
জাকির নায়েক। ফাইল ছবি
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের খোঁজে থাকা ইসলামি বক্তা জাকির নায়েক স্পষ্ট জানিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি ভারতে ফিরবেন না। তার আশঙ্কা, দেশে ফিরলে তাকে আর ভারত ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
১৩ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্কের এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে জাকির নায়েক এ কথা বলেন। মালয়েশিয়ার দৈনিক দ্য সান মালয়েশিয়া জানিয়েছে, নেটওয়ার্কটি ২১ অক্টোবর তাদের রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড প্ল্যাটফর্মে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটিকে তারা গোপনে পরিচালিত অনুসন্ধানী অভিযান বা ‘স্টিং অপারেশন’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “বিজেপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যদি আমি তার আগে ভারতে যাই, তাহলে আর বেরিয়ে আসতে পারব না।”
আলাপচারিতায় জাকির নায়েক তার বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন। তিনি মোদি সরকারের সমালোচনা করেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০২৯ সালে নির্ধারিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই বিজেপি ক্ষমতা হারাতে পারে।
জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তিনি মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। এসব অভিযোগ তিনি বারবার অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
তিনি বলেন, “এগুলো কেবল অভিযোগ। কোনো প্রমাণ নেই।”
জাকির নায়েক আরও বলেন, ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে ভারতীয় আদালতে তিনি প্রমাণ উপস্থাপন করতে রাজি আছেন। তবে তার অভিযোগ, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে সশরীরে আদালতে হাজির করতে চায়। এতে তার দেশ ছাড়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
তিনি বলেন, “আমি সশরীরে গেলে আর বেরিয়ে আসতে পারব না। আমাকে সেখানেই থাকতে হবে। তারা আমাকে ন্যায্য বিচার দেবে না।”
ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জাকির নায়েক বলেন, জনগণের অসন্তোষ পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই বিজেপির জন্য বিপদ তৈরি করতে পারে। তার ইঙ্গিত, নির্বাচনের সময় পর্যন্ত সরকার টিকে নাও থাকতে পারে।
রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, “আমি মনে করি না, পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত বিজেপি টিকে থাকবে। আর টিকে থাকলেও, ইনশা আল্লাহ, তারা জিততে পারবে না।”
বিরোধী দল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জাকির নায়েক বলেন, বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসকেই তিনি পছন্দ করবেন। যদিও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর পরিপক্বতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তবু তাকে মোদির চেয়ে ভালো বিকল্প বলে মনে করেন।
জাকির নায়েক বলেন, “তিনি মোদির চেয়ে ভালো। তিনি সৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত নন এবং মিথ্যা বলেন না।”
ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থার লক্ষণ হিসেবে তিনি বেকারত্ব এবং ভারতীয় রুপির দরপতনের কথাও উল্লেখ করেন।
আলোচনায় ভোটার তালিকায় কথিত কারসাজির অভিযোগে প্রতিবাদ এবং ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও উঠে আসে। রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড আলোচনাটিকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত করে। সরকারবিরোধী তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিবাদের সঙ্গে এই আন্দোলনের সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে এমন কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি, যা থেকে বলা যায় জাকির নায়েক ওই বিক্ষোভের আয়োজন বা সমন্বয় করেছিলেন।
আলাপচারিতার শেষ দিকে জাকির নায়েক জানান, একটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তার বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে।
রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড সাক্ষাৎকারটিকে গোপন অনুসন্ধানী অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করলেও প্রকাশিত ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে জাকির নায়েক জানতেন, তার সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিটি গোপনে তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত একজন সাংবাদিক।
জাকির নায়েককে নিয়ে ভারত-মালয়েশিয়া বিরোধ
মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েকের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই কুয়ালালামপুর ও নয়াদিল্লির মধ্যে বিরোধের একটি বিষয়।
ভারতে তার কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও তদন্ত বাড়তে থাকায় তিনি মালয়েশিয়ায় চলে যান। ২০১৬ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনকে বেআইনি সংগঠন ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংস্থাগুলো তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে পদক্ষেপ নেয়।
২০১৫ সালে মালয়েশিয়া তাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়।
২০১৮ সালে তৎকালীন মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ জাকির নায়েককে ভারতের হাতে প্রত্যর্পণ না করার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ভারত সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার মালয়েশিয়ার রয়েছে।
সে সময় মালয়েশিয়া সরকারের অবস্থান ছিল, জাকির নায়েক দেশটিতে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করলে সেখানে থাকতে পারবেন।
গত মাসে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম নিশ্চিত করেন, নয়াদিল্লি সফরের সময় তিনি ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে জাকির নায়েকের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার বলেন, দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এসব আলোচনা গোপন রাখা হবে।
তিনি বলেন, ভারত সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের শাসন এবং মালয়েশিয়া-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আনোয়ার জাকির নায়েককে ভারতের হাতে প্রত্যর্পণের কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি। ফলে বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
জাকির নায়েকের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বিজেপি ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত স্বেচ্ছায় ভারতে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
পালাবদল/এসএ