বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার ২৪ জুন ২০২৬
 
মতামত
ট্রাম্পের যুদ্ধকে ‘ইরানের বর্বরতা বনাম সভ্য পশ্চিম’ হিসেবে উপস্থাপন-একটি বড় মিথ্যা





পিটার ওবোর্ন ও ইরফান চৌধুরী
Saturday, 18 April, 2026
2:32 PM
Update: 18.04.2026
2:35:48 PM
 @palabadalnet

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সমাবর্তনের দিনে (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫) দুই নারী শিক্ষার্থী সেলফি তুলছেন। ছবি: এএফপি

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সমাবর্তনের দিনে (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫) দুই নারী শিক্ষার্থী সেলফি তুলছেন। ছবি: এএফপি

ইরানের ওপর অবৈধ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার কেন্দ্রে দুটি মৌলিক ভ্রান্ত ধারণা কাজ করছে।

প্রথমটি হলো-ইরান একটি বর্বর দেশ, যা মধ্যযুগে আটকে আছে এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অক্ষম। ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা যুদ্ধাপরাধ হবে না কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন: “ওরা পশু।”

দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হলো-যুক্তরাষ্ট্রই পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে।

এই নিবন্ধে আমরা উভয় পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিদের বৌদ্ধিক সক্ষমতা ও অর্জন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই মৌলিক অনুমানগুলোকে খতিয়ে দেখি।

আমরা দেখাব, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের নেতৃত্ব অনেক বেশি পরিশীলিত, বুদ্ধিদীপ্ত, শিক্ষিত ও কৃতিত্বপূর্ণ।

চলুন শুরু করা যাক ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনা দিয়ে।

খামেনি ছিলেন একজন মারজা-অর্থাৎ দ্বাদশী শিয়া ইসলামে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ। ব্রিটিশ প্রেক্ষাপটে এর নিকটতম তুলনা হতে পারে কিংস কাউন্সেল বা হাইকোর্টের বিচারক।
মরহুম এই সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন অসাধারণ ভাষাবিদ; মাতৃভাষা ফারসির পাশাপাশি তিনি আরবি, আজেরি ও তুর্কি ভাষায় সাবলীল ছিলেন এবং ইংরেজিতেও যথেষ্ট দখল ছিল।

তিনি পারস্য কবিতার অনুরাগী ছিলেন, পাশাপাশি পাশ্চাত্য সাহিত্যও বিস্তৃতভাবে পড়েছেন-জেন অস্টেন, লিও টলস্টয়, দান্তে আলিগিয়েরি, জন স্টেইনবেক ও হ্যারিয়েট বিচার স্টো প্রমুখ।

২০০৪ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন: “আমার মতে ভিক্টর হুগোর ‘লে মিজারেবল’ এখন পর্যন্ত লেখা সেরা উপন্যাস।” বিচার-বিশ্লেষণ মন্দ নয়।

তীব্র বৈপরীত্য

খামেনি এবং যিনি তার হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন-এই দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের বই The Art of the Deal-এর সহলেখক টনি শোয়ার্টজ ধারণা করেন, ট্রাম্প প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে কখনো একটি বইও পড়েননি।

Fire and Fury: Inside the Trump White House বইয়ে জীবনীকার মাইকেল উলফ লিখেছেন: “অনেকে বিশ্বাস করতেন (তার প্রথম মেয়াদকালে) বাস্তবিক অর্থে তিনি আধা-সাক্ষর।”

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নিহত সচিব ড. আলি লারিজানি এবং তার মার্কিন সমতুল্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। হেগসেথ প্রিন্সটনে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু তার একাডেমিক অর্জন লারিজানির সঙ্গে তুলনীয় নয়।

লারিজানি কান্টের গণিত বিষয়ক গবেষণায় পিএইচডি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে কান্টের ওপর তিনটি বই লেখেন।

ইসরায়েলি সাংবাদিক গিদ’অন লেভ লিখেছেন: “দশকের পর দশক সরকারে দায়িত্ব পালন করেও তিনি তার প্রধান অনুরাগ-দর্শন-ত্যাগ করেননি।”

তিনি লারিজানিকে “একজন মেধাবী চিন্তাবিদ, যিনি চিন্তন ও কর্ম-দুই জীবনকে বিরলভাবে একত্র করেছেন” বলে উল্লেখ করেন।

লারিজানি ও সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক, মদ্যপ ও পক্ষপাতদুষ্ট পিট হেগসেথের তুলনা সত্যিই বিব্রতকর।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্বাস আরাঘচি কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক চিন্তায় পিএইচডি অর্জন করেছেন। তার গবেষণায় পাশ্চাত্যধারার উদার গণতন্ত্র ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার সংযোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বৌদ্ধিকভাবে তিনি তার মার্কিন সমকক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর তুলনায় উচ্চতর স্তরে অবস্থান করেন, যিনি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার করেন।

এবার আসা যাক হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মুখপাত্রদের দিকে-কারোলিন লিভিট, স্টিফেন মিলার ও সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।

এর নিকটতম ইরানি সমতুল্য হতে পারেন সাইয়্যেদ মোহাম্মদ মারান্দি। তিনি বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি বায়রন নিয়ে পিএইচডি করেছেন এবং বর্তমানে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও ওরিয়েন্টালিজম পড়ান।

ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক তুচ্ছ ব্যক্তিত্বের বিপরীতে মারান্দির বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে-ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি দুইবার রাসায়নিক অস্ত্র হামলা থেকে বেঁচে যান।

তিনি ধারাবাহিকভাবে ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে ট্রাম্পের মুখপাত্রদের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগত ও নির্ভুল বিশ্লেষণ দিয়েছেন।

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চ বৌদ্ধিক মান তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন।

শাহ আমলে শিক্ষার মান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ইসলামি বিপ্লবের পর তা ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে নারী স্নাতকের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি।

ইসলামি বিপ্লবের পর উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। আগে যেখানে অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিল, এখন প্রায় সবাই পড়তে-লিখতে পারে।

১৯৬৬ সালে নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৭.৪২% এবং পুরুষদের ৩৯.১৯%। ২০২২ সালে ১৫–২৪ বছর বয়সী নারীদের সাক্ষরতার হার ৯৯%।

শিক্ষাবিদ নরম্যান ফিঙ্কেলস্টেইন ২০১৪ সালে ইরানের ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জন স্টুয়ার্ট মিল পড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন:

“এটি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক শিক্ষাদান অভিজ্ঞতা… ধর্মীয় শিক্ষার্থীরা খুবই মেধাবী ও সিরিয়াস ছিল।”

এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন-ছাত্রটির মোবাইল ফোন ছিল না। কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল: “বই পড়লে সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়।” ফিঙ্কেলস্টেইনের কাছে এটি ছিল একটি বিশেষ মুহূর্ত।

অবশ্যই ইরানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দেশটিকে পশ্চাৎপদ হিসেবে তুলে ধরে, বাস্তবতা ততটা সরল নয়।

ট্রাম্প ইরানকে “সন্ত্রাস ও ঘৃণার দেশ” এবং “৪৭ বছর ধরে দুষ্ট” বলে অভিহিত করেছেন।

মার্কিন ও ইসরায়েলি বয়ানে ইরানকে এককভাবে মন্দ ও সভ্যতার বিপরীত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আমাদের মতে, এই ভ্রান্ত বিশ্লেষণই ব্যাখ্যা করে কেন গত পাঁচ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে তারা বারবার কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]