
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ বৈরুতে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ও হাশেম সাফিউদ্দিনের জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত জানাজায় এক হিজবুল্লাহ সদস্য। ছবি: রয়টার্স
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, ওয়াশিংটন এমনকি লেবাননের সরকার এমনভাবে কথা বলে আসছিল যেন হিজবুল্লাহ স্থায়ীভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লেবাননের এই সশস্ত্র সংগঠনটি আবারও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে শত্রুকে আঘাত করছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পারফরম্যান্স এবং ইসরায়েলের ভেতরে গভীরে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখায় যে, ইসরায়েলের সঙ্গে ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিকে হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে দেখেনি। বরং তারা এটিকে পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের অনিবার্য সংঘর্ষের প্রস্তুতির জন্য একটি সীমিত কিন্তু জরুরি সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর, গাজা যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট এক বছরেরও বেশি সংঘর্ষের পর যখন হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন জনমনে প্রচলিত ধারণা ছিল একেবারে সরল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, এই অভিযানে হিজবুল্লাহকে ‘দশকের পর দশক পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে’, তাদের অধিকাংশ রকেট ধ্বংস করা হয়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূল করা হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা একে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ বলে আখ্যা দেন। সেন্টকম কমান্ডার মাইকেল কুরিলা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে হিজবুল্লাহকে ‘সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত’ বলে উল্লেখ করেন এবং লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মোতায়েনকে প্রশংসা করেন, যাকে তিনি সংগঠনটির সাবেক ‘ঘাঁটি’ বলে বর্ণনা করেন।
বৈরুতেও রাজনৈতিক ভাষা বদলে যায়। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অস্ত্র বহনের অধিকার থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেন, লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি প্রায় শেষ।
অনেক বিশ্লেষক বলছিলেন, ইসরায়েলি হামলায় সংগঠনটির ৮০ শতাংশ সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়েছে। প্রচলিত ধারণা ছিল-হিজবুল্লাহ ভেঙে পড়েছে এবং তাদের নিরস্ত্রীকরণ এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই ধারণা বড় ধরনের ক্ষতিকে কৌশলগত পতন হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সঙ্গে জড়িত চারটি সূত্রের মতে, যুদ্ধবিরতির পরদিনই-২৮ নভেম্বর থেকে পুনর্গঠন শুরু হয়। সংগঠনের ভেতরে ধারণা ছিল, যুদ্ধ শেষ হয়নি; বরং ইসরায়েলের সঙ্গে আরেক দফা সংঘর্ষ সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যুদ্ধবিরতি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না; এটি ছিল একটি কার্যকর বিরতি, যার প্রতিটি দিন ছিল মূল্যবান।
‘মিশন সম্পন্ন’
সূত্রগুলো জানায়, হিজবুল্লাহ মনে করে ইসরায়েল দুই কারণে আক্রমণ থামিয়েছিল। প্রথমত, তারা বিশ্বাস করেছিল যে সংগঠনটিকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপই রাজনৈতিকভাবে সেটিকে ধ্বংস করে দেবে। দ্বিতীয়ত, আরও যুদ্ধ চালালে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারত, এমন সময়ে যখন তারা মনে করছিল তাদের কৌশলগত লক্ষ্য ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে।
কিন্তু এই বিরতিই হিজবুল্লাহর জন্য সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও যুদ্ধ বড় ক্ষতি ডেকে আনে, তবুও এটি সংগঠনটিকে পুনর্গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দেয়। এবং এই প্রচেষ্টা শুধু সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সীমাবদ্ধ ছিল না; লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের সক্ষমতা, কাঠামো ও অবকাঠামো যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার করা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, সামরিক কমান্ডাররা নেতৃত্বকে জানান-যা পুনর্গঠন করা সম্ভব ছিল, সবই করা হয়েছে। এক সূত্রের ভাষায়, তারা বলেছিল: ‘মিশন সম্পন্ন।’ কিছু সক্ষমতা-বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা-পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। তবুও, সীমাবদ্ধতার মধ্যে পুনর্গঠন ছিল ব্যাপক, পদ্ধতিগত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
‘হেঁটে চলা শহীদ’
হিজবুল্লাহর সামনে কাজ ছিল বিশাল। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, ইসরায়েল শত শত পেজার বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে অনেক মানুষ আহত হয় এবং গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের গভীরতা প্রকাশ পায়।
পরে ওই মাসেই, বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বিমান হামলায় সংগঠনের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব এবং দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হন।
এই বহুমাত্রিক আঘাত সংগঠনের কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেয়।
একটি সূত্র জানায়, নেতৃত্ব তখন ‘অন্ধ, বিচ্ছিন্ন ও ভেঙে পড়া’ অবস্থায় ছিল।
তবে সীমান্তে জীবন বাজি রেখে লড়াই করা যোদ্ধারা বাকি নেতৃত্বকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেয়।
তিনি বলেন, “এই হেঁটে চলা শহীদরাই দলটিকে বাঁচিয়েছে।”
কাঠামোগত পুনর্বিবেচনা
সূত্রগুলো জানায়, হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ব্যবস্থা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভেদ করা হয়েছিল।
ইসরায়েল তাদের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারত।
তাই তারা পুরনো যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পরিত্যাগ করে মানুষের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান, হাতে লেখা নোট এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ পদ্ধতিতে ফিরে যায়। এটি পশ্চাদপসরণ নয়, বরং কৌশলগত অভিযোজন ছিল।
একই সঙ্গে সংগঠনটি তাদের কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করে। ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর এবং বিশেষ করে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের সময় হিজবুল্লাহ একটি প্রচলিত সেনাবাহিনীর মতো হয়ে উঠেছিল-বড়, ভারী এবং কেন্দ্রীভূত।
কিন্তু ২০২৪ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের সেই মডেল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করে। তারা আবার ‘মুঘনিয়েহর চেতনা’য় ফিরে যায়-ছোট, স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিটভিত্তিক কাঠামো। এই মডেলে কেন্দ্রীয় কমান্ডের ওপর নির্ভরতা কম, ফলে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ে।
দক্ষিণে প্রত্যাবর্তন
যুদ্ধবিরতি অনুযায়ী লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি থাকার কথা নয়।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল জটিল।
তারা ছোট ছোট ইউনিটের মাধ্যমে ধীরে ধীরে অবস্থান পুনর্গঠন করে।
সূত্রগুলোর মতে, তারা অঞ্চল ত্যাগ করেনি; বরং ধৈর্য, গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে পুনরায় অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
সরবরাহ সংকট
অনেকে ভেবেছিল সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হিজবুল্লাহ পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।
কিন্তু আসাদ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় তারা দ্রুত অস্ত্রভাণ্ডার সরিয়ে নেয়।
একই সঙ্গে ইরানের সহায়তা ও স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে তারা রকেট ও ড্রোন পুনরায় মজুত করে।
সব সক্ষমতা সমানভাবে ফিরে আসেনি, বিশেষ করে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে
গত দুই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, হিজবুল্লাহ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।
২ মার্চ তারা প্রায় ৬০টি ড্রোন ও রকেট ছোড়ে, পরদিনও একই ধরনের হামলা চালায়।
এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আশকেলনসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে।
যে সংগঠনকে ভেঙে পড়া বলা হচ্ছিল, সেটিই এখন আবারও ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে।
এ কারণেই বলা হয়, ‘হিজবুল্লাহ কোনো দল নয়, এটি একটি জাতি-আর জাতি কখনো মরে না। অনেকে ভেবেছিল এটা শুধু স্লোগান। কিন্তু হিজবুল্লাহ প্রমাণ করেছে, এটি সত্য।”
আদাম শামসেদ্দিন: বৈরুতের সাংবাদিক
সূত্র: মিডলইস্ট আই