শিল্প-সাহিত্য
জিম করবেট, ‘ম্যান লাভার অফ কুমায়ুন’
জিম করবেট, ‘ম্যান লাভার অফ কুমায়ুন’





অনিরুদ্ধ সরকার
Wednesday, Dec 30, 2020, 1:41 am
 @palabadalnet

নৈনিতাল। নভেম্বরের এক শীতের সকাল। হালকা রোদ উঠেছে। এক শিকারি তার বাড়ির বাগানে চারাগাছ রোপণে ব্যস্ত। চারাগাছ রোপণ শেষে সে গেল জঙ্গলে আর নিজের বন্দুকগুলি মাটিতে পুঁতে ইতি টানল শিকার জীবনের। বাড়ি ফিরে  দিদি ম্যাগিকে সঙ্গে নিয়ে নীরবে চিরদিনের মত ভারত ছাড়ল সে। এই শিকারিকে সারা বিশ্ব একডাকে চেনে ‘জিম করবেট’ নামে। ১৯৪৭ এর অগস্টে ভারত স্বাধীন হয়। আর সেবছর নভেম্বরে জিম ভারত ছাড়েন।  জিমের ভারত ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য সবার মতামত ভিন্ন। কেউ মনে করেন জিম ভেবেছিলেন ভারত স্বাধীন হওয়ার ফলে বিদেশি বলে তাদের ওপর আক্রমণ আসতে পারে তো কেউ ভেবেছিলেন জিমের শিকারের প্রতি টান কমে এসেছিল। আবার কেউ বা বলছেন বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য সারা বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছিলেন জিম। যা ভারতে থেকে সম্ভব ছিল না। তাই জিমকে ভারত ছাড়তে হয়েছিল।  জিম করবেট, যাকে সবাই ‘শিকারি’ হিসেবে একডাকে চেনে তার পশুপ্রেমের কথা কথা কিন্তু খুব কমজনই জানেন। পরাধীন ভারতে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতা জিম করবেটকেও খুব বেশি মানুষজন  চেনেন না। জিম করবেট ছিলেন এক বিরল শিকারি যিনি অকারণে একটি প্রাণীকেও হত্যা করেন নি। উলটে চেষ্টা করেছেন তাদের রক্ষা করার।

নৈনিতালের মানুষজন কষ্ট পাবে ভেবে নীরবে দেশ ছেড়েছিলেন জিম ও তার দিদি। নৈনিতালে তাদের সাধের ‘গার্নি হাউস’ বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর নৈনিতাল থেকে প্রথমে লখনউ। সেখান থেকে মুম্বই। তারপর মুম্বই বন্দর থেকে ‘এস এস অ্যারোন্দা’ জাহাজে চড়ে মোম্বাসা। সেখান থেকে নাইরোবি। পরে তারা আস্তানা গাড়েন নিয়েরে। জার্মানদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ওই অঞ্চলটি তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ। ইওরোপিয়ানদের সঙ্গে জিমের কোনোকালেই খুব একটা পটত না, নিয়েরেও তাই হল। সেখানে লেখালেখির মধ্য দিয়েই দিন কাটতে লাগল করবেটের। দুর্ধর্ষ সব অভিযানের কাহিনিগুলো একের পর এক লিখতে লাগলেন জিম। বেশ দিন কাটছিল হেসে-খেলে- লিখে। কিন্তু শান্তি বেশিদিন স্থায়ী হল না। হঠাৎ একদিন পেলেন গুলির শব্দ। জিমের শিকারি মন আবার চঞ্চল হয়ে উঠল। নিজের রাইফেলগুলো নৈনিতালের জঙ্গলে পুঁতে এলে কী হবে, আফ্রিকার জঙ্গলে  গুলিগোলার শব্দ শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না জিম। ছুটে গেলেন দেখতে। আর জঙ্গলে গিয়ে যখন দেখলেন নির্বিচারে পশুহত্যা চলছে তখন তা জিমকে বিচলিত করে তুলল। ‘শিকারি জিম’ ততদিনে পুরোপুরিভাবে ‘পশুপ্রেমিক জিম’ হয়ে গেছেন। কেনিয়ায় নির্মম পশুহত্যা রুখতে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ আন্দোলন শুরু করলেন জিম। বহুমানুষ তাতে সামিল হল। তার নেতৃত্বে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলন সারা আফ্রিকা জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করল। জিমের নাম ছড়িয়ে পড়ল সারা আফ্রিকা জুড়ে। তিনি তখন ‘ট্রি টপস’নামে একটি বই লিখছিলেন। সেটি সবে শেষ হয়েছে। ১৯৫৫ র ১৯ এপ্রিল না ফেরার দেশে চলে গেলেন জিম। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন জিম। তাকে সমাধি দেওয়া হল কেনিয়ার সেন্ট পিটার্স অ্যাঙ্কলিন চার্চ সিমেট্রিতে।

জিম করবেট মানে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক সফল শিকারির ছবি। সবাই যখন শিকারে ব্যর্থ হত তখনই জিম করবেটের ডাক পড়ত। আর জিম অনায়াসে শিকারে সফল হয়ে দেখিয়ে দিতেন তিনিই সেরা। শিকারি হিসেবে অসম্ভব  সাহসী ছিলেন জিম। তিনি বরাবর শিকারে চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসতেন। তার সঙ্গীসাথীদের কথায়, “জিম কেবল এলাকাবাসী বা সরকারের অনুরোধেই শিকারে যেতেন আর তিনি কখনো শিকারে ব্যর্থ হননি। দিনের শেষে জিম একজন ছিল পশুপ্রেমিক।”শুধু তাই নয় ভারতের সমস্ত  জঙ্গল, এমন কি সংরক্ষিত বনাঞ্চল যেখানে ঢোকার আগে সরকারের অনুমতি নিতে হত, সেখানেও ছিল জিমের অবাধ প্রবেশাধিকার। কেন না সবাই জানত জিমের মত শিকারি জঙ্গলে প্রবেশ করলে পশুপাখির ক্ষতি হবে না উলটে সেখানকার পশুপাখি,  মানুষজন উভয়েই উপকৃত হবে।জিমকে অনেকেই ‘মানবতাবাদী শিকারি’ বলেন। কারণ, অদ্বিতীয় শিকারি হওয়া সত্ত্বেও করবেট মনেপ্রাণে ছিলেন একজন ‘পশুপ্রেমী’। জিম করবেটকে পাহাড়ি মানুষজন ডাকত ‘কার্পেট সাহেব’ বলে। জিম  শিকার করলেও বুঝতেন বন্যপ্রাণী  সংরক্ষণের গুরুত্ব। বন এবং বন্যপ্রাণ উভয়কেই বাঁচাতে হবে তা জিম বুঝেছিলেন মনেপ্রাণে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব অপরিসীম আর সেবিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে তাই তিনি বহুজায়গায় বক্তৃতা দিতে যেতেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিম্বা গ্রামের উৎসব অনুষ্ঠান যেখানেই  তিনি যেতেন সেখানেই শিকারের বিচিত্র সব গল্প শোনাতেন আর বলতেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে রাজাদের  অনুরোধ করেন, তারা যেন অকারণে শিকার না করেন । মোকামাঘাটে থাকার সময় স্থানীয় কুলিদের সঙ্গে মিশতেন দুবেলা। তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনতেন। পরে তাদের বাচ্চাদের পড়ার জন্য একটি স্কুল করে দেন জিম।

জিম করবেটের পোষা কুকুরের নাম রবীন, যার কথা ‘ম্যান ইটার অফ কুমায়ুনে’ অনেকবার লেখা হয়েছে, সেই কুকুরকে তিনি কিনেছিলেন এক পাহাড়ীর কাছ থেকে মাত্র ১৫ টাকায়। রবীনকে নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে শিকারসঙ্গী করেছিলেন জিম। ১৯৩০ সালে এক অজানা রোগে মারা যায় কুকুরটি।

জিম করবেটের পূর্বপুরুষ আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী হলেও করবেটের বাবা ও করবেটের জন্ম কিন্তু হয়েছিল ভারতবর্ষে। জিম ছিলেন বাবার মতই দুঃসাহসী। পাহাড়ি শহর নৈনিতালে ছিল তাদের স্বপ্নের সুন্দর বাড়ি, ‘গার্নি হাউস’। একদিন নীরবে জিম ও দিদি ম্যাগি ‘গার্নি হাউস’ বিক্রি করে দেন স্থানীয় মিসেস কলাবতী ভার্মাকে। তারপর কেনিয়া চলে যান। পরে সেখান থেকে যান লন্ডন। ভারতবর্ষ ছাড়ার পর শিকারি জিম হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় শিকারকাহিনি লেখক জিম করবেট। এর পাশাপাশি জিমের মাথায় তখন ফটোগ্রাফির নেশা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।অল্প সময়ের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার। সেসময় রাজকুমারী এলিজাবেথ ও তার স্বামী প্রিন্স ফিলিপেরও ছবি তোলেন তিনি। শিকারি জিম করবেট কখন যে দেখতে দেখতে বন ও বন্যপ্রাণী আন্দোলনের নেতা, জনপ্রিয় শিকারকাহিনি লেখক ও ফটোগ্রাফার হয়ে উঠেছিলেন তা তিনি নিজেও হয়ত জানেন না। শিকারি জিম করবেটের থেকে পশুপ্রেমিক মানবিক জিম করবেট তাই আজও  প্রাসঙ্গিক। বিদেশী হলেও যিনি মনেপ্রাণে ছিলেন ভারতীয়। এককথায়,  ‘ম্যান লাভার অফ কুমায়ুন’।

পালাবদল/এসএ


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2020
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৫১, সিদ্ধেশ্বরী রোড, রমনা, ঢাকা-১২১৭
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]