
হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হামলায় গুরুতর আহত আলিফ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এখন যে বিষয় আরও বেশি উদ্বেগের, তা হলো, সহিংসতার পর সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের গবেষণায় বলা হয়, রাজনৈতিক শক্তিগুলো শুধু ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, তারা ঘটনার অর্থও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অর্থাৎ কে হামলা করল, কেন করল এবং মানুষ সেই ঘটনাকে কীভাবে দেখবে, সেটিও তারা নির্ধারণ করতে চায়। অনেক সময় এ বয়ান তৈরির লড়াই বাস্তব ঘটনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ প্রবণতা বহুদিনের। একসময় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রদল বা গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার পর বলতেন, প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভে এমন ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রলীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এখানে হামলার ঘটনাকে অস্বীকার করা হতো না; বরং সেটিকে ‘জনরোষ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে রাজনৈতিক দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হতো। রাজনীতিবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই ন্যারেটিভ জাস্টিফিকেশন; অর্থাৎ নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে সহিংসতাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা।
এখন দৃশ্যপট কিছুটা বদলেছে। কিন্তু উদ্বেগ কমেনি, বরং বেড়েছে। আগে অন্তত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতাকেই প্রকাশ্যে উদ্যাপন করা হচ্ছে। ‘গালি যদি আর্ট হয়, তাহলে মারও শৈল্পিক’ ধরনের ভয়ংকর বয়ান প্রকাশ্যে উদ্যাপন করা রাজনৈতিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। এতে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করাকে বীরত্ব কিংবা হাস্যরসের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন মানসিকতা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও। এর ফলে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে-রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু গ্রহণযোগ্যই নয়, প্রয়োজনে তা আবারও ঘটানো হবে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হামলায় আলিফ নামের এক তরুণ গুরুতর আহত হন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার চোখে রড দিয়ে আঘাত করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে গেছে। একই ঘটনায় একটি রেন্ট এ কার প্রতিষ্ঠানের চালকও মারধরের শিকার হন। তার “অপরাধ’ ছিল বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বহনকারী গাড়ি চালানো।
এ ধরনের ঘটনার পর রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি বিষয়েই সবাই একমত হওয়ার কথা ছিল-১৮ বছর বয়সী একজন তরুণের ওপর এমন নৃশংস হামলার বিচার হতে হবে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সহিংসতার নিন্দার পরিবর্তে সেটিকেই অনেক ক্ষেত্রে উদ্যাপন করা হচ্ছে। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে এই সহিংসতার রেশ হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার এই স্বাভাবিকীকরণ বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, যে সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সেখানে বিনিয়োগ কমে, মানুষের পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও বারবার উঠে এসেছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দেয়। ইতালির ফ্যাসিবাদ, জার্মানির নাৎসিবাদ কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক শাসনের শুরুতে রাজনৈতিক সহিংসতাকে ‘দেশপ্রেম’, ‘শৃঙ্খলা’ কিংবা ‘জনরোষ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসও দেখায়, একবার সহিংসতা রাজনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে গেলে তা আর কোনো একটি দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। শেষ পর্যন্ত সেটি পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্থির করে তোলে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, নির্বাচন, হরতাল কিংবা দলীয় সংঘর্ষ-প্রতিটি সময়েই কোনো না কোনো পক্ষ নিজেদের সহিংসতার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য যে সংস্কৃতি তৈরি করা হয়, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই একই সংস্কৃতি নতুন রূপে ফিরে আসে। সহিংসতার চক্র এভাবেই চলতে থাকে।
একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের শক্তি পেশিশক্তিতে নয়; তার শক্তি জনসমর্থন, সাংগঠনিক সক্ষমতা, নৈতিক অবস্থান ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতিতে। প্রতিপক্ষকে মারধর করে, আহত মানুষের ছবি নিয়ে হাসাহাসি করে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা উদ্যাপন করে সাময়িক উল্লাস পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এতে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না; বরং এমন একটি সমাজ তৈরি হয়, যেখানে যুক্তির বদলে শক্তি এবং ভোটের বদলে ভয় কাজ করে।
গণতন্ত্রের মূল শিক্ষা খুবই সহজ-কথার জবাব কথা, যুক্তির জবাব যুক্তি এবং অপরাধের বিচার আদালতে। কোনো বক্তব্যের জবাবে একজন মানুষের চোখ নষ্ট করে দেওয়া বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কখনো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না।
মনে রাখা দরকার, যে সমাজে সহিংসতা রাজনৈতিক যোগাযোগের স্বীকৃত মাধ্যম হয়ে যায়, সেখানে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না। না সরকার, না বিরোধী দল, না সাধারণ নাগরিক।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য