রবিবার ২৮ জুন ২০২৬ ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার ২৮ জুন ২০২৬
 
মতামত
ডা.আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক (আজীবন) নিয়োগই অবৈধ





সায়ন্থ সাখাওয়াত
Sunday, 28 June, 2026
12:01 AM
Update: 28.06.2026
12:05:59 AM
 @palabadalnet

সায়ন্থ সাখাওয়াত

সায়ন্থ সাখাওয়াত

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক (আজীবন) নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। একই সঙ্গে তাকে ২০২৪ সালের ২০ জুন থেকে ইমেরিটাস অধ্যাপকের বিপরীতে নেওয়া বেতন ও ভাতা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বিএমইউ-এর ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এটা নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। হওয়ারই কথা। কারণ অধ্যাপক ডা এবিএম আবদুল্লাহ স্যার অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন চিকিৎসক। তার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আমারও পছন্দের শিক্ষক। আমার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পিরিয়ডে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক এবং পার্ট-এ পরীক্ষার সময় তিনি মেডিসিনের পরীক্ষক হিসেবে আমার পরীক্ষাও নিয়েছেন। 

কিন্তু আবদুল্লাহ স্যারের অধ্যাপক এমিরেটাস হিসেবে নিয়োগ বাতিল করে ওই সময়ে নেওয়া সম্মানিভাতা ফেরত দিতে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নেয়া নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই প্রকৃত ঘটনা না জেনে অথবা বিশেষ উদ্দেশ্যে তা পাশ কাটিয়ে আবেগকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। 

তাই এটা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার মনে হলো।

এক.

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলের ১৭ বছরে তৎকালীন বিএসএমএমইউ থেকে আমিসহ  শতশত চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিল, শারীরিক ভাবে লান্চিত করা,  প্রাপ্য প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করে একাডেমিক জীবন ধ্বংস করা হয়েছে। অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ স্যারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ এ বিষয়ে অথরিটির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করলেও তিনি কোন ভূমিকা রাখেননি।

কিন্তু সে জন্য কি তার এমিরেটাস পদ বাতিল করতে হবে? সেটা উচিত নয়। কারণ সবাই প্রতিবাদ করার সাহস রাখে না।

বিশিষ্ট লিভার বিশেষজ্ঞ মরহুম অধ্যাপক ডা. মবিন খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যাকে পেনশন পর্যন্ত দেয়া হয়নি শুধু বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসক হবার অপরাধে ! সে কথা হয়তো অনেকেই জানেন না।  কিন্তু তার সঙ্গে তুলনা দিয়ে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হওয়ার কারণে আবদুল্লাহ স্যারের এমিরেটাস পদ বাতিল করা হলে এই সরকারও তো আওয়ামী লীগের মতোই প্রতিহিংসা পরায়নই হলো! সুতরাং সেটাও উচিত নয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দরকার নাই- এই বক্তব্য মিডিয়ায় দিয়ে আবদুল্লাহ স্যার শেখ হাসিনার জিঘাংসা বাস্তবায়নে সম্মতি উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু সে জন্যও তার নিয়োগ বাতিল জাস্টিফায়েড হয় না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভয়াবহ দিনগুলোতে হাসপাতালে আগত আহত, গুলিবিদ্ধ নির্যাতিত মানুষকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বা পুলিশের কাছে তুলে দেয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ স্যার তার কোনো প্রতিবাদ করেছেন বলে শোনা যায় নি। এমন কী গণহত্যা চালিয়ে শেখ হাসিনা এই যে দেড় হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, এতো মানুষকে আহত করল, চোখ সহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারালো কত মানুষ- তার কোনো রকম নিন্দা কখনো আবদুল্লাহ স্যার করেছেন বলেও শোনা যায় নি। কিন্তু সে জন্য তার নিয়োগ বাতিল করতে হবে, এটাও ন্যায়সঙ্গত আচরণ হতে পারে না।

দুই.

আবদুল্লাহ স্যারের মতো একজন সমাদৃত চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিল করে তাকে অসম্মানিত করা হয়েছে বলে মত দিচ্ছেন অনেকে। তারা এটাকে প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন। তিনি জনপ্রিয় খ্যাতনামা চিকিৎসক এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে তিনি কি বিধিবিধানের উর্ধ্বে?

আমি সিন্ডিকেট সদস্য নই। তাই এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে থেকে জানা ছিল না। যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হল, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একাধিক দায়িত্বশীলদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তারা অনেকেই শিক্ষক হিসেবে আবদুল্লাহ স্যারকে আমার মতোই পছন্দ করেন। কিন্তু যখন বিধিবিধানের প্রশ্ন আসে তখন সিন্ডিকেটে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের কোন দাম নাই।

আবদুল্লাহ স্যারকে আজকের পরিস্থিতিতে ফেলেছে আওয়ামী লীগ আমলের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিধিবহির্ভুত সিদ্ধান্ত।

তাকে প্রথমে অধ্যাপক এমিরিটাস করা হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেটা ছিল তিন বছরের জন্য এবং মাসিক সম্মানিভাতা ছিল ৩০ হাজার টাকা।

পরে ২০২৪ সালের জুন মাসে আবদুল্লাহ স্যারকে আজীবনের জন্য প্রফেসর এমিরেটাস করা হয় এবং মাসিক সম্মানিভাতা নির্ধারণ করা হয় অধ্যাপক হিসেবে তার অবসরে যাওয়ার সময়ের বেতন-ভাতার সমান। অর্থাৎ একজন গ্রেড-১ প্রাপ্ত অধ্যাপকের বেতন ভাতার সমান। তা থেকে পেনশনের টাকা বাদ দিয়ে তিনি মাসে মোট ত্রিশ হাজার টাকা করে পাবেন আজীবন। এর পাশাপাশি তিনি স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধাও পাবেন। এটার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিভাগের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা নেওয়া ছিল মেনডেটরি।

এমন একজন সিনিয়র সম্মানিত অধ্যাপক, তিনি এ ধরণের সুবিধা পেতেই পারেন। কিন্তু কথা হলো, আবদুল্লাহ স্যারকে এটা বিধিসম্মত ভাবে দেয়া হঋেছিল কী না?

২০২৪ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটর ৯২তম সভাটি ছিল বাজেট সংক্রান্ত। সাধারণত বাজেট সংক্রান্ত সভায় এজেন্ডা বহির্ভূত কোন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। কিন্তু ওই সভার আলোচ্যসূচিতে না থাকা সত্ত্বেও একজন সদস্য অধ্যাপক এমিরেটাস নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধনী প্রস্তাব আনেন এবং তা গৃহীত হয়। 

বিধিবহির্ভূত দ্বিতীয় যে কাজটি করা হয় তা হলো, যে সিন্ডিকেটে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়, সেই একই সিন্ডিকেটে পুনরায় অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর নিয়োগ (আজীবন) দেওয়া হয়, যা বিধিবহির্ভূত। কোনো সিন্ডিকেটে অধ্যাদেশ সংশোধন করে সেই সিন্ডিকেটেই সংশোধিত বিধিতে আবার নিয়োগ অনুমোদন করা যায় না। এটা বিধিবহির্ভূত। 

এই সব বিধিবহির্ভূত পদক্ষেপের কারণে অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ স্যারের অধ্যাপক ইমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ (আজীবন) বাতিল করা হয়েছে।

তিন.

আবদুল্লাহ স্যার খ্যাতনামা সমাদৃত চিকিৎসক বলে তার এ নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তটি আলোচনায় এসেছে এবং অনেকেই এটাকে প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ ধরণের প্রতিহিংসামূলক আচরণ হয়ে থাকে।

আবদুল্লাহ স্যারের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু তিনি কি বিধি-বিধানের উর্ধ্বে? আবদুল্লাহ স্যারের নিয়োগ বাতিলের সমালোচনা করেন, অসুবিধা নেই। কিন্তু যারা তার নিয়োগ বিধিবহির্ভূত ভাবে দিয়ে আজকের পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করল, তাদের বিষয়ে কি বলবেন?

আরেকটা কথা। বিধিবহির্ভূত হওয়ার কারণে কোনো নিয়োগ বাতিল হলে এবং ওই সময়ে যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কোন রকম সার্ভিস দেননি, তাই বিধি মোতাবেকই তার গ্রহণ করা ভাতা ফেরত চাওয়া হয়েছে। আরেকটা কথা বলি। আবদুল্লাহ স্যার যে বলেছেন, তিনি দশ-বারো হাজার টাকা নিয়েছেন, সেটাও সত্য নয়। তিনি এ সময়ে মাসে ২৯ হাজার ৯৯০ টাকা করে মোট ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৮৫ টাকা ভাতা নিয়েছেন।

এই লেখায় আমি যে সব তথ্য দিয়েছি তার সব নথি আমার কাছে আছে। কারো সন্দেহ হলে আমি তার সন্দেহ দূর করবো নিঃসন্দেহে।

এখানে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আবদুল্লাহ স্যার প্রফেসর এমিরেটাস হিসেবে ২০২৪ সালের জুন থেকে মানে বিধিবহির্ভূত নিয়োগের সময় থেকে যে বেতন ভাতা নিয়েছেন শুধু সেটা ফেরত দিতে বলেছে সিন্ডিকেট। অথচ না বুঝে এটা নিয়ে অনেকেই বলছেন, তার পরিশ্রম মেধা ও সেবা দিয়ে যে বেতন নিয়েছেন, তা ফেরত চাওয়া অন্যায় অমানবিক হয়েছে। এই ভাতা তিনি কোন সার্ভিস দিয়ে নেননি। ২০২৪ সালের জুনের পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কোনো সার্ভিসই দেননি।

তার নিয়োগ যদি বিধিবহির্ভূত হয় এবং সে কারণে যদি নিয়োগ বাতিল করা হয় তাহলে সেই সময়ে নেওয়া ভাতা কি ফেরত দেওয়াই উচিত নয়?

সায়ন্থ সাখাওয়াত: চিকিৎসক, লেখক, টিভি টকশো’র জনপ্রিয় মুখ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]