শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১০ ফাল্গুন ১৪২৬
 
জাতীয়
ভারতের সিএএ নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাংলাদেশ
ভারতের সিএএ নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাংলাদেশ





মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি
Friday, Jan 24, 2020, 4:12 pm
 @palabadalnet

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তার সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো তিনি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তা ভারতের কাছে বিকিয়ে দিয়েছেন। এই আখ্যান আরো শানিত হয় যখন বাংলাদেশের মর্যাদাবান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদকে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন - ছাত্র লীগের একদল নেতা-কর্মী পিটিয়ে হত্যার ভিডিও চিত্র ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়। ফাহাদকে মারার কারণ ছিলো তিনি ২০১৯ সালের অক্টোবরে শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেন সেগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে বলিউডের ছবি জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশীরা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে ভালোবাসলেও দেখা গেছে দেশটির বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রবল। আর ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের পর সরাদেশে বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ যেভাবে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন তা ওই মনোভাবকে আরো জোরদার করেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার মিত্রতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

শেখ হাসিনার জন্য পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে ভারত নুতন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) করার পর। এখন সারাদেশে তুমুল আলোচনা চলছে –সিএএ শেখ হাসিনাকে ভালো থাকতে দেবে কিনা। রাজনৈতিক নেতাদের মনে আশঙ্কা ভারত এখন নতুন আইনের বলে অনেক মুসলমানকে অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করবে। ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) করার পর থেকেই এমন কোন আপদ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ সরকার।

কথিত অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হবে না বলে ভারতের কাছে এমন নিশ্চয়তা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এখন পর্যন্ত এ ধরনের আশ্বাস মৌখিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত রেখেছে ভারতের মোদি সরকার। কিন্তু তারা লিখিত কোন নিশ্চয়তা দিতে রাজি হয়নি। তাদের অযুহাত হলো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এ কাজ করা হয়েছে। ভারত বলছে যে আসামের এনআরসি একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়, তাই তাদের পক্ষে কোন লিখিত নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয়। এর একদিন পরেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) অন্তত ৩২ জন কথিত ‘বাংলাদেশীকে’ যশোর জেলার সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে দেয়। এদেরকে এক মাস আগে কর্নাটক পুলিশ আটক করেছিলো বলে জানা যায়।

মাত্র চার বছর আগে ২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর থেকে ফিরে এসে চুক্তিটি অনুমোদন করেন। বহু দশক ধরে সীমান্তে ছিটমহলগুলো সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছিলো। মোদি ও হাসিনার উপস্থিতিতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ছিটমহল ও ভূমি বিনিময় চুক্তিটি সই করেন। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহলগুলো বিনিময় সম্পন্ন হয়। এর আগে ২০১৫ সালের ৩০ জুন দুই দেশের জরিপ বিভাগ সীমান্ত চিহ্নিত করার কাজ শেষ করে।

এই বিনিময়ের ফলে ভারতের অভ্যন্তরে ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহলে থাকা ১৪,২১৫ ব্যক্তি (যাদের বেশিরভাগ মুসলমান) ভারতের নাগরিকে পরিণত হয়। একইভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ৩৭,৩৩৪ জন বাসিন্দা বাংলাদেশী নাগরিকে পরিণত হয়। কিন্তু এখন সিএএ পাস হওয়ার পর কিছু জটিল প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। ভূমি বিনিময়ের মাধ্যমে ভারত এরই মধ্যে তার ৩৭,৩৩৪ জন নাগরিককে বাংলাদেশে গছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সিএএ’র পর ১৪,২১৫ জন নতুন নাগরিককে কিভাবে গ্রহণ করবে ভারত?

ভারতীয় জনগণের আশঙ্কা সিসিএ-কে এনআরসি’র সঙ্গে যুক্ত করে সংখ্যালঘুদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। বিশেষ করে আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পরার পরও বিজেপি নেতারা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বার বার বলছেন যে সারা ভারতে এনআরসি করা হবে। আসামের এনআরসিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কাউকে এই তালিকায় স্থান পেতে হলে তার পূর্বসূরির ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। ১৯৫১ সালেও আসামে এমন এনআরসি করা হয়েছিলো। আর রাষ্ট্র এই প্রমাণের দায়িত্ব দিয়েছে ব্যক্তির উপর। কিন্তু দেশটির গরীব মানুষের জন্য এসব নথি জোগার করা কঠিন। তাছাড়া আসামের মতো অনুন্নত এবং পাহাড়, বন ও জলাভূমি অধ্যুষিত এলাকায় সরকারিভাবেও অনেক নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। যারা এনআরসিতে স্থান পাবে না তাদের স্থান হবে আটক কেন্দ্রে। আসামের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের অনেক আটক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং আরো নতুন নতুন আটক কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। একসময় হয়তো এদেরকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করবে ভারত।

ছিটমহলবাসীর জীবন নিয়ে গবেষণাকারী ব্রেনডান আর হোয়াইট বলেন, এরা বারবার পরিচয় সঙ্কটে পড়েছে। ফলে অবৈধ অভিবাসন হয়েছে। অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত না থাকায় সমস্যা আরো জটিল হয়েছে। এসব এলাকায় কখনো আদম শুমারি না হওয়ায় অনেক কাজকর্ম করার জন্য ভুয়া ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করেছে। এটা হয়েছে মূলত ভারত ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি ও ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়ন না করায়। এই বিলম্বের ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দায়ি ছিলো বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অতীতে যাই হোক না কেন, এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের উদাসীনতা। ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হবে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপর থেকে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ ঢল বাংলাদেশের জন্য হবে সবচেয়ে বড় দু:স্বপ্ন। এটা এমন এক সময়ে ঘটতে যাচ্ছে যখন শেখ হাসিনা মিয়ানমার থেকে আসা দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছেন।

এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টার পাশাপাশি চীনের স্বার্থ এগিয়ে নেয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ক্ষেত্রে এতদিন বেশ ভালোই করেছে। কিন্তু আসামের এনআরসির ফলাফল কি হবে তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মুসলিম অধিবাসীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া শুরু হলে দুই দেশের সম্পর্ক আর মেরামতের যোগ্য থাকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মোদির রাজনীতি নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এটা শুধু ভারতের অভ্যন্তরেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেনি অনেক আঞ্চলিক সমস্যা ও সঙ্কটেরও জন্ম দিয়েছে। ভারতকে বহু আনুকূল্য দেখানোর পরও বাংলাদেশ কি পেয়েছে জনগণের কাছে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের কাছ থেকে সমর্থন না পাওয়ার পর এখন ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও হিন্দু শাসকদের হাতে কাশ্মিরি মুসলমানদের নিপীড়ন ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’র মতো।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ অতি ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। ভারত যদি এনআরসি-র অযুহাতে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে থাকে তা নিশ্চিতভাবে নয়া দিল্লি সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট করবে। আরো খারাপ বিষয় হলো জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়ে গেলে দেশের উপর হাসিনার নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে চীন। অন্য প্রতিবেশীরা যখন চীনের দিকে ঝুকতে শুরু করেছে তখন বাংলাদেশ চীনমুখী হলে ভারতের কিছু বলার থাকবে না।

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]