
আমাল আবু সাইফ: গাজার একজন ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক।
কেন্দ্রীয় গাজা উপত্যকার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শিরিন আল-কুরদি ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিক্রির জন্য ক্রোশের পুতুল তৈরি করছেন। ছবি: আল জাজিরা
বিশ্বের দৃষ্টি যখন ইরান যুদ্ধের দিকে নিবদ্ধ, তখন নীরবে ইসরায়েল গাজার ওপর তার অবরোধ আরও কঠোর করেছে, পণ্য ও ত্রাণ প্রবাহে বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ঈদুল ফিতরের সূচনা-যা আনন্দ ও পারিবারিক মিলনের সময় হওয়ার কথা-সেই সময়ে গাজার লাখো মানুষ তীব্র সংকট ও ক্রমবর্ধমান কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যে সময়টি উদযাপনের হওয়ার কথা ছিল, তা এখন উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে; ক্রমাগত সংকট ঈদের সামান্য আনন্দটুকুও কেড়ে নিচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক সংকট শুধু সাধারণ মূল্যস্ফীতি বা সাময়িক পণ্যের ঘাটতির বিষয় নয়; বরং এটি ইসরায়েলি দখলদারিত্ব, স্থানীয় বাজারের গতিশীলতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কৌশলের জটিল পারস্পরিক প্রভাবের ফল। ইসরায়েল বারবার ইরান বা লেবানন-সম্পর্কিত উত্তেজনার মতো বাহ্যিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তপথে পণ্যের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং একই সঙ্গে গাজার ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়েছে। এর ফলে বাসিন্দারা সরাসরি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটের মুখে পড়ছে।
বাজারে পণ্য থাকলেও, কিছু ব্যবসায়ী সংকটকে পুঁজি করে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আগে যে টমেটোর দাম ছিল ৩ শেকেল (০.৯৭ ডলার), তা এখন বেড়ে হয়েছে ২০ শেকেল (৬.৪৮ ডলার)। নিত্যপ্রয়োজনীয় টিনজাত পণ্যের দামও একইভাবে বেড়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম এখন ৮ কেজি সিলিন্ডারের জন্য ৮০ শেকেল (২৫.৯২ ডলার), অর্থাৎ একটি পরিবারকে শুধু গ্যাসের জন্যই মাসে প্রায় ৬৪০ শেকেল (২০৭.৩৭ ডলার) খরচ করতে হয়। বিদ্যুতের দামও প্রতি ইউনিট ১৮ শেকেল (৫.৮৩ ডলার) থেকে বেড়ে ২৫ শেকেল (৮.১০ ডলার) হয়েছে। যেসব পরিবার কাঠের পরিবর্তে কেরোসিনের চুলা (বাবুর) ব্যবহার করে, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
দাম বৃদ্ধির এখানেই শেষ নয়। মাংস অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে, প্রয়োজনীয় ওষুধ যুক্তিসঙ্গত দামে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, এমনকি ঈদের সাধারণ ঐতিহ্যগুলিও অনেকের জন্য অধরা হয়ে গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি দেখায়, কীভাবে কিছু ব্যবসায়ী জনগণের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও মানসিক চাপকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা করছে, যা মানুষের মধ্যে অবিচার ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চলমান যুদ্ধ, বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, এবং বহিরাগত সংঘাতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েলের সামরিক চাপ প্রয়োগ-এসব মিলিয়ে “গাজা থেকে অব্যাহত নিরাপত্তা হুমকি” কথাটি বারবার একটি অজুহাতে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে সীমান্তপথ বন্ধ রাখা বা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এভাবে গাজা ক্রমশ বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামরিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজায় ঈদুল ফিতর দৈনন্দিন কষ্টের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পরিবারগুলোকে এখন মৌলিক প্রয়োজন মেটানো আর ঈদের ঐতিহ্য পালনের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। মাংস, সবজি ও রান্নার গ্যাস অনেকের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে, আর অধিকাংশ মানুষ নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে।
পণ্য সরবরাহ থাকলেও একচেটিয়া ব্যবসা ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাজারকে অস্থির করে তুলেছে এবং গাজার অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। দাম স্থিতিশীল করা বা সরবরাহ বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগই অবরোধজনিত কঠোর সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে, ফলে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে দ্রুত মুনাফা করার সুযোগ পায়।
সবশেষে, গাজার সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি দখলদারিত্ব, অবরোধ, বাণিজ্যিক শোষণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতির জটিল সমন্বয়ের প্রতিফলন, যা অঞ্চলটিকে প্রান্তিক করে রেখেছে।
একসময় আনন্দের প্রতীক ঈদুল ফিতর এখন হারিয়ে যাওয়া উৎসবের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে, একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি আহ্বান-মানবিক সহায়তার প্রবাহ নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষকে শোষণ থেকে রক্ষা করা এবং মানবিক দুর্ভোগকে মুনাফার সুযোগে পরিণত হওয়া থেকে রোধ করা।
আমাল আবু সাইফ: গাজার একজন ফিলিস্তিনি লেখক ও গবেষক।
সূত্র: আল জাজিরা