
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়া রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছে তার প্রশাসন।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোর রাজস্ব কমাতে রুশ জ্বালানি খাতে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর দুই দেশ এ বিষয়ে একমত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিকাজ, বাড়িঘর গরম রাখা এবং পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বর্তমানে রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দলটিকে লড়তে হবে।
চুক্তির খবর প্রকাশের পর ডিজেলের দাম কমেছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কম রাখার জন্য এ চুক্তি যথেষ্ট নাও হতে পারে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, পুতিনের সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত সফল’ আলোচনা হয়েছে। দুই নেতা অবিলম্বে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন, যা প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল জ্বালানির সমান। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে।
আলোচনার পর পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সহযোগিতার প্রশংসা করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গত মাসে ওয়াশিংটন সফরের সময় দিমিত্রিয়েভ রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল রপ্তানির অনুমতি দিতে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করেছিলেন।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল, সমালোচনায় ইউক্রেন
২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন ব্যবস্থায় রাশিয়া জ্বালানি বিক্রি করে বিপুল রাজস্ব আয় করতে পারে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পুতিনকে সহায়তা করতে পারে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী বছরের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি লাইসেন্স জারি করেছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, নভেম্বরে রাশিয়া আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এর পরপরই সরবরাহ করা হবে আরও ১০ লাখ টন। রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ আরও বাড়ানো হতে পারে বলে জানান তিনি। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদল যখন যুদ্ধ অবসানের পথ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন এ চুক্তির ঘোষণা আসে। চুক্তির সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একে শক্তিশালী মিত্রদের ‘দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “পুতিনকে উপহার দিলে শান্তি আসবে না, সভ্য বিশ্বেরও কোনো উপকার হবে না। রাশিয়া ডিজেলের বিনিময়ে আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা ফিরিয়ে দেবে।”
মার্কিন আইনপ্রণেতারাও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকন বলেছেন, রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিবর্তে সম্প্রতি কংগ্রেসে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করার সময় এসেছে।
বেকন এক্সে লিখেছেন, “পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রকে চাপে ফেলতে এখনই এসব নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের সময়। ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো স্বৈরশাসকের হাতে আরও অর্থ তুলে দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা উচিত নয়।”
ডিজেলের দাম কমা নিয়ে সংশয়
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে এ চুক্তির ফলে ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় কম থাকবে এমন সম্ভাবনা কম।
তেলবাজার গবেষক ও কমোডিটি কনটেক্স ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন এক্সে লিখেছেন, চুক্তিটি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। তার মতে, রাশিয়ার শোধনাগারগুলো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত না হলে দেশটি সাধারণত চুক্তিতে উল্লেখ করা পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি ডিজেল রপ্তানি করে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেল বলেন, “এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং অত্যন্ত সংকুচিত ডিজেল বাজারে সরবরাহের আরেকটি উৎস যোগ করবে।”
মুদ্রাস্ফীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলা ডিজেলের দাম গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন গাড়িচালকদের সংগঠন এএএর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছায়।
সরবরাহ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি আরও দুটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। মিত্র দেশগুলোকে জরুরি জ্বালানি মজুত বাজারে ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিযন্ত্রে ব্যবহৃত করমুক্ত লাল রঙের ডিজেলের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তারপরও দাম উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের ফিউচার মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ কমে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৬৪ ডলারে নেমে আসে।
ট্রাম্প বলেন, “আমেরিকানদের, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
ডিজেলের উৎপাদন বাড়াতে নতুন উদ্যোগ
এদিকে, ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দপ্তরকে নির্দেশনা দিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প। শুক্রবার এ বিষয়ে অবগত তিনটি শিল্প খাতের সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। প্রেসিডেন্টের স্মারকলিপি আকারে জারি হতে পারে নির্দেশনাটি। এতে জ্বালানি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করা স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বিধিনিষেধকে পাশ কাটানোর উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের বলা হবে।
পাশাপাশি তেল ও জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে শীতল যুদ্ধের সময় প্রণীত ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট (ডিপিএ) ব্যবহার করা হতে পারে।
এ আইনের আওতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সহায়তাপুষ্ট ঋণ বা ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়ার অনুমোদন দিতে পারেন। জরুরি পণ্য উৎপাদনে সরকারি চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন কোম্পানিগুলোকে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে ডিপিএ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা বিবেচনা করছে হোয়াইট হাউস।
গত মাসে জ্বালানি পরিশোধন শিল্পের নির্বাহীরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, নতুন শোধনাগার নির্মাণে অর্থ ব্যয়ের চেয়ে বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর দক্ষতা বাড়ানো বা সেগুলোর সম্প্রসারণে সরকারি অর্থ ব্যয় করা বেশি কার্যকর হবে। নতুন শোধনাগার নির্মাণে খরচ বেশি এবং কাজ শেষ করতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
পালাবদল/এসএ