জাতীয়
কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন প্রতারণার শিকার ৭০ যুবক
কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন প্রতারণার শিকার ৭০ যুবক





আবু দারদা যোবায়ের, পালাবদল ডটনেট
Thursday, Oct 1, 2020, 9:41 pm
Update: 01.10.2020, 9:46:00 pm
 @palabadalnet

ঢাকা: মাসে পাঁচশ ডলারের চাকরির প্রলোভনে পড়ে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে কম্বোডিয়া গিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন ৭০ যুবক। বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ বিমানের  বিজি-৪০৬২ নাম্বারের  বিশেষ ফ্লাইটে  নমপেন থেকে ৭৬ জন যাত্রী নিয়ে দেশে ফিরেছে। এছাড়াও ওই ফ্লাইটে সেখানে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া ফেনীর জাফরের লাশও দেশে এসেছে। 

কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে আসা ওই প্রতারিত যুবকরা জানান, নিজেদের অর্থে কেনা টিকিটে তাদের দেশে ফিরতে হয়েছে। তারা জানান, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে গার্মেন্টস ও নির্মাণ শিল্পে চাকরি দেয়ার নাম করে তাদের সেদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকার মালিবাগ ও পল্টনের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ও জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের নমপেনে থাকা দালালদের মাধ্যমে সেখানকার বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা ও বড়বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির অফার লেটার সংগ্রহ করে । বাংলাদেশে  সেই অনুযায়ী গ্রামের নিরীহ যুবকদের মাসিক পাঁচশ ডলার বেতন ও থাকা- খাওয়া ফ্রি- এমন প্রলোভন দেখিয়ে আড়াই থেকে চার লাখ  টাকার বিনিময়ে তাদের কম্বোডিয়া নিয়ে যায়। 

প্রতারিত যুবকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সেখানে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা তো হচ্ছে না, উল্টো তাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। 

ময়মনসিংহের আল আমিন জানান, তিনিসহ আরো কয়েকজন যুবক গত ২০ জানুয়ারি নমপেন এয়ারপোর্টে নামার পর ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হলে  ‘দ’ অক্ষরের এক দালাল তাদের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় । গার্মেন্টসে চাকরি দেয়ার কথা বলে নেয়া হলেও দৈনিক দশ বার ডলারে ডে লেবারের কাজ দেয়া হয়। কয়েকদিন পর তাদের খাওয়া-দাওয়া দেয়া হতো না। মাস শেষে বাসা ভাড়া বিদ্যুৎ বিল সবই তাদের পরিশোধ করতে হয়েছে।  এভাবে তারা জানতে ও বুঝতেপারেন যে তারা আসলেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। 

মার্চ মাস থেকে কোভিড-১৯ শুরু হলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায় । আটকে পড়েন তারা।   

নমপেনে বৈধভাবে বসবাস করে এমন একাধিক বাংলাদেশি জানান,  গত কয়েক বছর ধরে নমপেনে কোরিয়া, চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা সেখানে রাস্তাঘাট ও আবাসনশিল্প সহ নানা খাতে বিনিয়োগ করছে এবং প্রচুর অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা বাংলাদেশ থেকে সেখানে পাঁচশ ডলারের বেতনের চাকরি প্রলোভন দিয়ে কম্বোডিয়া নিয়ে যায়। কিন্তু পাঁচশ ডলার বেতন  তো দূরের কথা নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া ও থাকার টাকাও চাকরিপ্রত্যাশী ভাগ্যহত যুবকদের মিলছে না। 

ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চাকরির নামে প্রতারিত হতভাগা যুবকদের দেশে ফিরে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম ব্যবসায়ী এম এইচ কবির, আবুল খায়ের মিয়া ,ডক্টর জিয়াউদ্দিন হায়দার সহ অনেকেই সহযোগিতা করেছেন।  

ভাগ্যাহত যুবকরা জানান ,বাংলাদেশি দালাল চক্র কম্বোডিয়ার নির্মাণ ঠিকাদারদের কাছ থেকে দৈনিক ১২ ডলার করে আদায় করলেও তা নিজেদের পকেটে রেখে দিচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের ভাগ্যে জুটে নানা নির্যাতন। 

নমপেনের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অর্ধাহারে অনাহারে থাকা বেশ কয়েকজনকে হতভাগা যুবকের পাশে দাঁড়িয়েছেন বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারীরা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। যতটুকু সম্ভব আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তারা। অনেককে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর যারা দেশে ফিরে আসতে চেয়েছেন তাদেরকে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন।

বৈধভাবে বসবাসকারী কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে  ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ৭০ হতভাগ্য প্রতারিত যুবকসহ ৭৭ জন দেশে ফিরে গেছেন। আরো কয়েকশ বাংলাদেশি যুবকও এখনও রাজধানী নমপেন সহ কম্বোডিয়ার বিভিন্ন শহরে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছেন। অনেকে দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকলেও টিকিট কেনার টাকা না থাকায় ফিরতে পারছেন না। 

জানা যায়, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশি প্রতারক চক্র টাকার বিনিময়ে সেদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চুক্তি করে কাগুজি অফার লেটার সংগ্রহ করে। একই সাথে তারা  সেদেশের ইমিগ্রেশন বিভাগের  অসাধু  কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের ঘুষ দিয়ে চাকরির অফার লেটার বৈধ- এমন স্বীকৃতি নিয়ে রাখে। তারপর তা বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে পাঠায়। এদের জালিয়াতির হাত এতো লম্বা যে এরা বাংলাদেশ দূতাবাস ও জনশক্তি রফতানি ব্যুরোর কর্মকর্তাদের সিল স্বাক্ষর পর্যন্ত নকল করছে- এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা সহ সারা দেশের এজেন্সিগুলো সাব-দালালের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জ থেকে যুবকদের মাসিক পাঁচশ ডলারের বেতনের  চাকরির লোভনীয় অফার দেয়। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। 

এই চক্রটি মালয়েশিয়া হয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে আসে বাংলাদেশি চাকরি প্রত্যাশী যুবকদের। প্রতারণার শিকার হতভাগ্য যুবকদের দাবি সরকার , প্রবাসী কল্যাণ  মন্ত্রনালয়, জনশক্তি রফতানি ব্যুরো , হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগ সহ সংশ্লিষ্টদের আরো সজাগ ও সতর্ক হওয়া জরুরি। তাদের বলছেন,  কম্বোডিয়ার কোনো চাকরিদাতা কোম্পানির অফার লেটার  ছাড়া কোনো দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো কোনো চাকরির অফার লেটারে কম্বোডিয়াতে যাতে কেউ না যায় । সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কঠোর হস্তক্ষেপ এ ক্ষেত্রে জরুরি বলে মত দিয়েছেন কম্বোডিয়ায় প্রতারিত হতভাগ্য নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসা যুবকরা।  

এর আগে গত ৭ জুলাই প্রথম বিশেষ ফ্লাইটে করে কম্বোডিয়া থেকে ৫৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে আসেন। 

পালাবদল/এমএম


  এই বিভাগের আরো খবর  
  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  


Copyright © 2019
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৭৩/৩২ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, কলাবাগান, ঢাকা-১২০৫
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]