বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার ২৪ জুন ২০২৬
 
মতামত
ইসরাইলকে ভ্যান্সের সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত





সাঈদ আরিকাত
Wednesday, 24 June, 2026
2:05 AM
 @palabadalnet

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: সংগৃহীত

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরাইলকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক নিয়ে কোনো জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য মন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এটি শুধু মতবিরোধের প্রকাশ নয়-এ ধরনের উত্তেজনা আগেও দেখা গেছে-বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের জোটের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা একটি মৌলিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে: ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেও ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত নিজের নীতি পরিবর্তন করবে।

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভ্যান্স বলেন, “আমি যদি ইসরাইল সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তাহলে পৃথিবীতে আমার হাতে থাকা একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতাম না।”

এই বক্তব্যের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এর অন্তর্নিহিত বার্তায়। ভ্যান্স প্রকাশ্যে এমন একটি বাস্তবতার কথা স্বীকার করেছেন, যা মার্কিন কর্মকর্তারা এতদিন সরাসরি বলতে এড়িয়ে গেছেন: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, তার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন আর ইসরাইলের আপত্তিকে মার্কিন নীতির ওপর কার্যত ভেটো হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ট্রাম্পের ইরান-চুক্তি। এই সমঝোতার মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনাপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য নাজুক যুদ্ধবিরতিকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তি কাঠামোয় রূপ দেওয়া। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, নতুন সংঘাতের চক্রে না গিয়ে কূটনৈতিক পথই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য উত্তম সমাধান।

কিন্তু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে এই চুক্তি বহু বছরের অনুসৃত কৌশলের জন্য বড় ধাক্কা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হবে। ফলে তেহরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন তার সেই কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহু-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ট্রাম্পের উপদেষ্টা  স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সমালোচনা করেছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসে ইসরাইলপন্থী রাজনীতিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল গণমাধ্যমও ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা শুরু করেছে।

লক্ষ্যটি পরিচিত-হোয়াইট হাউসের ওপর যথেষ্ট রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা আলোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নেয়। ওবামা প্রশাসনের সময়ও নেতানিয়াহু একই কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ২০১৫ সালে, যখন তিনি মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দিয়ে তৎকালীন ইরান পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেন।

তবে আজকের পরিস্থিতিতে যা ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে, তা হলো ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া। অবস্থান নরম করার বদলে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই পাল্টা জবাব দিয়েছে। ভ্যান্স যখন উল্লেখ করেন যে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকান অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে নির্মিত, তখন তিনি এমন একটি বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন যা মার্কিন কর্মকর্তারা সচরাচর আলোচনা করেন না। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট-মিত্রতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইসরাইলের কৌশলগত স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি এবং একজন রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্টের মুখে এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আলোচনার সাফল্য যখন নাগালের মধ্যে ছিল, তখন বৈরুতে ইসরাইলি হামলার সমালোচনা। ভ্যান্স উল্লেখ করেন, নিহতদের অনেকেই বেসামরিক নাগরিক ছিলেন এবং এ ধরনের হামলা বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। এই সমালোচনা প্রশাসনের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন, যেখানে কিছু কর্মকর্তা মনে করেন ইসরাইল এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যা ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগকে জটিল বা ব্যর্থ করে দিতে পারে।

এখানেই মতবিরোধটি শুধু ইরান চুক্তির সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর রূপ নেয়। মূলত দুটি ভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসন ক্রমশ বিশ্বাস করছে যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন, যা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে এবং সংঘাতের প্রণোদনা কমাবে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু এখনো চাপ, প্রতিরোধ এবং মুখোমুখি অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নীতির প্রতি অনড়। এগুলো কেবল ভিন্ন কৌশল নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা নিয়ে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গি।

দশকের পর দশক ধরে ইসরাইলি নেতারা ধরে নিয়েছিলেন যে আঞ্চলিক হুমকি সম্পর্কে তাদের মূল্যায়নের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন নিজেকে সামঞ্জস্য করবে। কিন্তু ভ্যান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সেই ধারণা হয়তো আর আগের মতো সত্য নয়।

তার মন্তব্যগুলো আরও একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশের কাছ থেকে ইসরাইল ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে। গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ অনেক ঐতিহ্যগত মিত্র দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলেছে এবং ইসরাইলের ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে।

এই বাস্তবতা ইসরাইলের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করেছে এবং ওয়াশিংটনের ওপর তার নির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে।

ভ্যান্সের সতর্কবার্তায় এই বিষয়টি অস্বাভাবিক স্পষ্টতার সঙ্গে উঠে এসেছে। তার বক্তব্যের মূল বিষয় শুধু এই ছিল না যে ইসরাইলের যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, অতীতের তুলনায় ইসরাইলের সামনে এখন কৌশলগত বিকল্প অনেক কম।

তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের সম্পর্ক ভাঙনের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে সামরিক, গোয়েন্দা, প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জোটের চরিত্র বদলায়। সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো সম্পর্কচ্ছেদ নয়, বরং সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য নির্ধারণ।

ওয়াশিংটন হয়তো ভবিষ্যতেও ইসরাইলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে যাবে, কিন্তু বৃহত্তর আঞ্চলিক লক্ষ্যগুলোকে ইসরাইলের পছন্দ-অপছন্দের অধীনস্থ করতে আগের মতো আগ্রহী নাও থাকতে পারে। ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলো ক্রমেই ইসরাইল রাষ্ট্রকে সমর্থন করা এবং কোনো নির্দিষ্ট ইসরাইলি সরকারের নীতিকে সমর্থন করার মধ্যে পার্থক্য টানতে পারে।

যদি ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত আলোচনা বাস্তব ফলাফল এনে দেয়-যেমন উত্তেজনা হ্রাস, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ইরানের প্রভাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ-তাহলে এই প্রবণতা আরও দ্রুত এগোবে।

অতএব, ভ্যান্সের বক্তব্যের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে এই কারণে যে এটি দুই দেশের সম্পর্কের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে মার্কিন নেতারা প্রকাশ্যে খুব কমই ইসরাইলের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতার কথা বলেছেন। ভ্যান্স তা বলেছেন। কয়েক দশক ধরে ইসরাইলি সরকারগুলো ধরে নিয়েছিল যে তারা ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মার্কিন নীতির গতিপথ বদলে দিতে পারবে। ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেই সময় হয়তো আর নেই।

এ কারণেই তার সতর্কবার্তা ইরান-সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক বিতর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে হয়তো এটিকে সেই মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হবে, যখন একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইসরাইলের অগ্রাধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেনে নেওয়ার যুগ শেষের পথে। আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক প্রবেশ করছে এমন এক নতুন পর্যায়ে, যা অভ্যাসগত সমর্থনের চেয়ে বেশি নির্ধারিত হবে মার্কিন স্বার্থ, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা।

সাঈদ আরিকাত: একজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক এবং জেরুজালেমভিত্তিক সংবাদপত্র  আল কুদস-এর ওয়াশিংটন ব্যুরো প্রধান।


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]