
পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ছবি: সংগৃহীত
প্রাচীনকাল থেকেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি অনুসরণ করে আসছে, এবং পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিও এর ব্যতিক্রম নন। দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও সেই পথ অনুসরণ করার পরিকল্পনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী আসিম মুনির দেশের চারটি প্রদেশকে এক ডজন বা তারও বেশি ভাগে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।
পাকিস্তানের চারটি প্রধান প্রশাসনিক প্রদেশ পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালুচিস্তান ১৯৪৭ সাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের জনসংখ্যা ১২.৮ কোটি। যা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম জনবহুল বালুচিস্তান প্রদেশে মাত্র ১.৫ কোটি মানুষের বাস। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। সংস্কারপন্থীদের দীর্ঘদিনের যুক্তি, জনসংখ্যার এই বিন্যাস শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে। এখন পাকিস্তানের কার্যত শাসক হিসেবে পরিচিত মুনির, চারটি প্রদেশের পরিবর্তে ১২, ১৫ বা এমনকি ১৬০টি ছোট প্রদেশ তৈরি করে দেশের মানচিত্র নতুন করে গঠন করতে চাইছেন।
দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, এই বিভক্ত নতুন ক্ষুদ্র প্রদেশগুলি সম্ভবত নির্বাচিত প্রধানদের দ্বারা, অথবা প্রাদেশিক বা জেলা পরিষদ দ্বারা, কিংবা ‘সরকারের’ মনোনীত ব্যক্তিদের দ্বারা শাসিত হবে। যাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে স্বয়ং ফিল্ড মার্শাল মুনিরের হাতেই। তাঁর দাবি, প্রদেশগুলি এত বড় যে সেগুলি ভালোভাবে চালানো সম্ভব নয়, আর এই কারণেই দেশের এমন শোচনীয় অবস্থা। পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে এবং বৃদ্ধির হার ভারতের অর্ধেকেরও কম।
দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী করদাতাদের টাকায় ফুর্তি করে, দেশের সবচেয়ে মূল্যবান ভূখণ্ডের বিশাল অংশের মালিক এবং প্রতিযোগীদের ভয় দেখিয়ে বহু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটি স্বাধীনতার পরে অনেকটা সময় ধরে সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। বাকি সময়ের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেসামরিক সরকারগুলি সেনাকে চটানোর সাহস পায়নি। এই পদক্ষেপ দেশের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর হলেও, প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য বিরাট আশাপ্রদ বিষয়।
দ্য ইকনমিস্টের প্রতিবেদনে মুনিরের পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক থাকার দু’টি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, পাকিস্তানে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের পরিসর সীমিত। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে দেশের বড় প্রদেশগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেনাপ্রধানের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা এই ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরে দু’টি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাঞ্জাবে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং সিন্ধে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)-র রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচি সিন্ধু প্রদেশের অন্তর্গত। সামরিক শাসনের সময়েও এই দুই প্রদেশে, কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিকল্প অন্য দল ক্ষমতায় টিকে থেকেছে। দ্য ইকনমিস্টের মতে, সেই কারণেই এই প্রাদেশিক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলির উপর মুনিরের নজর পড়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে মুনিরের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কৌশলের কথা বলা হয়েছে। নিজের হাতে ক্ষমতা নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। পিএমএল-এন ও পিপিপি-র একাংশকে নিজের রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে নিয়ে এসেছেন তিনি। এই দুই দলের কার্যত শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বর্তমানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পদে রয়েছেন।
পাকিস্তানের তৃতীয় প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেতা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বর্তমানে জেলে বন্দি। এক সময়ের তারকা ক্রিকেটার ইমরান খান দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তাঁকে সমর্থনে হওয়া প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলিতে তাঁর নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পাচ্ছেন সঞ্চালকরা।
এই প্রেক্ষাপটে পত্রিকাটির আশঙ্কা, প্রাদেশিক সরকারগুলিকে শক্তিশালী করে সাধারণ পাকিস্তানির স্বার্থরক্ষা করাই মুনিরের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, এমনটা ধরে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই। বরং, প্রাদেশিক রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে রাজনীতিকদের আরও বেশি করে সেনাপ্রধানের চাহিদা অনুযায়ী চলতে বাধ্য করাই এই উদ্যোগের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি।নি।
পালাবদল/এসএ