শনিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
আতঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতায় ভারতের স্কুলে মুসলিম শিশুরা
আতঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতায় ভারতের স্কুলে মুসলিম শিশুরা





দ্য হিন্দু
Monday, Nov 18, 2019, 1:56 pm
Update: 18.11.2019, 2:10:24 pm
 @palabadalnet

দিল্লির স্কুলে নয় বছর বয়সী জয়াকে* খুবই অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে: তার বাবা কি বাড়িতে বোমা বানায়? কোত্থেকে আসলো এই প্রশ্ন? তার ক্লাসমেটরা জয়ার ডায়েরিতে তার বাবার একটি ছবি দেখেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, তার বাবার দাঁড়ি আছে।

পরিস্থিতি ধীরে ধীরে কঠিন হতে থাকে। জয়ার ক্লাসমেটরা লাঞ্চের সময় তার সাথে বসতে অস্বীকার করতে শুরু করে, কারণ তাদের ধারণা জয়া মাংস খায়। তার বাবা ইরফান আহমেদ একজন সাংবাদিক। তিনি বলেন, তার ক্লাসমেটরা মনে করে যেন, “মুসলিমদের খাবারে ডাল আর চাপাতি থাকতে পারে না। এটা একটা চরম দুর্ভাগ্যজনক আচরণ যে মুসলিমরা সব সময় গরু বা খাশির মাংস খাচ্ছে”। এই সব ঘটনা যখন নিয়মিত ঘটতে শুরু করে, আহমেদ তখন তার মেয়েকে শেখায় যাতে সে যেন এ সব ঘটনা রুখে দাঁড়ায় এবং পিছু না হটে।

ফাতিমার এখনও সেই দিনটির কথা মনে আছে, যেদিন তার ১১ বছর বয়সী ছেলে আব্দুল স্কুল থেকে ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করেছিল যে মুসলিম হওয়াটা কোনো ‘খারাপ বিষয়’ কি না। ফাতিমা বললেন, “সে বলেছিল সে আর স্কুলে যেতে চায় না। তার চোখে ছিল পানি। আমি যখন বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম, সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো মুসলিমদেরকে কেন ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয়। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম”।

ফাতিমা ধীরে ধীরে জানতে পারলেন যে, প্রায় দুই বছর ধরে ব্যাঙ্গালুরুর ওই উচ্চমানের স্কুলে আব্দুলকে তার ক্লাসের একদল ছাত্র মানসিক নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। ফাতিমা বলেন, “আমার ছেলেকে বলা হয়েছে যে, মুসলিম হওয়ার কারণে ভারতে তাদের কোনো জায়গা নেই এবং তার পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। তাকে বারবার বলা হয়েছে যে, সব মুসলিমই সন্ত্রাসী। সে এরপর আর সেটা সহ্য করতে পারেনি”।

চরম অভিযোগ আরোপ

জয়া আর আব্দুলের গল্প আজকের ভারতে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মুসলিমদেরকে কিছু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার বিষয়টি ক্লাসরুম থেকে শুরু করে খেলার মাঠেও ঢুকে গেছে। রাজনীতি, সমাজ, গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ার বৃহত্তম দুনিয়া থেকে এই বিষয়গুলো ছড়িয়ে পড়ছে।

লেখক ও অধিকার কর্মী নাতাশা বাধওয়ার বলেন, “মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো পাকিস্তান-বিরোধী, কাশ্মির-বিরোধী, বাংলাদেশ-বিরোধী একটা ধারা গ্রহণ করেছে এবং দুঃখজনক হলো রাষ্ট্র ও আমাদের নেতারাও এ সব বিষয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছে। তাই এখন একজন মুসলিমকে দেশের জন্য হুমকি মনে করা হয়, যে কি না এই দেশের কেউ নয়। এটা নিশ্চিতভাবে পুরো একটা প্রজন্মের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে”।

বাধওয়ারের স্বামী একজন মুসলিম এবং তার মেয়েদেরকে প্রায়ই তাদের আংশিক মুসলিম পরিচয় নিয়ে অস্বাচ্ছ্যন্দকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। বাধওয়ার বলেন, “আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই দেশের প্রায় প্রতিটি মুসলিম এমন ঘটনার কথা বলতে পারবে, যখন ছোটবেলায় তাদেরকে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। এই ধরনের মানসিক নিপীড়ণের ঘটনা যেমন রয়েছে, তেমনি সমর্থন ও সহানুভূতির স্মৃতিও রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন মুসলিম বিদ্বেষী মানসিকতাটাই প্রাধান্য পেয়েছে, এবং আমার মেয়েরা তাদের স্কুলে সব সময় সেটাই শুনছে”।

‘মাদারিং অ্যা মুসলিম’ বইয়ের লেখিকা নাজিয়া এরাম বলেছেন যে, মিডিয়া একটি বড় উদাহরণ যেটা দেখে বোঝা যায় যে ভারতের অধিকাংশ মুসলিমের জন্য পরিস্থিতি কিভাবে খারাপ থেকে খারাপতর হয়ে উঠেছে। “প্রত্যেক দিন, সংবাদ চ্যানেলগুলো তাদের টক শোগুলোতে মুসলিমদের নিয়ে কিছু না কিছু নেতিবাচক বিষয় তুলে আনছে – সেটা জাতীয় পতাকা নিয়ে হোক, পাকিস্তান বা বন্দে মাতারাম নিয়ে হোক। আপনার শিশুদেরকে আর এগুলো থেকে আর রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না, এই কথাগুলো শিশুদের থেকে দূরে রাখাটা আর সম্ভব হচ্ছে না”।

আতঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতা

১৬ বছর বয়সী সাহার মনে করেন সংবাদ চ্যানেলগুলোতে যেভাবে পাকিস্তানের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, সেটা অস্বাভাবিক। “মিডিয়া এমনভাবে তাদের (পাকিস্তানি) নিয়ে কথা বলে, যেন তারা ভিনগ্রহের কেউ। যেন তাদের কিছু বিষয় এতটাই আলাদা যে, তাদের বোঝা আমাদের পক্ষে কঠিন। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার ক্লাসমেটদের কাছে এটা খুবই অস্বাভাবিক বিষয় যে, তাদের ক্লাসেরই একটি মেয়ের আত্মীয়স্বজন পাকিস্তানে থাকে। সে কারণে সেও তাদের কাছে ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো”।

এই পাকিস্তান-বিদ্বেষী, মুসলিম-বিদ্বেষী ভাষ্য শুধু মুসলিমদেরকেই আক্রান্ত করছে না। দিল্লির শিশু মনোরোগবিদ নুপূর ডি পায়ভা ১০ বছর বয়সী এক শিশুর কথা জানেন, যে তার ক্লাসমেটদেরকে কাশ্মির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সে মুসলিম নয়। পায়ভা বলেন, “সে ছোট ছোট কাগজে ‘কাশ্মির’ লিখে সেগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে যাতে অন্যান্য শিশুরা এটা নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ হয় যে, কী ঘটছে সেখানে”।

“কয়েক দিন পর, সে দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে, যে সব স্বপ্নে তার ওপর হামলা করা হয়। এই সময় তাকে আমার কাছে নিয়ে আসা হয় এবং আমরা কথা বলে বোঝার চেষ্টা করি যে, কোত্থেকে এগুলো আসছে। সে আমাকে কাগজে লিখে ছড়ানোর বিষয়টি জানায় এবং জিজ্ঞাসা করে যে, এটা অবৈধ কি না। কোথাও সে এটা জানতে পেরেছে যে, এটা করাটা বিপজ্জনক, এবং সেই আতঙ্কটাই তার স্বপ্নে ফিরে আসতে শুরু করেছে”।

স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এই ইতিহাস পুনর্লিখন দিয়েও কোনো সুবিধা হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, কর্নাটকে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি এমপি আপ্পাচু রঞ্জনের সুপারিশ অনুযায়ী পাঠ্যবই থেকে টিপু সুলতানের অধ্যায়গুলো বাদ দেয়ার কথা ভাবছে। বিজেপির ওই এমপি ১৮ শতকের এই শাসককে ধর্মীয় কট্টরপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কুসংস্কারের বহিঃপ্রকাশ

দক্ষিণ দিল্লির একটি স্কুলের মুসলিম একজন শিক্ষক স্মরণ করলেন যখন দ্বাদশ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে কিছু একটা বলার জন্য যে কোন একটা বিষয় বেছে নিতে বলেছিলেন তিনি। ওই শিক্ষার্থী বলতে শুরু করে মুসলিমরা সন্ত্রাসী এবং তাদের ধর্ম তাদেরকে হত্যা করতে শেখায়। “আমি জানি না যে, ওই শিক্ষার্থী জানতো কি না যে, আমি একজন মুসলিম এবং আমার মনে হলো এর মধ্যে আমাদের পরিচয়কে টেনে এনে কোন লাভ নেই। আমি তাকে থামাইনি কিন্তু তাকে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি এবং তাকে জিজ্ঞাসা করি, অন্যান্য ধর্মের যে সব সহিংসতার ঘটনা রয়েছে, তাদেরকেও কি সে সন্ত্রাসী মনে করে। শিক্ষার্থীদেরকে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝানোর বাইরে একজন শিক্ষার্থী আর কিই বা করতে পারে?

পায়ভা জানালেন, শিশুদের মধ্যে বিভাজন বেড়েই চলেছে। “ধর্মই একমাত্র বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয় নয়, আর্থ-সামাজিক শ্রেণীও একটি ফ্যাক্টর। রাইট টু এডুকেশান অ্যাক্টের অধীনে শিক্ষার্থীদেরকে স্কুলে নেয়া শুরুর পর থেকে বিভাজনের আর্থ-সামাজিক ফ্যাক্টরটি আরও প্রকট হয়েছে। স্কুলে কমিউনিটির মানসিকতার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে এবং সহাবস্থান, অন্যের প্রতি সহানুভূতি ও ভিন্নমতকে গ্রহণের মানসিকতা কমতে শুরু করেছে”।

পায়ভা আরো বললেন, দেশ হিসেবে আমাদের মধ্যে অনেক অসমাধানকৃত ট্রমা ও ঘৃণা রয়ে গেছে, যেগুলোর উৎস হলো দেশভাগ। “জার্মানিতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানুষের মানসিক ও আবেগজনিত বিষয় নিয়ে যে কাজ হয়েছে, সেগুলো একটা প্রশংসনীয় মাত্রায় ছিল। বহু গ্রুপ এগিয়ে এসেছিল এবং তাদের মানসিক বিপর্যয়ের কথা প্রকাশ করেছিল এবং বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের অপরাধের অনুভূতি, ক্ষোভ ও ক্ষতির বিষয়গুলো কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তারা শেষ পর্যন্ত একসাথে একটা কমিউনিটি হিসেবে গড়ে উঠতে পেরেছে এবং একে অন্যকে ক্ষমা করতে পেরেছে। আমরা একটা খুবই বাস্তবসম্মত কৌশল নিয়েছি ‘ভুলে যাও এবং মানিয়ে নাও’। আমাদের যেটা করা দরকার ছিল সেটা হলো সীমান্তের দুই পাশ থেকেই ক্ষতি আর যন্ত্রণার অভিজ্ঞতাগুলো শোনা, সেগুলো হজম করা, এবং এরপর এই ক্ষতটাকে সারার জন্য সময় দেয়া”।

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]