মতামত
অস্কার-মঞ্চে আমরা-ওরার ভাগাভাগি কি ফুরোল?
অস্কার-মঞ্চে আমরা-ওরার ভাগাভাগি কি ফুরোল?





স্পন্দন ভট্টাচার্য
Friday, Feb 14, 2020, 1:09 am
Update: 14.02.2020, 1:15:45 am
 @palabadalnet

‘যদি একাডেমি অনুমতি দেন, এই প্রাপ্য সম্মান আমি পাঁচ টুকরো করে ভাগ করে নেব বাকি চার নমিনির সাথে’- বং জুন হো-র অস্কার প্রাপ্তির বক্তৃতা থেকে কথার এই টুকরোগুলো যখন লাল কার্পেটের গা বেয়ে লাইভ স্ক্রিনিং-এ ছড়িয়ে পড়ছে অগুনতি ছোট-বড় বাক্স আর মুঠোফোনের পর্দায়, আমরা কি সাক্ষী থাকছি এক ঐতিহাসিক বাঁক বদলের? অস্কারের ইতিহাসে প্রথম বার একটি সেরা ‘আন্তর্জাতিক’/ ‘বিদেশি’ ভাষার ছবি একই সঙ্গে পাচ্ছে সেরা ছবির সম্মান। বং জুন হো পরিচালিত ‘প্যারাসাইট’। এ ছাড়াও স্বীকৃতির ঝুলিতে সেরা চলচ্চিত্রকার এবং সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের অস্কার। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বড় অংশ উচ্ছ্বসিত অস্কারের ‘ভালো ছবি’র প্রতি এই দায়িত্ববোধ দেখে। তাদের মতে, দেশ-ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে অস্কার সাবালক হলো এত দিনে! আর একটা ছোট অংশ যথারীতি এই সাফল্যকে দেখছেন সন্দেহের চোখে। তারা মনে করছেন যে এর ফলে জুন হো ও এশিয় চলচ্চিত্রকারদের একাংশের মধ্যে চলে আসবে প্রতিষ্ঠানপ্রীতি আর হলিউড-নিয়ন্ত্রিত চলচ্চিত্র-বাজার তার পরিধির বিস্তারে এগোবে আরো। উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক, সন্দেহও অমূলক নয়। কিন্তু জরুরি হলো চলচ্চিত্র ও তার আন্তর্জাতিকতার মানচিত্রে এই অস্কার প্রাপ্তির গুরুত্বটা বোঝা।

এই পুরস্কারপ্রাপ্তি মনোযোগের দাবি রাখে এই কারণে যে, কথা উঠছে এ বার কি তা হলো বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়বে সিনেমার কিছু প্রচলিত বাইনারি? গত বছরই আমরা দেখেছি স্ট্রিমিং সাইটের জন্যে নির্মিত ‘রোমা’ সমাদৃত হয়েছিল অস্কারে আর কী ভাবে তার পরই ইউরোপীয় প্রদর্শকদের একটি দল আপত্তি জানিয়েছিল স্ট্রিমিং সাইটের জন্যে নির্মিত ছবির অস্কার প্রাপ্তিতে। তার পরেও এ বারের অস্কারে আবার নতুন এক চমক- ‘বিদেশি ছবি’র জন্যে বরাদ্দ বিভাগ থেকে একটি ছবি জয় করে নিল সেরা ছবি ও সেরা আন্তর্জাতিক ছবির অস্কার! আর কি কোনো বিভাগগত পার্থক্য থাকবে তবে ‘ছবি’ ও ‘বিদেশি ছবি’র? ভাষাগত বিভাগের আর কোনো যৌক্তিকতা থাকবে? যেকোনো ছবিই কি প্রতিযোগী হতে পারবে যে কোনো বিভাগে? প্রশ্ন এমন অনেক। খাতায়-কলমে অবশ্য হলিউড বা আমেরিকার বাইরের যেকোনো ছবিই বা অ-ইংরেজি যেকোনো ছবিই মনোনীত হতে পারে সেরা ছবির বিভাগে। এত দিন যে একেবারে হয়নি, তাও নয়। দ্য ইমিগ্র্যান্টস (সুইডেন, ১৯৭১), ক্রাইস অ্যান্ড হুইস্পার্স (সুইডেন, ১৯৭৪) বা গত বছরের বহুল আলোচিত রোমা’র (মেক্সিকো, ২০১৮) অস্কারে নমিনেশনের ইতিহাস বলবে আমেরিকার বাইরের কত ছবি স্থান পেয়েছিল সেরা ছবির প্রতিযোগিতায়। ’৪০/ ’৫০ এর দশক থেকেই বৃটিশ ছবিদের উপস্থিতি প্রায় নিয়মিতই ছিল অস্কারের দৌড়ে। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও ‘প্যারাসাইট’-এর সম্মান ঘিরে একটা আগ্রহ তো তৈরি হয়ই। বিশেষত একটা পরিবর্তন চোখে না পড়ে উপায় নেই। সেটা হলো খাতায়-কলমে অস্কার আর ‘বিদেশি ছবি’ বলতে চাইছে না কাউকে। নতুন নামকরণ - আন্তর্জাতিক ছবি!

অস্কার কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত আমাদের বাধ্য করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছবির বিভাগে দেশীয়/জাতীয় ছবির ধারণা বা অঞ্চলভিত্তিক অন্য মার্কারগুলোকে নিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে যখন আমেরিকার স্টুডিয়োগুলো হলিউড নামক এক ছবির ধারণা ও ঘরানা তৈরি করছিল, তখন স্টুডিয়োর মালিকরা সুনিপুণ ভাবে তার গায়ে বুনছিলেন আপাত দেশনিরপেক্ষতার এক সুর। আমেরিকার দেশীয় পরিচয় ছবির কেন্দ্রে থাকলেও তা পড়া হচ্ছিল যেন এক দেশ-নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে। সেই গড়ন ও গঠন নির্মাণ করেছে ‘ক্লাসিকাল হলিউড সিনেমা’র মডেল। ’৩০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বের চলচ্চিত্র বাজারে হলিউডের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তা আরো বৈধ করে তুলছে। অন্য দিকে, আমেরিকার পুরস্কার প্রদানের কুলীনতম মঞ্চ অস্কার, তাদের সেরার ধারণায় উদ্‌যাপন করেছে এই মডেলের বিশেষত্ব। কিন্তু আমেরিকা-কেন্দ্রিক পুরস্কার মঞ্চকে বাজারের স্বার্থেই ইনক্লুসিভও হতে হয়েছে। তাই হলিউডকে দেশি ছবি না বললেও দীর্ঘদিন ধরে অস্কারের মঞ্চে রয়েছে ‘বিদেশি’ ছবির বিভাগ আর সেখানেও সেরাদের স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি। ইতিহাসের সূক্ষ্মতার নিরিখে এই আত্ম (হলিউড)ও অপর (বিদেশি ছবি) পক্ষের নির্মাণ এতটা সহজ-সরল না হলোেও গোদা হিসেবে খানিকটা এ রকমই একটা বাইনারি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কী এমন হলো যে অস্কার আর এই ছবির বিভাগটিকে ‘বিদেশি’ না বলে, বলছে ‘আন্তর্জাতিক’? সোজাসুজি এর উত্তর পাওয়া একটু মুশকিল, তবে ছবির জগতের সমসময়ের কিছু নির্মাণের প্রেক্ষাপট দেখলে ক’টি সূত্র স্পষ্ট হতে পারে হয়তো।

বিগত এক/ দেড় দশক বা তার কিছু বেশি সময় ধরে বিশ্বের নামী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলিতে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে ‘এশিয়ান সিনেমা’। কান/ভেনিস বা বার্লিনে প্রদর্শিত ছবির তালিকা ধরে আলোচনা করলে স্পষ্ট হবে ছবি বাছাইয়ের এই নতুন ভূগোল। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশক থেকে পশ্চিমের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলি ‘ইউনিভার্সাল’ হলিউডের বিপ্রতীপে যখন প্রতিষ্ঠিত করছে ‘ন্যাশনাল’ ( দেশীয়/ জাতীয়) ছবি, তখনই ক্রমে ক্রমে একজন ফরাসি রেনোয়া বা ইতালিয়ান আন্তোনিওনির সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে জাপানি আকিরা কুরোসাওয়া বা ভারতীয় সত্যজিৎ রায়েরা। কিন্ত এটাও মনে রাখা দরকার, এশিয়ার আর্ট হাউস ছবির পরিচালকরা স্বীকৃত হচ্ছেন নিজের নিজের দেশের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে। এশিয়ার বা বলা ভালো অ-ইউরোপীয় ছবির সংস্কৃতি নিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত সে ভাবে ভাবিত নন কান/ বার্লিনের চলচ্চিত্র-বোদ্ধারা। ষাটের শেষ ও সত্তরের শুরুতে পরিবর্তন আসছে যখন ইউরোপীয় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও একটু একটু করে গুরুত্ব পাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের ছবির পরিসর--- মূলত উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশের ছবির জগৎ। আরো পরে আশির দশক জুড়ে এই ভাবে প্রথমে ইরান, তারপর চিন ও একে একে দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি এসে এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-আর্ট হাউসের ছবির ধারণা আরো আরো বিস্তৃত হচ্ছে। আরো বড় পরিবর্তন আসছে একবিংশ শতকের প্রথম দিকে। এক দিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে ছবির বিনিময় সহজ হচ্ছে আরো, অন্য দিকে ফিল্ম-ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনস, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান জুড়ে উঠে আসছে এক নতুন সিনেফিলিয়ার সংস্কৃতি।

গবেষকদের মতে, এই দেশগুলির একই ধরনের ঔপনিবেশিক শাসনের লম্বা অতীত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংকট, যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী অপরাধের ইতিহাস, সেনাশাসনের ভয়াল অভিজ্ঞতা ও বিশ্বপুঁজির বিনিয়োগ হেতু বিশ শতকের শেষ দিকে এক নতুন শহুরেয়ানার উত্থান এই দেশ - বিশেষত তাদের শহর অঞ্চলগুলিকে করে তুলেছে একে অন্যের রেফারেন্স বিন্দু। আর একই ভাবে এই দেশগুলোর চলচ্চিত্র সংস্কৃতি বিগত এক দশকের একটু বেশি সময় জুড়ে একে অপরের সঙ্গে সচেতন বা নিজেদের অজ্ঞাতে সংলাপে গিয়ে তৈরি করছেন ‘নতুন এশিয়ান ছবি’র এক ধারা (ভারত বা জাপান তাদের নিজেদের ছবি তৈরির এক অন্য ইতিহাস থাকার জন্যে এই দলের বাইরে, কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ)। আর এরই মধ্যে গত চার-পাঁচ বছরে স্ট্রিমিং সাইটের উত্থান ও অভাবনীয় সাফল্যে আরো প্রাসঙ্গিক হয়েছে ‘নতুন এশিয়ান ছবি’র দুনিয়া। প্যারাসাইট ও জুন হো-র অস্কার সম্মানকে পড়া যেতে পারে এই প্রাসঙ্গিকতায়ও।

এটাও মাথায় রাখার যে নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন-এর মতো স্ট্রিমিং সাইটগুলোর জনপ্রিয়তা ছবি প্রযোজনা ও প্রদর্শনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করছে ছবির বাজার নিয়ে নতুন করে ভাবতে। সেই বিশ্বজোড়া বাজারে একটু একটু করে যেন অপ্রাসঙ্গিক হচ্ছে দেশি/ বিদেশি বাইনারি। হলিউড বরাবরই বিশ্ববাজারের কথা মাথায় রেখে ছবি তৈরির বিষয় নির্বাচন ও ব্যাকরণে নিজেকে ভেঙেছে-গড়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে হলিউডের মূলধারার স্টুডিয়োগুলির আগ্রহ বেড়েছে দেশের বাইরে বিনিয়োগে। খোদ বলিউডেই এখন মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে ডিজনি বা অন্যান্য হলিউডি প্রযোজনা সংস্থার নাম। আর তারই উল্টো পিঠে যেন পুরস্কারপ্রদানের মঞ্চে জুন হো-র অস্কার সম্মান। একটা পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-এর নভেম্বর আর ২০২০-এর মে-এর মধ্যে স্ট্রিমিং সাইটের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ, কারণ অ্যাপল, ডিজনি, এনবিসি ইউনিভার্সাল বা ওয়ার্নার মিডিয়ার মতো সংস্থাগুলির প্রত্যেকেই নিয়ে আসবে স্ট্রিমিং সাইট! এই বাজারের যুক্তিতেও ঊর্ধ্বমুখী এশিয়ান সিনেমার প্রাসঙ্গিকতা।

কিন্তু অস্কার মঞ্চে ‘প্যারাসাইট’-এর হাত ধরে এই ঐতিহাসিক বাঁকবদলের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ শুধুই কি বাড়তি পুঁজি আর নতুন বাজারের শুকনো সমীকরণ? ছবির নাম যেখানে ‘পরজীবী’ আর ছবির গল্পে যেখানে প্রতি পদে পদে জুন হো-র লেন্স কাটাছেঁড়া করে শ্রেণিবৈষম্যের নির্মম দুনিয়া, সেখানে এই ছবির স্বীকৃতির হাত ধরে আমরা কি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আত্ম/ অপরের অন্য কোনো দিক বদলের আভাস পাব না? বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, এই ছবির হাত ধরে চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিকতায় কিছু ‘মানবিক’ রদবদলও হোক।

সারা বিশ্বের রাজনীতিজুড়েই এই সময়ে প্রায়ই শোনা যায় এক ‘পরজীবী অপর’ এর কথা। কোনো স্বৈরাচারী শাসক এই ‘পরাশ্রয়িতা’ আটকাতে নিদান দেন দেওয়াল তুলে দেওয়ার, আর কোনো শাসক কাগজপত্রের ইতিহাস-ভূগোলে মাপতে চান আশ্রিত আর পরজীবীর জীববিদ্যা। ভরসার কথা এই যে, পরজীবীরা সহজে দমে না। আর জুন হো-র ছবি জুড়ে নতুন রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে আসে অদম্য পরজীবীরা। নিয়ে আসে অস্বস্তিও। ‘ওদের গায়ের গন্ধটা ভীষণ অস্বস্তিকর’ ছবির এক উচ্চবিত্ত চরিত্র বলে। অস্বস্তিকর কারণ এই গন্ধ বারবার পেরোয় তার সীমানা। বেসমেন্টের লুকনো কুঠুরির বাইরে বেরিয়ে ঢুকে পড়ে এসি গাড়ি, সুখী ড্রয়িং রুমের স্পেসটায়। ‘প্যারাসাইট’ এক দিক থেকে যেমন শ্রেণি, বিত্ত, সামর্থ্যর অসেতুসম্ভব ব্যবধানের নিষ্ঠুরতার গল্প, আবার একই সঙ্গে সীমানা পেরোবার রূপকথাও। এই বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে এটুকুও কম না।

 স্পন্দন ভট্টাচার্য: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র বিদ্যার গবেষক


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]