ধর্ম ও জীবন
যিলহজ, হজ ও কুরবানি: গুরুত্ব, ফজিলত ও কিছু কথা
যিলহজ, হজ ও কুরবানি: গুরুত্ব, ফজিলত ও কিছু কথা





মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর
Thursday, Jul 15, 2021, 7:16 am
Update: 15.07.2021, 7:21:45 am
 @palabadalnet

আরবি বার মাসের সর্বশেষ মাস- যিলহজ। এ মাসে রয়েছে ইসলামের মূল পাঁচ ভিত্তির অন্যতম- হজের বিধান এবং মুসলিম উম্মাহর দুটি উৎসবের একটি- ঈদুল আযহা। ইসলামের মহান দুটি শিআর ও নিদর্শন- হজ ও কুরবানি। রয়েছে ইয়াওমে আরাফা, আইয়ামে তাশরিক এবং যিলহজের বরকত ও ফজিলতপূর্ণ প্রথম দশক।

যিলহজ মাস ‘আশহুরে হুরুম’ তথা ইসলামের সম্মানিত চার মাসের অন্যতম প্রধান ফজিলতপূর্ণ মাস। পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ যেদিন আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার কাছে তার বিধান মতে বারটি। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।” -সুরা তাওবা (৯) : ৩৬

এ চার মাস কী কী? হাদিস শরীফে তা বলে দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-জমিনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল। (কারণ, জাহেলি যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমত মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগপিছ করে রেখেছিল।) বার মাসে এক বছর । এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক- যিলকদ, যিলহজ ও মুহাররম। আরেকটি হলো রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস।” -সহীহ বুখারী, হাদিস ৪৬৬২

আর এ চার মাসের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ মাস হলোো পবিত্র যিলহজ মাস। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জেনে রেখো! সবচেয়ে সম্মানিত মাস হলো, তোমাদের এই মাস (যিলহজ)।” -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৯৩১; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১১৭৬২

তাই ইসলামের দৃষ্টিতে এ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যমণ্ডিত। কুরআন ও হাদিসে এ মাসের জন্য বিশেষভাবে যে কয়টি আমলের কথা উল্লেখ হয়েছে এখানে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোো

আশারা যিলহজ বা যিলহজের প্রথম দশক: গুরুত্ব ও ফজিলত

যিলহজ মাস সম্মানিত মাস। আর এ মাসের প্রথম দশক সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা কসম করে বলেন, “শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির।” -সুরা ফাজর (৮৯) : ১-২

এখানে ‘দশ রাত্রি’ দ্বারা যিলহজের প্রথম দশ রাত উদ্দেশ্য। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হযরত ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ পূর্ববর্তী পরবর্তী অনেকেই এমনটি বলেছেন। -তাফসিরে ইবনে কাসীর, সুরা ফাজর দ্রষ্টব্য

হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহর কাছে যিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয় কি? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তম, যে নিজের জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে। অতপর কোনো কিছু নিয়ে ঘরে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করেছে)।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদিস ৯৬৯; জামে তিরমিযী, হাদিস ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৭২৭; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৯৬৮

অতএব মুমিন বান্দার উচিত যিলহজ মাসে নেক আমলের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া। বিভিন্ন নেক আমলের প্রতি আরো অগ্রসর হওয়া। কেননা এ মাসের আমলগুলো আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

বেশি বেশি করি ‘তাকবির, তাহলোিল ও তাহমিদ’

হাদিস শরীফে এ মাসের আমলের ব্যাপারে বলা হয়েছে: “আল্লাহ তাআলার কাছে আশারায়ে যিলহজের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ তাসবিহ পাঠ করো।” -মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৫৪৪৬; আদদাআওয়াতুল কাবীর, তবারানী, হাদিস ৫৩৪

এ মাসে এসকল যিকিরের মাধ্যমে আমরা আমাদের জবানকে সতেজ রাখতে পারি। তেমনিভাবে অন্যান্য নফল ইবাদতের মাধ্যমেও রাখতে পারি এ মাসকে প্রাণবন্ত। বিশেষ করে প্রথম দশক।

এ দশকে মনোযোগী হই রোজার প্রতি

হাদিস শরীফে বিশেষভাবে এ সময় রোজা রাখার কথা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত এ দশক (৯ দিন) রোজা রাখতেন। হাদিস শরীফের মৌলিক গ্রন্থগুলোতে এ দশকে রোজা রাখার ব্যাপারে স্বতন্ত্র অধ্যায় নির্ধারিত হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজের নয়টি দিবসে (সাধারণত) রোজা রাখতেন।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২২৩৩৪; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদিস ৮৩৯৩

উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, “চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোজা, যিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোজা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।” -সুনানে নাসায়ী, হাদিস ২৪১৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৬৪২২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৬৩৩৯

অতএব সম্ভব হলোে এ দশকে রোজা রাখার প্রতি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। পুরো নয় দিন রোজা রাখতে কষ্ট হলোে যে কয়টি সম্ভব সে কয়টি রাখতে পারি। তাতেও সাওয়াব হবে ইনশাআল্লাহ।

যিলহজ শুরু হয়েছে: নখ-চুল না কাটি, না ছাটি

এছাড়া এ দশকের একটি বিশেষ আমল হলোো- যিলহজের চাঁদ ওঠা থেকে নিয়ে কুরবানি করা পর্যন্ত নখ-চুল না কাটা। এতে একদিকে হাজী সাহেবানের সাথে একরকম সাদৃশ্য প্রকাশ পায়। পাশাপাশি এর জন্য রয়েছে বিশেষ ফজিলতও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যখন যিলহজের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানি করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে।” -সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদিস ১৫২৩

অতএব যিলহজ আগমনের আগেই নখ-চুল কেটে ছেটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা কুরবানি করবেন তারা এ আমলের প্রতি তো যত্নবান হবেনই। আর বিভিন্ন বর্ণনা ও সাহাবা-তাবেয়ীনের আমলের নিরিখে এ-ও বুঝে আসে যে, যারা কুরবানি করবেন না তারাও এ ফজিলতপূর্ণ আমলে শরীক হতে পারেন। এমনকি এসময় বাচ্চাদের চুল-নখ কাটা থেকে বিরত থাকাও ভালো; যা সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল থেকে বোঝা যায়। (দ্রষ্টব্য: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪৩৬৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস ৭৫২০; আল মুহাল্লা, ইবনে হাযম ৬/২৮)

ইয়াওমে আরাফা: গুরুত্ব ও ফজিলত

যিলহজ মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস হলোো নয় তারিখ। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী- ‘ইয়াওমু আরাফা’। এ দিনটি হজের মূল দিন। আরাফার ময়দানে হাজী সাহেবানের উকূফ-অবস্থান এ দিনেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা এ দিনকে বিশেষ সম্মানে ভ‚ষিত করেছেন। দ্বীন-ইসলামকে পূর্ণতার ঘোষণা দিয়েছেন এ দিনেই। এ দিনেই নাযিল হয়েছে কুরআনে কারীমের সর্বশেষ আয়াত, “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।” -সুরা মায়েদা (৫) : ৩

এ দিনে বান্দার দিকে রবের রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে উৎসারিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে থাকেন এ দিনে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফিরিশতাদের নিকট গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা?” -সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪৮

জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় রয়েছে: “আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসামানের অধিবাসী অর্থাৎ ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। বলেন, দেখ তোমরা- আমার বান্দারা উস্কোখুস্কো চুলে, ধুলোয় মলিন বদনে, রোদে পুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আজাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না।” -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩৮৫৩

 যে দিনের রোজায় মাফ হয় দুই বছরের গুনাহ

এ দিনের একটি রোজায় বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আরাফার দিনের (নয় যিলহজের) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে, তিনি আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।” -সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২

প্রকাশ থাকে যে, হাদিসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। অতএব যে এলাকা যখন যিলহজের নয় তারিখে উপনীত হবে সে এলাকায় তখন এ বিধান প্রযোজ্য হবে।

যিলহজের ফজিলতপূর্ণ প্রথম দশকের মাঝে যেহেতু ইয়াওমে আরাফা তথা নয় যিলহজ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাই অন্যান্য দিনের তুলনায় এ দিবসটিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথেই আমলে নেওয়া চাই। পুরো দশক সম্ভব না হলোেও কমপক্ষে এ দিনে রোজা রাখার চেষ্টা করি। নেক আমলে আরো আগ্রগামী হই। যিকির, দোয়া, ইস্তিগফার, সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি তাসবীহ বেশি বেশি পাঠ করি। যেহেতু এ দিবসে মহান মালিকের পক্ষ থেকে ব্যাপক ক্ষমার ঘোষণা এসেছে, বিশেষ করে হাজী সাহেবানের জন্য, সেখানে আমরাও দূরদেশ থেকে সেই ব্যাপক ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভ করতে উন্মুখ হই।

হাদিস শরীফে আরাফার দিনের দোয়াকে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে। নবীজী বলেন, শ্রেষ্ঠ দোয়া (-যিকির) আরাফার দোয়া। দোয়া-যিকির হিসেবে সর্বোত্তম হলো ওই দোয়া, যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ করেছেন। তা হলো- لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -জামে তিরমিযী, হাদিস ৩৫৮৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদিস ৩৭৭৮

অতএব আমরা এ দোয়াটির প্রতিও বিশেষ ইহতিমাম করতে পারি।

হজ: এ মাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল

হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং মর্যাদাশীল ইবাদত। ইসলামের মৌলিক পাঁচ ভিত্তির একটি এবং শাআইরুল ইসলামের অন্যততম প্রধান শিআর। হজের মূল কার্যক্রম পালিত হয় মূলত এ মাসেই। আর তাই এদিকে নিসবত বা সম্বন্ধিত করে এ মাসের নাম যুল হিজ্জাহ বা যিলহজ মাস। নানাবিধ শিক্ষা, তত্ত্ব ও তাৎপর্য ধারণকারী একটি ইবাদতের নাম ‘হজ’। আল্লাহ তাআলা এ বিধানকে ফরয করে দিয়েছেন তার সামর্থ্যবান বান্দার জন্য। আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার জন্য অবশ্যকর্তব্য। আর যে (এই নির্দেশ পালন করতে) অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন।” -সুরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭

অতএব হজ ফরয হওয়ার পর তা পালনে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা চাই। হজের মতো ইবাদত আদায়ে গড়িমসি করা অন্তত মুমিনের শান হতে পারে না। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলছেন- ‘আর যে (এই নির্দেশ পালন করতে) অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন।’ এরকম কঠোর কথা শোনার পর একজন মুমিন এ ব্যাপারে উদাসীন হয় কী করে!

মুমিন মাত্রই আল্লাহর ঘরে হাজিরা দেবার জন্যে উদগ্রীব থাকে। সে শুধু প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে কখন তার রব তাকে ডেকে বসবেন আর সে লাব্বাইক বলে সেই ডাকে সাড়া দেবে! শুভ্র সফেদ ধবধবে দু টুকরো কাপড় গায়ে জড়িয়ে বলবে- আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিআমত আপনারই এবং সকল রাজত্ব। আপনার কোনো শরীক নেই।

তারপর সে যখন আরো শোনে জবানে নববীতে এই ঘোষণা- “যে ব্যক্তি একমাত্র অল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং কোনো অশ্লীল কাজ বা গুনাহে লিপ্ত হয় না, সে যেন সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে।” -সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫২১

আরো যখন শোনে- “ মাবরূর (মকবুল) হজের প্রতিদান তো কেবল জান্নাতই।” -সহীহ বুখারী, হাদিস ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪৯

তখন ঈমানের ছিটেফোঁটা ধারণকারী একজন মুমিনের মনের মাঝে যে কী তোলপাড় সৃষ্টি হয় সেই কাবার পানে ছুটে যাওয়ার জন্য, কীভাবে যে সে নিজেকে সম্বরণ করে- তা সেই কাবার রবই ভালো জানেন! আল্লাহ তাআলা সকল মুমিন মুমিনাতকে হজে মাবরূর নসীব করুন এবং বারবার নসীব করুন- আমীন।

আম্বিয়া কেরামের পুণ্য স্মৃতি বিজড়িত সেই হিজায ভূমি! সেই মিনা, আরাফা, মুযদালিফা; সেই নামায দোয়া রোনাযারী; সেই মাতাফ তাওয়াফ সাঈ; সেই কালো ঘর, কালো গেলাফ, কালো পাথর, বাইতুল্লাহ, হাতীম ও মাকামে ইবরাহীম; আহ্! যমযম, মুলতাযাম আর মীযাবে রহমত; তারপর চির স্বপ্নের সোনার মদীনায় হাজিরী; সেই রওযায়ে আতহার, বাবুস সালাম, রিয়াযুল জান্নাহ; সেই জান্নাতুল বাকি, জান্নাতুল মুআল্লা; উহুদ খন্দক হোদাইবিয়া... এ স্মৃতি চিহ্নগুলো একজন মুমিনের হৃদয়গভীরে কী আন্দোলন সৃষ্টি করে, কীভাবে যে বিষয়গুলো তার দেহমন ছুঁয়ে যায়, তার ঈমান-একীন আমল-আখলাককে যে কীভাবে শিহরিত করে...!

ইয়াওমুন নাহর বা কুরবানির দিন: এ মাসের সবচে মহিমান্বিত দিবস

যিলহজ মাসের সবচে মহিমান্বিত দিবস ১০ যিলহজ বা কুরবানির দিন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ইয়াওমুন নাহর। এ দিবস রাব্বুল আলামীনের নিকট অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মুসলিম উম্মাহ গোটা বিশ্বজুড়ে এ দিনে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাছিলের জন্য পশু কুরবানি করে থাকে। বস্তুত এটা ইসলামের অনেক বড় একটি আমল এবং গুরুত্বপূর্ণ শিআর-পরিচয় চিহ্ন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “কুরবানির উট (ও গরু)কে তোমাদের জন্য আল্লাহর ‘শাআইর’ (নিদর্শনাবলি)-এর অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ। সুতরাং যখন তা সারিবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়ানো থাকে, তোমরা তার ওপর আল্লাহর নাম নাও। তারপর যখন (জবেহ হয়ে যাওয়ার পর) তা কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার গোশত হতে নিজেরাও খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও, এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে। এভাবেই আমি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” -সুরা হজ (২২) : ৩৬

বস্তুত কুরবানির জন্য উৎসর্গিত পশু আল্লাহ তাআলা নিজ মেহেরবানীতে বান্দার জন্য হালাল করে দিয়েছেন; পূর্ববর্তী উম্মতের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য ছিল না। এটা মূলত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে তার হাবীবের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতের জন্য মেহমানদারি। দশ যিলহজসহ মোট চার দিন রোজা রাখা হারাম করা হয়েছে যেন বান্দা এ মেহমানদারী গ্রহণ করে। তাই সাগ্রহে কুরবানির গোশত নিজেরাও খাব এবং অন্যদেরও বিতরণ করব। বিশেষ করে যারা অভাবী তাদের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখব।

একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য ত্যাগ স্বীকারের নাম কুরবানি

আর কুরবানি করব একমাত্র আল্লাহর জন্যই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর কাছে না পৌঁছে তাদের (কুরবানির পশুর) গোশত আর না তাদের রক্ত, বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। এমনিভাবে তিনি সেগুলো (পশুগুলো) তোমাদের জন্য বশ করে দিয়েছেন। যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। কারণ, তিনি তোমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন। আর আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।” -সুরা হজ (২২) : ৩৭

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, “আপনি বলে দিন, নিশ্চয় আমার রব  আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, (যা) বিশুদ্ধ ধর্ম, ইবরাহীমের দ্বীন, যিনি ছিলেন (আল্লাহর আনুগত্যে) একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি (ব্যাপক অর্থে সকল ইবাদত), আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তার কোনো শরীক নেই। আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি। এবং আমি মুসলিমদের একজন। -সুরা আনআম (৬) : ১৬১-১৬৩

এ দিনকে ঘোষণা করা হয়েছে এ উম্মতের ঈদ

ইয়াওমে আরাফায় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ব্যাপক ক্ষমা প্রাপ্তির ঘোষণা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর নামে নিজের প্রিয় পশু উৎসর্গ করার সৌভাগ্য অতঃপর উৎসর্গিত পশু থেকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মেহমানদারি লাভের আনন্দ ও শুকরিয়া আদায়ের জন্য এ দিনকে মুসলমানদের জন্য ঈদ সাব্যস্ত করেছেন মহান রাব্বুল আলামীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ, এ দিবসে কুরবানি করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।” -মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৫৯১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪৩৬৫

কুরবানি: নবীজী সরাসরি নির্দেশিত হয়েছেন যে আমলের

আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআনে কারীমে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেন- “আমি অবশ্যই তোমাকে কাউসার দান করেছি। সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি করো।” -সুরা কাউসার (১০৮) : ১-২

এজন্য নবীজী সারা জীবন কুরবানি করে এসেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, “নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার দশ বছরের প্রতি বছরই কুরবানি করেছেন।” -জামে তিরমিযী, হাদিস ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৪৯৫

যিলহজ মাসের দশ-এগার-বার এই তিন তারিখ কুরবানির দিন। উত্তম হলো দশ তারিখেই কুরবানি করা। কারণ ইয়াওমুন নাহর মূলত যিলহজের দশ তারিখই। অতএব যে ব্যক্তি এ তিন দিনে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব।

কুরবানি: একটি ওয়াজিব আমল

কুরবানি নামায-রোজার মতো ফরয না হলেও অন্যান্য সাধারণ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসগুলোর মাধ্যমে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয়।

এছাড়া বিষয়টি আরো জোরালোভাবেও বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” -মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস ৭৫৬৬

কোনো বর্ণনা অনুযায়ী বক্তব্যটি মারফ‚ হাদিস হিসাবেও এসেছে। দ্রষ্টব্য : মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৮২৭৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩১২৩; মুসতাদরাকে হাকেম ৪/২৩২

অতএব সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তিকে ১০, ১১, ১২ তারিখের মধ্যে কুরবানির এ আমল করতে হবে। কুরবানি একটি আর্থিক ইবাদত। যার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে তার নামে অবশ্যই কুরবানি হতে হবে। যাকাত যেমন আর্থিক ইবাদত। যার উপর যাকাত ফরয হয় তার পক্ষ থেকে অবশ্যই তা আদায় করতে হয়। একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয হলোে যেভাবে একজন যাকাত আদায় করা যথেষ্ট নয় তেমনি একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হলোে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কুরবানি যথেষ্ট নয়। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী যারই সামর্থ্য থাকবে তারই কুরবানি হতে হবে। নতুবা এ দায় তার উপর রয়ে যাবে।

অনেক সময় কুরবানিকে সুন্নত বলে ব্যাপারটিকে হালকা করতে দেখা যায়। বিষয়টি আদৌ এমন নয়। কুরবানি ইসলামের শিআর। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব আমল। যেসকল ফকীহ একে সুন্নত বলেছেন, তাদের মতে এটা এমন গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতে মুআক্কাদাহ মর্যাদার বিচারে যা ওয়াজিব পর্যায়ের এবং যা তরক করলে গুনাহ হবে। তাই কুরবানিকে ওয়াজিব বলুন আর সুন্নত, ফলাফলের বিচারে তা কাছাকাছি। অর্থাৎ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যকীয় আমল।

তাই যাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে তারা অবশ্যই কুরবানি আদায় করব। আর যাদের উপর ওয়াজিব নয় সম্ভব হলো তারাও কুরবানি করব। কেননা কুরবানি একটি ফজিলতপূর্ণ আমল।

হজ ও কুরবানি নিয়ে প্রোপাগান্ডা

সঙ্গত কারণে এখানে এ বিষয়টিও উল্লেখ করা জরুরি মনে হচ্ছে যে, হজ ও কুরবানির মৌসুম এলে কোনো কোনো মহল থেকে ইবাদত দুটির ব্যাপারে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নানারকম অপ্রীতিকর মন্তব্য ও আপত্তি উত্থাপন করতে শোনা যায়। এসকল প্রোপাগাণ্ডায় প্রভাবিত হওয়া মুমিনের শান নয়। মুমিনের শান ও মান তো কেবল আল্লাহর হুকুমের সামনে আত্মসমর্পণের মাঝেই নিহিত। আর এ মহান শিক্ষা ও তরবিয়ত রয়েছে ইবাদত দুটির পরতে পরতে।

কখনো কখনো কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করাকে মানবিকতার প্রশ্নে তোলা হয়। এটা অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং অবান্তর আপত্তি। অন্যান্য ধর্মাচারে পশু উৎসর্গের যে কালচার আর ইসলামে কুরবানির যে বিধান তার মাঝে কি আসমান জমিনের ফারাক নজরে পড়ে না! ইসলাম পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও যে আদাব ও নীতিমালা রেখেছে তা দেখেও কি অন্ধ চোখগুলো আলো পাবে না! একটি হাদিস শুনুন, হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা সকল কিছুর ওপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অতএব যখন তোমরা (শরীয়তের হুকুম মোতাবেক শাস্তি হিসেবে কাউকে) হত্যা করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা কর। যখন জবেহ করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে যবেহ কর। প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দিয়ে নেবে এবং তার পশুকে শান্তি দেবে।” -সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৮১৫; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪৪০৫; জামে তিরমিযী, হাদিস ১৪০৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩১৭০

একটু লক্ষ করুন তো, এ হাদিসটির শব্দে শব্দে কত গভীর মর্ম নিহিত রয়েছে!

আফসোসের কথা হলো, ইবাদতের ক্ষেত্রে অর্থ খরচ নিয়ে গরিবের বন্ধু সেজে নানা উপদেশ দিতে, বরং অতিমাত্রায় দরদী সাজতে দেখা গেলেও সমাজের নানা বিলাসিতা ও অনাচারে যে সম্পদ অপচয় ও নষ্ট হয় তা নিয়ে তো তেমন কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যায়ই না; উপরন্তু তাতে আরো পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা যায় এদেরকে। মূলত সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আমলকে হুমকির মুখে দাঁড় করানোই থাকে এদের টার্গেট। অতএব কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত না হয়ে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই হবে আমাদের কুরবানি।

আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারি: নিজেও গ্রহণ করব, অন্যকেও শরীক করব

আমরা কুরবানি করব, আল্লাহ তাআলার মেহমানদারি গ্রহণ করব। আল্লাহ তাআলার হুকুম মোতাবেক কুরবানির গোশত নিজেরাও খাব আল্লাহর বান্দাদেরও মেহমানদারীতে শরীক করব। আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এটাও একটা মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-.

“তারপর যখন (জবেহ হয়ে যাওয়ার পর) তা (পশুগুলো) কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার গোশত হতে নিজেরাও খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও, এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে। এভাবেই আমি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” -সুরা হজ (২২) : ৩৬

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর এক বর্ণনায় এসেছে- “খাও, সংরক্ষণ কর এবং সদকা করো।” -সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৭১

বিশেষ করে সঙ্কটকালীন এ মুহূর্তে আল্লাহর বান্দাদের প্রতি খেয়াল করা আমাদের বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুরবানি না করে অর্থ দানের ‘অতি উপদেশ’ নয়; বরং কুরবানি করে এর গোশতের অধিকাংশ বিলিয়ে দেওয়া এসময়ের কর্তব্য।  এ আমাদের নবীজীর শিক্ষা। হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “তোমরা যারা (এবছর) কুরবানি করেছ তাদের বাড়িতে যেন তিন দিনের পরে কুরবানির (গোশতের) কোনো অংশ অবশিষ্ট না থাকে। (সাহাবীরা এমনটিই করলেন)। পরের বছর কুরবানি এলে তারা জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূল! গত বছর যেমন করেছি (অর্থাৎ তিন দিনের পরে কুরবানির আর কোনো গোশত জমা রাখিনি; বরং সব বিলিয়ে দিয়েছি) এবছরও কি তেমন করব? তখন নবীজী বললেন, (এ বছর) তোমরা (তিন দিনের পরেও) খেতে পার, জমা করেও রাখতে পার। গত বছর মানুষের অভাব ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা (কুরবানির গোশতের মাধ্যমে) মানুষকে সহায়তা কর, মানুষের পাশে দাঁড়াও।” -সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৬৯

সুতরাং শুধু কুরবানির গোশত দ্বারা নয়; সাধারণ দান-সদকার অর্থ দ্বারাও বিত্তবানরা অভাবীদের পাশে দাঁড়াবেন। করুণা মনে না করে নিজের দায় থেকে তাদের প্রতি এগিয়ে আসবেন। বিশেষ করে ওইসকল ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন, যারা প্রয়োজনগ্রস্ত, অথচ নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারে না।

কুরবানিতে লক্ষ্য রাখি পরিচ্ছন্নতার প্রতি

ইসলাম এমনিতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার তালিম দেয়। কুরবানি করার ক্ষেত্রেও আমরা সে বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখব। কুরবানির পর বর্জ্য-আবর্জনা যথাস্থানে ফেলব। সম্ভব হলোে পুঁতে ফেলব। দুর্গন্ধ যাতে না ছড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখব। আমার শহর-নগর, এলাকা-মহলো্লা ও বাড়ির আঙিনা ইত্যাদি নিজ দায়িত্ব ও উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং দূষণমুক্ত রাখব। যাতে আল্লাহ তাআলার এ হুকুম পালনের মাঝে ইসলামের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষারও প্রকাশ ঘটে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সতর্কতা-সচেতনতার সাথে সাথে রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক তৎপরতা কাম্য। বিশেষ করে শহরগুলোর বর্জ্য অপসারণের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা খুবই সুসংহত হওয়া জরুরি। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করুন- আমীন।

আইয়ামে তাশরিক: যিকির, তাকবির ও পানাহারের দিন

নয় যিলহজ ফজর থেকে নিয়ে তের যিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত। এ সময়ের প্রত্যেক ফরয নামাযের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। তাকবীরে তাশরিক হলো:  সর্বমোট পাঁচ দিন তাকবীরে তাশরিক বলা হলেও পরিভাষায় এগার, বার ও তের যিলহজকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়। (দ্রষ্টব্য. মাউসুআ ফিকহিয়্যা কুয়েতিয়্যা ৭/৩২৫)

কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করো।” -সুরা বাকারা (২) : ২০৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আইয়ামে তাশরিক পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের দিন।” -মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২০৭২২; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৪১

তো দেখা যাচ্ছে, এ দিনগুলো বেশি বেশি তাকবীর ধ্বনি উচ্চকিত করার দিন। সাহাবায়ে কেরাম এই দিনগুলোতে তাকবীর ধ্বনি তুলতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও হযরত আবু হুরাইরা রা. বাজারে গিয়ে তাকবীরের আওয়াজ তুলতেন। শুনে শুনে লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীরের ধ্বনি তুলত। -সহীহ বুখারী, বাবু ফাদলিল আমাল ফী আইয়ামিত তাশরিক; ফাতহুল বারী ২/৪৫৭

অতএব আমরা এ দিনগুলোতে যিকির ও তাকবির পাঠের খুব ইহতিমাম করব।

হাদিসে এ-ও বলা হচ্ছে যে, এ দিনটি হলো পানাহারের দিন। ইমাম মুসলিম রাহ. এ হাদিসটি উল্লেখ করেন ‘আইয়ামে তাশরিকে রোজা রাখা হারাম’ অধ্য


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]