জাতীয়
বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে কবে?
বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে কবে?





সি আর আবরার
Saturday, Jan 18, 2020, 10:45 am
 @palabadalnet

ফেলানি খাতুনকে নৃশংসভাবে হত্যা করার নবম বার্ষিকী পালিত হলো ৭ জানুয়ারি। কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার আনন্তপুর সীমান্তে ১৫ বছর বয়সের এই শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। মেয়েটি নয়া দিল্লিতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিল, সে তার বাবার সাথে বাংলাদেশ ফিরছিল। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের সময় ফেলানির জামাটি কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে যায়। মেয়েটির আতঙ্কিত চিৎকারের জবাবে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) তার দিকে গুলিবর্ষণ করে। এতে সে মারা যায়। মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রায় ৫ ঘণ্টা তার নিথর দেহটি কাঁটাতারে ঝুলতে থাকে।

ফেলানির হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ও ভারতের কিছু অংশে ক্রোধের সৃষ্টি করে। ফেলানির ঝুলে থাকা লাশের ছবি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ওই ভয়ঙ্কর কাজটি যারা করেছে তাদের বিচার ও ব্যবস্থা গ্রহণের (প্রধান অপরাধী বিএসএফের অমিয় ঘোষ ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা) দাবি সত্ত্বেও বিএসএফের নিজস্ব আদালত, দি জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট তাদের খালাস দেয়। রায়টি পুনর্বিবেচনা করে একই আদালত ওই রায় বহাল রাখে। ভারতের ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন ফেলানির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করার যে নির্দেশনা দিয়েছিল, তাতেও কর্ণপাত করা হয়নি।

সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনা বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে অভিহিত করেন যে গত ১০ বছরে সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ ২৯৪ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। মন্ত্রী আরো জানান, ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালের ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১১ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন ও ২০১৮ সালে মাত্র ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

টানা তিন বছরে সংখ্যাটি হ্রাসের চিত্রে মন্ত্রী পার্লামেন্টকে আশ্বস্ত করেন যে হত্যাকাণ্ড হ্রাস পাচ্ছে। অবশ্য, তার আশাকে দুরাশায় পরিণত করে ২০১৯ সালে হত্যাকাণ্ড ১২ গুণ বেড়ে গিয়ে হয়েছে ৩৪ (২০১৮ সালে ৩)। শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা, এনজিও সূত্রগুলো ২০১৯ সালে আরো বেশি হত্যার কথা প্রকাশ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও অধিকারের মতে সংখ্যাটি যথাক্রমে ৪৬ ও ৪১। অধিকারের তথ্যে দেখা যায়, একই বছরে বিএসএফের হাতে ৪০ বাংলাদেশী আহত হয়েছে, বিএসএফ আরো ৩৪ জনকে অপহরণ করেছে। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে নিহত হয়েছে ৪৬ জন, ছয়জন নির্যাতনে মারা গেছে।

বিএসএফ এসব প্রাণহানিকে হত্যাকাণ্ড না বলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০১৯ সালের ১২-১৫ জুন ঢাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে অনুষ্ঠিত মহাপরিচালক পর্যায়ের সভায় বিএসএফের পরিচালক আশ্বাস দেন যে এসব ঘটনা ‘হত্যাকাণ্ড নয়, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। তিনি দাবি করেন যে দুর্বৃত্তরা যখন হামলা চালায়, তখন বিএসএফ সদস্যরা আত্মরক্ষায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে। এটি ২০১৮ সালের এপ্রিল চুক্তির লঙ্ঘন। এতে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছিল।

দিল্লিতে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে বিজিবি প্রধান মিডিয়াকে জানান যে তিনি সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের বাংলাদেশী লোকজনকে হত্যা নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন এবং এর জবাবে বিএসএফ আশ্বাস দিয়েছে যে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে সতর্কতা জারি করা হবে। ঘটনাক্রমে দুই সীমান্ত বাহিনীর প্রধানের মধ্যে বৈঠকের পর দিনই বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশী নিহত হয়।

সীমান্তে অব্যাহতভাবে মৃত্যুতে অস্বস্তি বোধ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১১ জানুয়ারি বলেন যে ভারত সীমান্ত এলাকায় একজনেরও মৃত্যু না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড একটি বাস্তবতা। আমরা উদ্বিগ্ন। তিনি আরো বলেন, ভারত যাতে তার প্রতিশ্রুতি রাখে, সে দাবি জানাবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত এলাকা ঘন বসতিপূর্ণ। নদী ভাঙ্গনে কৃষিজমি ও জীবিকা হারানো উভয় দেশের অনেক লোক গরু পাচার ও অন্যান্য পণ্যের চোরাচালানের মতো আন্তঃসীমান্ত কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। চোরাচালানে জড়িত থাকতে পারে, এই সন্দেহেই অনেককে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করা হয়। এমনকি আটকের ঝুঁকি হ্রাস করতে চোরাকারবারীদের ব্যবহৃত শিশুরাও প্রাণঘাতী অস্ত্রের নির্দয় ব্যবহারের শিকার হয়।

ভারতীয় পক্ষ আত্মরক্ষার্থেই কেবল অস্ত্র হাতে নিচ্ছে বলে যে যুক্তি দিচ্ছে, সেটাও বাস্তব তথ্যে সমর্থনযোগ্য নয়। কয়েক বছর আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্য নথি প্রকাশ করে বেঁচে যাওয়া ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলেছিল যে বিএসএফ কোনো হুঁশিয়ারি ছাড়াই নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। তারা জানিয়েছিল, বিএসএফ তাদেরকে গ্রেফতার করার চেষ্টা ছাড়াই গুলি বর্ষণ করেছে। গ্রেফতারের সময় দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার কারণেই বিএসএফ গুলি করছে বলে যে দাবি করা হয় সেটাও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের যুক্তিতে টেকে না।

শিশুদের ওপর নির্যাতন চালানোর ঘটনাও অনেক। গত ১০ মে কবিরুল ইসলামকে বিএসএফ সদস্যরা নির্যাতন করার পর তার মুখে ও পায়ুপথে পেট্রোল ঢেলে দেয়। এরপর ২৭ মে নওগাঁয়ের সাপার সীমান্তে কিশোর এক রাখালের দুই হাতের ১০ আঙুলের নোখ উপড়ে ফেলে তারা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকার ও আইন ও সালিস কেন্দ্র এবং সেইসাথে মূলধারার মিডিয়া জানিয়েছে, বিএসএফের হাতে হত্যার শিকার লোকেরা হয় নিরস্ত্র ছিল কিংবা বড়জোর তাদের কাছে ছিল লাঠি, ছুরি বা কাস্তে। তাদের মোকাবিলায় বিএসএফ অনেক বেশি শক্তি প্রয়োগ করেছে। কোনো ঘটনাতেই বিএসএফ নিহত ব্যক্তির কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক আছে বলে দেখাতে পারেনি। ফলে বিএসএফের ‘হত্যার জন্য গুলিবর্ষণ’ করার নীতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাফ।

সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিকদের বেআইনিভাবে হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগে নয়া দিল্লি বলতে গেলে কর্ণপাতই করেনি। কোনো বাংলাদেশীকে হত্যার পর সংশ্লিষ্ট বিএসএফ সদস্যের বিচার করার কোনো ঘটনা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারকে জানায়নি। জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় বিএসএফের সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারছে।

সুপ্রতিবেশীত্বের দাবি হলো সীমান্তে অনুপ্রবেশের বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সুরাহা করা হবে। বরং সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের বাহিনী আইনের শাসন ও মৌলিক মানবাধিকার অনুসরণ করে চলবে। ভারত সরকারের উচিত হবে বিএসএফকে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘের নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া। ভারত সরকার নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের নাগরিক সমাজের সংস্থাগুলোর উচিত হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো, যেখানে উভয় দেশের নাগরিকেরা তাদের অভিযোগ দায়ের করতে পারবে।

চলতি বছরের প্রথম ১৫ দিনে ইতোমধ্যে সীমান্তে বিএসএফের হাতে তিন বাংলাদেশীর নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড এ ধরনের বৃদ্ধি ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তা বন্ধ করতে অর্থপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থতায় বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকারের জন্যও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। নয়া দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য এখনই সময় এ ধরনের নীতির অবসান ঘটানো।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]