শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের জন্য উদ্বেগের সাথে অপেক্ষায় অযোধ্যা ও ফায়জাবাদ
বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের জন্য উদ্বেগের সাথে অপেক্ষায় অযোধ্যা ও ফায়জাবাদ





আল জাজিরা
Friday, Nov 8, 2019, 3:47 pm
Update: 09.11.2019, 11:02:50 am
 @palabadalnet

ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা এবং এর জমজ শহর ফায়জাবাদ এখন চরম উদ্বেগের সাথে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। মুসলিম ও হিন্দু উভয়েই যে জমিকে নিজেদের দাবি করে আসছে, সেই সাত দশকের পুরনো আইনি লড়াই নিয়ে শিগগিরই রায় দিতে যাচ্ছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট গত মাসে এই মামলার শুনানি শেষ করেছে এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি রায় দেবে যে, মধ্যযুগে নির্মিত বাবরি মসজিদের সাথানে হিন্দু মন্দির নির্মিত হবে কি না। ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুবাদীরা ওই মসজিদকে ভেঙে দেয়।
 
হিন্দু গ্রুপগুলোর দাবি হলো এখানে তাদের দেবতা রামের জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে মুসলিমরা বলছেন, ১৯৪৯ সাল থেকে এই মসজিদে নামাজ পড়ে আসছেন তারা, যখন রামের একটি মূর্তি গোপনে মসজিদের মধ্যে বসানো হয়েছিল।

সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য হাজার হাজার নিরাপত্তার বাহিনীর সদস্য এখানে মোতায়েন করা হয়েছে। সিনিয়র কর্মকর্তারা হোটেল রুম ভাড়া করেছেন। রায় থেকে সহিংসতা সৃষ্টির আশঙ্কায় অনেক স্থানীয় অধিবাসী এমন বিয়ে ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য কর্মসূচি বাতিল করেছেন।

রাম মন্দির আন্দোলন

এই শহরের হিন্দুরা আশা করছে যে, শীর্ষ আদালত তাদের পক্ষে রায় দেবে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ও আশা করছে যে তাদের দাবির পক্ষেই থাকবে রায়।

মন্দিরে আচ্ছাদিত অযোধ্যা শহরের দিকে তাকিয়ে ৬০ বছর বয়সী নাইম আশরাফি বলেন, “এবার আমরা ১৯৯২ সালের মতো অবাক হবো না”।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নব্বইয়ের দশকে রাম মন্দির আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নির্বাচনী প্রচারণাকালো রাম মন্দির বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মোদি।

আদালত সিদ্ধান্ত দিবেন যে, যেখানে মসজিদ ছিল এই জমিটির উপর অধিকার কাদের। এই জমির সাথে বিশ্বাস ও আবেগ, ইতিহাস ও পুরাণ জড়িয়ে আছে।

‘রায়ে ভারসাম্য রক্ষার আশা’

আশির দশকে তরুণ হিসেবে অযোধ্যা এসেছিলেন বাবা হাজারিলাল। যারা মসজিদ ভেঙেছিল, তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।

হাজারিলালের বয়স এখন ষাটের কোঠায়। তিনি বলেন, “উত্তর প্রদেশে এবং কেন্দ্রে বিজেপি সরকার এখন ক্ষমতায়। আমি নিশ্চিত যে, আমাদের রাম মন্দির নির্মাণের স্বপ্ন পূরণ হবে। আদালতকে অবশ্যই হিন্দু আবেগকে শ্রদ্ধা দেখাতে হবে এবং মন্দিরের জন্য জায়গা খালি করার নির্দেশ দিতে হবে”।

রায়ের সময় যত এগিয়ে আসছে, অযোধ্যার বেশির ভাগ মানুষ বিশেষ করে তরুণেরা আশা করছে যাতে এমন রায় আসে যেন শহরটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

১৯ বছর বয়সী ফটোগ্রাফার সুফিয়ানা আলী আল জাজিরাকে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি যে স্থানীয় হিন্দুরা কোন সমস্যা নয়। আমার বহু হিন্দু বন্ধু রয়েছে, আমরা মিলেমিশে বাস করছি। সমস্যা হলো বাইরে থেকে আসা হিন্দুরা যারা সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়”।

আলীর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে লোকজ নৃত্যের শিক্ষক মুকেশ কুমার, ২৬, তার গ্রুপকে নিয়ে নাচের চর্চা করছিলেন।

কুমার বললেন, “মামলার ব্যাপারে আমি কোন আগাম অনুমান করতে চাই না। সেরা আইনের ব্যক্তিরা এটা নিয়ে কাজ করছেন। তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন। তবে বিবাদটা চুড়ান্তভাবে মিটিয়ে ফেলার জন্য এটা একটা সুযোগ। আমি আশা করি যে রায়ে একটা ভারসাম্য বজায় থাকবে”।

রাজনৈতিক বক্তব্য

এদিকে, ডানপন্থী হিন্দু নেতারা রায় ঘোষণার আগেই এই মর্মে কথা বলে যাচ্ছেন যে, এই জায়গাটির অধিকার তাদের।

হিন্দু পুরোহিত থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওযা রাম বিলাম বেদান্তি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, ৬ ডিসেম্বর মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এই দিনেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। এই দিনটিকে মুসলিমরা ‘ইয়াউমুল গাম’ বা দুঃখের দিন হিসেবে পালন করে আসছে। আর ডানপন্থী হিন্দু গ্রুপগুলো এ দিনটিকে ‘সূর্য দিবস’ বা বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করছে।

এই ধরণের পদক্ষেপ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের অনেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, মন্দির নির্মাণটাই একমাত্র ‘বাস্তব’ সমাধান।

৪০ বছর বয়সী সালমান যিনি মূলত অযোধ্যাতে হিন্দু তীর্থযাত্রীদেরকে বহন করেন। তিনি বলেন, “দেশের রাজনীতির কথা বিবেচনা করলে, আমি মনে করি আমাদের এটা মেনে নেয়া উচিত যে, আমরা যদি মামলায় জিতেও যাই, তার পরও আমরা সেখানে মসজিদ নির্মাণ করতে পারবো না”।

প্রধানমন্ত্রী মোদি তার সাম্প্রতিক সাপ্তাহিক রেডিও সম্প্রচারে অবশ্য নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।

মোদি সেখানে শান্তি ও সংযমের উপর জোর দিয়েছেন। তবুও তার দলের নেতা এবং সহযোগী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতারা উসকানিমূলক বিবৃতি দেয়া বন্ধ করেনি।

‘পুরনো স্মৃতি ফিরে আসছে যেন’

সম্প্রতি হিন্দু উৎসব দিওয়ালি উদযাপনের সময় বিজেপি সরকার সমস্ত কেন্দ্রগুলোতে তিন দিনের উৎসব আয়োজনের ব্যবস্থা নেয় এবং এর ফলে ৫৫০,০০০ টিরও বেশি মাটির প্রদীপ বিভিন্ন জায়গায় জ্বালানো হয়।

ট্রাকের উপর দেয়ালের মতো বড় বড় টেলিভিশন সেট বসিয়ে আশির দশকের জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখানো হয় পুরো অযোধ্যা এর আশেপাশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে।

প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়া হয় যে মন্দিরের এই শহরে রাম রাজ্যের সূচনা করা হবে এবং অযোধ্যাতে বেশি করে মানুষকে সমবেত হতে বলা হয়।

৩৫ বছর বয়সী গোপাল দাস বলেন, “আমি অযোধ্যার মন্দিরগুলোতে বহু বার গেছি কিন্তু আগে আমি কখনও দেখিনি যে, কোন সরকার প্রাচিন এই শহরের গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য এভাবে কঠোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে”।

এই সব ধর্মীয়-রাজনৈতিক ডামাডোলের অনেকটা বাইরে অযোধ্যার ছোট্ট একটি মসজিদের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন ৭১ বছর বয়সী মাওলানা ইয়াসিন।

তিনি বলেন, “পুরনো স্মৃতি ফিরে আসছে যেন। যদিও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে, তবে কোন সমস্যার লক্ষণ দেখি, আমরা আমাদের নারী ও শিশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি”।

১৯৯২ সালে ইয়াসিনের ভাই আমিনকে হত্যা করে তাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটা দেখেছিলেন ইয়াসিন।

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]