বলা হয়। নজরুল সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তারুণ্যের জয়গান। যেমন-

ক) চল্ চল্ চল্ ...
খ) থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে ...
গ) ছাত্র দলের গান ...

এসব গান ও কবিতা বাংলা তরুণ ও সুর সমাজকে বিশেষভাবে উজ্জীবিত করে। নজরুল নিয়ত তরুণদের মতো ভাঙা গড়ার খেলায় সাধনা করেছেন। যৌবনের জয়গান নজরুল সাহিত্যের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। সমাজ বিনিমার্ণে তরুণ ও যুব সমাজকে কবি নজরুল বারংবার বিভিন্নভাবে আহ্বান জানিয়েছেন। তাই নজরুলকে ’তারুণ্যের কবি’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

বহু ভাষায় কবি

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা, উর্দু, আরবী, ফার্সি, ইংরেজি, হিন্দী, সংস্কৃতি প্রভৃতি ভাষা জানতেন এবং এ সকল ভাষায় তিনি সাহিত্য চর্চাও করেছেন। বাংলা সাহিত্যে কেন বিশ্ব সাহিত্য খুঁজলেও এতো অধিক ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার নজির মেলা ভার। বিশ্বে অনেক বহু ভাষাবিদ আছেন যেমন- ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ কিন্তু বিশ্বের অন্যতম ৭টি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার দৃষ্টান্ত কেবল শুধু নজরুলই দেখিয়েছেন। শুধু বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য চর্চাই নয় বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে সাহিত্য চর্চার দৃষ্টান্ত কেবল নজরুল সাহিত্যেই অধিক পরিমাণে প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন-

ক) দাঁড়ি মুখে সারিগান লা শরীক আল্লাহ
খ) আলগা করগো খোপার বাঁধন দিল উহি মেরী ফাঁস গায়ী 

দার্শনিক কবি 

বিশ্বের প্রায় সকল কবি ভাবনার গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃতির রূপ রস আস্বাদন করেন কিন্তু সকল কবি দার্শনিক কবি হয়ে ওঠেননি। কবি নজরুল ভাব বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করার পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, মনতত্ত্ব নির্ভর করে অনেক দার্শনিক তত্ত্বকে উন্মোচিত করেছেন। এগুলো যদিও সুফিবাদের আলোকে গড়ে ওঠা বাউল সঙ্গীত,ভাব সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে,তবু মধ্যে ফুটে উঠেছে নজরুলের নিজস্ব দর্শন। যেমন-

ক) মোরে ’আমি’ ভেবে তারে স্বামী বলি দিবাযামী নামি উঠি/কভু দেখি-আমি তুমি যে অভেদ কভু প্রভু বলে ছুটি।
খ) আমি ছিনু পথ ভিখারিনী তুমি কেন পথ ভুলাইলে/মুসাফিরখানা ভুলায়ে আনিলে কোন এই মঞ্জিলে?

স্বাধীনতার কবি

বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে নজরুলের ভূমিকা অনেক বেশি সাহসী ওব্যাপক। কবি নজরুল প্রথম বাঙালি, যিনি বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ধূমকেতু পত্রিকায় তিনি বলেন,‘ও সব স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, চাই ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা’। নজরুল আরও বলেন,‘ভারতের এক পরমানু অংশও বৃটিশ শাসনাধীন থাকবে না’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানবিরোধী আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন একককোন কবির গান প্রচারের ক্ষেত্রে নজরুলের কবিতা গানই ছিল সর্বাধিক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যুদ্ধ চলাকালীন নজরুলের পায় ষোলটি গান ও কবিতা বারংবার প্রচার বরা হত । এসব গান ও কবিতার মধ্যে ’শিকল পরা ছল মোদের ঐ শিকল পরা ছল’, ’কারার ঐ লৌহ কপাট’, ’ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’, ’চল-চল-চল’ প্রভৃতি অন্যতম । আর এসব কারণেই নজরুলকে ’স্বাধীনতার কবি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। 

পরিশেষে বলা যায়,নজরুল! মানবতার জয়গানে মুখর এক মহান শিল্পী, এক মহান সাধক দ্রোহ, প্রেম ও সুন্দরের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সমাজের সমস্ত অনাচার, মিথ্যাচার, কুসংস্কারের দূলর্ঘ প্রাচীর ভেঙ্গে যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণমুক্ত একটি শান্তিময় সমাজের। তিনি আর নেই এই মাটির পৃথিবীতে। জীবনের সমস্ত মেধা, যোগ্যতা, শক্তি ক্ষমতার শেষ কপর্দক পর্যন্ত অন্যায়, অত্যাচারের নিগুঢ় হতে পরাধীনতার জিন্দান হতে মানবতার মুক্তির জন্য উৎসর্গ করে অবশেষে বিধাতার অমোঘ নিয়মে জীবনের সমস্ত অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে জঞ্জালময় এ পৃথিবীকে পেছনে ঠেলে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন ওপারের সুন্দর ভুবনে। তিনি চলে গেছেন। কিনÍু রেখে গেছেন তাঁর জীনের অমূল্য কীর্তি গাঁথা। মানবতার মুক্তির পথ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একটি জীবন্ত ইতিহাস তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্য ।তাকে পুঁজি করে বিক্ষুব্ধ অন্যায়, অত্যাচারে ছেয়ে যাওয়া, অসহায় মানবতার আর্তচিৎকারে সদা কম্পমান এদেশের বিরাজমান করুণ পরিস্থিতি হতে উত্তরণের জন্য যাত্রা শুরুর সময় এসেছে । অবচেতন হয়ে সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন তার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত না থেকে সচেতনতার, জাগরণের আর উত্থানের মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে নতুন শপথে নতুন উদ্দীপনায় সবাই বেরিয়ে আসি- যাত্রা শুরু করি অপেক্ষমান আলোকিত গন্তব্যের দিকে; একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত রেখে । নজরুল যে আমাদেরকে ডাকছেন উদাত্ত কন্ঠে-  ”বেরিয়ে এসো-বেরিয়ে এসো;

 বিবরের অন্ধকার হতে
 এই রুদ্র দগ্ধ তপ্ত দিবালোকে
 হে আমার বিষধর কাল-ফনীর দল?”

গ্রন্থপঞ্জী 

ক. নজরুল রচনাবলী-
খ. নজরুলের পত্রাবলী
গ. ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত/সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ
ঘ. নজরুলঃ আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি এবং শিল্পীর বোধ/ড. সৌমিত্র শেখর
ঙ. উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র, নিবন্ধমালা,২০০৯
চ. নজরুলের ডায়েরী, নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, চবি/ড. মাহবুবুল হক
ছ. নজরুল কাব্যে ঐতিহ্যের স্বরূপ/প্রখ্যাত নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমেদ

মুহাম্মদ এহছানুল হক মিলন: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, হাজেরা-তজু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম ।


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]