বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার ২৪ জুন ২০২৬
 
মতামত
জিয়ার সমন্বয়ের রাজনীতি বনাম ফখরুলের নির্মূলের রাজনীতি





আলফাজ আনাম
Sunday, 26 April, 2026
2:07 AM
 @palabadalnet

আলফাজ আনাম,সিনিয়র সাংবাদিক। ছবি: সংগৃহীত

আলফাজ আনাম,সিনিয়র সাংবাদিক। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছু ক্ষেত্রে তার বাবার রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন। জিয়াউর রহামন এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ের রাজনীতি করেছেন। তিনি মুসলিম লীগ ও বামপন্থীদের সমন্বয়ে দল গঠন করেছিলেন। বহুদলীয় রাজনীতি ফিরে এনে দেশে ইসলামপন্থীদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। এগুলো তিনি করেছিলেন তার ক্ষমতা সংহত করার জন্য। দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আনাও ছিল তার লক্ষ্য। এর মধ্য দিয়ে  জিয়াউর রহমান সেনাশাসক থেকে হয়ে উঠেন গণতান্ত্রিক এক রাষ্ট্রনায়ক। যা সারা বিশ্বে তার মর্যাদা বাড়িয়ে তোলে।  

তিনি  শুধু দেশে নয় দেশের বাইরে  একজন প্রভাবশালী নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জিয়াউর রহমান বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। এর কারণ তৎকালীন আরব শাসকরা তাকে পছন্দ করতেন। এর সাথে দেশের ভেতরে ইসলামপন্থী রাজনীতির যে সুযোগ তিনি সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন তার প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল। সে সময় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মুসলিম ব্রাদারহুডের ছিল অপরিসীম প্রভাব। জিয়াউর রহমানকে দেখা হতো ইসলামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একজন সরকার প্রধান হিসাবে। এর সুবিধাও তিনি পেয়েছেন। সেই সময় আরব দেশগুলো থেকে যেমন বিপুল অনুদান এসেছে তেমনি জনশক্তি রফতানির সে সময়ই শুরু হয়েছিল। যা বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করেছিল।  

জিয়াউর রহমানের সময় দলের দলের মধ্যে নানা পক্ষ ছিল। এদের অনেকে ইসলামপন্থীদের প্রতি সহনশীল ও সহনীয় রাজনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। সে সময় জামায়াত এতো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছিল না, এরপরও সে সময়ও জামায়াতের বিরোধিতা ছিল। জিয়াউর রহমান জামায়াতবিরোধী পক্ষকে খুশি রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে জামায়াতকে চাপে রাখার চেষ্টা করেছেন। এক পর্যায়ে তাদের পরামর্শে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে হাসিনা দেশে ফেরেন। হাসিনা দেশে ফেরার দুই সপ্তাহের কম সময়ের  মধ্যে ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।  

জিয়াউর রহমানের মতো তারেক রহমান মনে হচ্ছে, এক ধরনের সমন্বয়ের রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন। বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের নিয়ে জোট করে নির্বাচন করেছেন।  নির্বাচনের পর বিরোধী দলের দুই নেতার বাসায় গেছেন। বিরোধী দলের ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়েছেন। সংসদে সৌহাদ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। রাজনীতিতে এক ধরনের আশাবাদী হওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু এই পরিবেশ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামি শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপি মহাসচিব গতকাল (২৫ এপ্রিল) বলেছেন, জামায়াতকে রাজনৈতিক ভাবে নির্মূল করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত কোনো ছোটো দল নয়, দেশের প্রধান বিরোধী দল। প্রধান বিরোধী দলকে যদি নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করা হয় তাহলে প্রশ্ন আসে দেশে কী বিরোধী দল থাকবে না? 

আমার মনে হয় না, বিএনপি বিরোধী দলবিহীন বা একদলীয় শাসনের রাজনীতির পথে যাবে। এ ধরনের বক্তব্যর মূলে রয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ওরিয়েন্টশন। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি করার কথা। কিন্তু তিনি করছেন পূঁজিতান্ত্রিক বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল বিএনপি। কেন করছেন? কমিউনিস্ট পার্টির ‘গুপ্ত রাজনীতির’ অংশ হিসাবে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি আদর্শিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোরতর বিরোধী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই নীতি লালন করেন। সেই পুরনো আদর্শিক বোধ থেকে তিনি একথা বলেছেন। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনও সিপিবিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে মনে করেন। ৫ আগস্টে সেনাভবন ও বঙ্গভবনে কী হয়েছিল এ নিয়ে আমি একটি রিপোর্ট করেছিলাম। সে দিনের ঘটনা জানতে গিয়ে অনেক চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছিলাম। সেদিন আমার এক সোর্স ছিলেন সেনাভবনে। দুপুরের পর থেকে সেনাপ্রধানের ডাকে একের পর এক রাজনৈতিক দলের নেতারা আসছেন। আমার সেই সোর্স মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরিচিত। যে কক্ষে রাজনৈতিক নেতারা বসছেন সেখানে ঢোকার মুখে তার সাথে দেখা হয় মির্জা ফখরুলের। তাকে মির্জা ফখরুল জিজ্ঞাসা করেন কে কে এসেছেন? তিনি জানান- জোনায়েদ সাকি আছেন, আসিফ নজরুল আছেন, জামায়াতের আমির আছেন -এভাবে আরো কয়েক জনের নাম বলেন। এরপর বিএনপি মহাসচিব জিজ্ঞাসা করেন সিপিবির কেউ আসেননি? 

জুলাইয়ের আন্দোলনে সিপিবির কোনো ভূমিকাই ছিল না। দলটি ছিল হাসিনার দোসর। এরপরও মির্জা ফখরুল আশা করেছিলেন সেখানে সিপিবির প্রতিনিধি থাকবেন। 
বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতারা বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিএনপি হলো ‘গুপ্ত রাজনীতির’ কেন্দ্র। এখানে বহু মত  ও আদর্শের লোক আছে। তারা ছাত্রজীবনে যে আদর্শ ধারন করেন সেটি এখনও লালন করেন। আর বিএনপি করেন ক্ষমতার জন্য । মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্য। বিএনপি হলো সফল ‘গুপ্ত রাজনীতির’ আসল ঠিকানা। 

সমস্যা হলো যে দলের মধ্যে নানা মত ও লক্ষ্যের ‘গুপ্ত নেতা’ কাজ করে সে দলে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং একমুখী নীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন। জিয়াউর রহমান একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। চট্টগ্রামে উপদলীয় কোন্দল মেটাতে গিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। খালেদা জিয়াও বিভিন্ন সময় একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াসহ বিএনপির প্রভাবশালী বহু নেতা ওয়ান ইলেভেনের সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের অনেকে এবার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস যদি আমরা দেখি দলটির ডানপন্থী ধারা কখনো দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, কিন্তু বামপন্থীরা সব সময় বিএনপির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। 

এখন বিএনপির বামপন্থী অংশটি ‘গুপ্ত রাজনৈতিক’ বিশ্বাস থেকে ইসলামপন্থীদের নির্মূলের রাজনীতি শুরু করতে পারে। কিন্তু এর ফল দেশের জন্য বা দলের জন্য সুখকর হবে বলে মনে হয় না। তারেক রহমান যে ভারসাম্যপূর্ণ - সমন্বয়ের রাজনীতি করতে চাইছেন তা যে বাধাগ্রস্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আরো একটি কথা, এখন আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটছে। বিএনপির বামপন্থীরা বরাবর ভারতের সাথে সর্ম্পকের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভারত এখন কোণঠাসা। বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মতো সামর্থ্য ভারতের নেই। ইতোমধ্যে আইএমএফ ঋণের কিস্তি দিতে অস্বীকার করেছে। বিশ্বব্যাংকও একই পথে হাঁটবে। আমাদের হয়তো চীনের কাছে যেতে হবে। সরকারের ভারতমুখী নীতি চীনের পছন্দ হওয়ার কথা নয়। 

কয়েক দিন আগে অর্থ উপদেষ্টাকে নিয়ে মির্জা ফখরুল চীন সফর করে এসেছেন। সেখানে তিনি কতটা সাড়া পেয়েছেন তা আমরা জানি না। অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্টতা বাড়ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে পাকিস্তানের ড্রোন ও বিমানযুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয়ের পর আর্ন্তজাতিক ভাবে পাকিস্তানের মর্যাদা অন্য এক উচ্চতায় গেছে। আবার চীন হচ্ছে পাকিস্তানের অল ওয়েদার ফ্রেন্ড । সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে খুশি করতে ইসলামপন্থীদের নির্মূলের রাজনীতি বিএনপির জন্য কতটা সুবিধাজনক হবে তা ভেবে দেখার বিষয়।

আলফাজ আনাম: সিনিয়র সাংবাদিক


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]