
ছবি: ডয়চে ভেলে
গত ১৯ আগস্ট একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিকসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হলে শহরের হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আবার প্রশ্ন ওঠে৷ তারপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়৷
মধ্য কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের ওই বেসরকারি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে পর তদন্তে জানা যায়, অগ্নিনিরাপত্তা–সংক্রান্ত ছাড়পত্রসহ হোটেলটির একাধিক ক্ষেত্রে বৈধ অনুমোদন ছিল না৷ এ ঘটনার জেরে শহরজুড়ে অবৈধ হোটেল ও গেস্টহাউস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে কলকাতা পৌরসভা৷ অভিযানে ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শনের পরে ৯১৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দেশিকা জারি করে সেগুলো সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় পৌরসভা৷ বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, মারকুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও কলিন লেনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত বহু ছোট ও বাজেট হোটেলের ওপরে প্রশাসনিক নজরদারি তীব্র হয়৷ অভিযানে এমন বেশ কয়েকটি অতিথিশালার সন্ধান মেলে, যারা মিশ্র ব্যবহারযোগ্য ভবনে বেশ কয়েক বছর যাবৎ অনুমোদন ছাড়াই হোটেল ব্যবসা চালাচ্ছে৷ অগ্নিনিরাপত্তার বিধি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য লাইসেন্স না থাকার কারণে এদের বেশির ভাগেরই মূল ফটকে পৌরসভার তরফে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ এ বিষয়ে কলকাতার পৌর কমিশনার স্মিতা পান্ডে শুভজিৎ বাগচীকে জানান, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো রকম আপস করা হবে না৷
এ পরিস্থিতিতে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে নেত্রকোনার মহম্মদ রফিকুলের মাথায়৷ শুভজিৎ বাগচীকে তিনি জানান, এক মাস আগে বড় ভাই সফিকুলের ক্যানসার ধরা পড়ে৷ কেমোথেরাপির পরামর্শ দিয়েছিলেন স্থানীয় চিকিৎসকেরা৷ তাই কলকাতার হাসপাতালে বড় ভাইয়ের চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত হয়৷ বহু কষ্টে জোগাড় হয় মেডিকেল ভিসা, কোনোরকমে টাকার ব্যবস্থা করে রোগীকে নিয়ে আগস্টের শেষে কলকাতায় পৌঁছান রফিকুল, সঙ্গে স্ত্রী সালমা বেগম৷ তারা ওঠেন মধ্য কলকাতার একটি গেস্টহাউসে৷ বিশেষ অপেক্ষা করতে হয়নি, এক রাত হাসপাতালে থেকে কেমো নিয়ে ছাড়া পান সফিকুল৷ আরো কয়েকটি পরীক্ষার জন্য দিন তিনেক ওই গেস্টহাউসেই থাকার কথা ছিল৷ কিন্তু অগ্রিম টাকা নেওয়ার পরও প্রথম রাতেই তাদের গেস্টহাউস ছাড়তে বাধ্য করা হয়৷ আপত্তি জানিয়েও লাভ হয়নি, রাত ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ মালপত্রসহ সবাইকে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে বের করে দেন গেস্টহাউসের মালিক৷ বাধ্য হয়ে রাতে ফুটপাতে প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে রোগীকে ও নিজেদের শোয়ার ব্যবস্থা করতে হয়৷
রাত পেরোলেও আশপাশের অন্যান্য গেস্টহাউস বা হোটেল বুক করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও বিশেষ লাভ হয়নি৷ দেখা যায়, হাসপাতাল লাগোয়া এলাকার অধিকাংশ অতিথিনিবাসের দরজায় তালা ঝুলছে, আবার সাদা কাগজে ‘বন্ধ’ শব্দটি লিখে সেঁটে দেওয়াও হয়েছে৷ যেসব অতিথিশালা চালু রয়েছে, তার ভাড়া আচমকা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে৷ উপায় খুঁজে না পেয়ে শেষে শুধু রোগী নন, গোটা পরিবারেরই ঠাঁই হয় ফুটপাতে৷ মধ্য পঞ্চাশের রফিকুল কান্না জড়ানো কণ্ঠে জানতে চান, “কেন আমাদের সঙ্গে এমন করা হচ্ছে? আমাদের অপরাধ কী?”
উডল্যান্ডস হাসপাতালের সিইও রূপক বড়ুয়া বলেন, “আমরা তাদের কাছে নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাব৷ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যারা আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসছেন, তাদের কাছে আলিপুর অঞ্চলের বেশ কিছু গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা পাঠানো হবে৷ বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ মেনে রওনা হওয়ার আগেই যাতে তারা থাকার জায়গা বুক করতে পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা৷ ইতিমধ্যে অনেকেই বুক করে ফেলেছেন, অন্যরা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য চেয়েছেন৷”
শুধু মধ্য কলকাতা নয়, তিন সপ্তাহে শহরের পূর্ব প্রান্তে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস-সংলগ্ন ডি’সান, মণিপাল, পিয়ারলেস, নারায়ণা আর এন টেগোরসহ প্রতিটি করপোরেট হাসপাতাল-সংলগ্ন এলাকাতেই এমনই চিত্র দেখা গেছে৷ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক নির্দেশে বেশ কিছু গেস্টহাউস ও হোটেল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে৷ পৌরসভার অভিযানে মাত্র ৪১টি হোটেল প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে বলে জানা গেছে৷ পৌরসভার ছাড়পত্র পাওয়া এসব অতিথিনিবাস আবার সুযোগ বুঝে বিপাকে পড়া চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশি পর্যটকদের থেকে যে যেমন পারছে চড়া ভাড়া চাইছে৷ সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে আগত স্বল্পবিত্তের রোগী ও তাদের স্বজনেরা৷ ভিনদেশে এসে এমন বিপাকে পড়বেন, তা তারা ভাবতে পারেননি৷
গত দেড় দশকে কলকাতার পূর্ব প্রান্তে ই এম বাইপাসের আশপাশে বেশ কয়েকটি ঝাঁ-চকচকে অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরি হয়েছে৷ তালিকায় রয়েছে রুবি, ডি'সান, ফর্টিস, মণিপাল, নারায়ণা আর এন টেগোর, পিয়ারলেস৷ ২০২৪ সালের গোড়ায় এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসারত রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি৷ ওই বছরের জুলাই মাস–পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ভারতে এসে সে দেশের রোগীদের চিকিৎসা করানোর প্রবণতায় বাধা পড়ে৷ পালাবদলের পরে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে সামান্য চিড় ধরায় রোগীর সংখ্যা উল্লেখজনক হারে হ্রাস পায়৷ সব শেষে মধ্য কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের জেরে প্রশাসনের তরফে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীতে এসে চিকিৎসায় আগ্রহ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিকেরা৷ সস্তার অতিথিনিবাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাসস্থানের অভাবে কলকাতার থেকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ৷ তাঁদের মধ্যে অনেকেই দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে গিয়ে চিকিৎসায় আগ্রহ প্রকাশ করছেন বলে জানিয়েছেন৷
চিকিৎসা ব্যবসায় এ রকম ঘোরতর সংকট সামলাতে ইতিমধ্যে আসরে নেমেছে কলকাতার করপোরেট হাসপাতালগুলো৷ কলকাতায় চিকিৎসা করতে আসা বাংলাদেশি রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করতে বেশ কয়েকটি অনুমোদিত গেস্টহাউসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ৷ তা ছাড়া কলকাতায় চিকিৎসা করাতে ইচ্ছুক রোগীদের মনে ভরসা জোগাতে বাংলাদেশেও নিজস্ব টিম পাঠাচ্ছেন হাসপাতাল কর্মকর্তারা৷
সম্প্রতি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সর্বভারতীয় একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উডল্যান্ডস হাসপাতালের সিইও রূপক বড়ুয়া বলেন, “আমরা তাদের কাছে নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাব৷ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যারা আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসছেন, তাদের কাছে আলিপুর অঞ্চলের বেশ কিছু গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা পাঠানো হবে৷ বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ মেনে রওনা হওয়ার আগেই যাতে তারা থাকার জায়গা বুক করতে পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা৷ ইতিমধ্যে অনেকেই বুক করে ফেলেছেন, অন্যরা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য চেয়েছেন৷”
কলকাতার অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত আলিপুরের গেস্টহাউস ও হোটেলের ভাড়া বেশ চড়া৷ ফলে বাংলাদেশিদের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে কম বাজেটের ছোট হোটেল ও গেস্টহাউসগুলো৷ মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ই এম বাইপাস, গড়িয়া, সন্তোষপুর, মুকুন্দপুর, পাটুলি, কালিন্দীর মতো অঞ্চলে মূলত বাংলাদেশি রোগীদের থাকার জন্য তৈরি হয়েছে অসংখ্য সস্তার গেস্টহাউস ও ছোট হোটেল৷ কিন্তু পৌরসভার সাম্প্রতিক নজরদারির কারণে এবার দরজা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন এসব অতিথিশালার মালিকেরা৷ ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরোনো ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য ফায়ার ব্রিগেডের পক্ষ থেকে ভবনের মূল নকশা চাওয়া হচ্ছে, তা জোগাড় করাই হয়ে উঠেছে অনেক দুরূহ৷ ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার ইচ্ছা থাকলেও আইনি ও নথিপত্র-সংক্রান্ত জটিলতায় ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে৷ তবে ব্যবসায়ীরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আপাতত ব্যবসা বন্ধ রাখলেও দ্রুত কোনো সমাধান সূত্রের আশায় দিন গুনছেন, যাতে শহরের পর্যটন ও ব্যবসা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে৷
ই এম বাইপাস-সংলগ্ন মুকুন্দপুর অঞ্চলে রয়েছে বাংলাদেশি গ্রাহকদের জন্য অসংখ্য অতিথিশালা৷ নারায়ণা আর এন টেগোর হাসপাতালের নিকটবর্তী সরকারপাড়ার এমনই এক গেস্টহাউসের ব্যবস্থাপক রঞ্জন পাইক জানালেন, স্থানীয় স্টেডিয়ামনগর ও সরকারপাড়ার অন্তত ৩০টি গেস্টহাউস ও হোটেলে হানা দিয়েছেন পৌরসভার পরিদর্শকেরা৷ কর্মকর্তাদের সামনে বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, পুলিশি নিরাপত্তা সনদ এবং ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে পারেনি বেশ কিছু অতিথিশালার মালিক৷ পৌরসভার তরফে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বৈধ কাগজপত্র জোগাড় না করা পর্যন্ত অতিথিশালা বন্ধ রাখতে হবে৷ রঞ্জন পাইকের দাবি, সোজা পথে সমস্ত দরকারি কাগজপত্র জোগাড় করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় ব্যবসা বাঁচাতে বেশির ভাগ মালিক পৌর কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে অবৈধ আর্থিক রফায় বসতে বাধ্য হচ্ছেন৷ এ ক্ষেত্রে নাকি একলাখ রুপির ‘প্যাকেজ'ও চালু হয়েছে অঘোষিতভাবে৷
এদিকে অতিথিশালায় তালা ঝোলানোর কারণে ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড় ভাতের হোটেল, ওষুধের দোকান, ফরেন এক্সচেঞ্জ কাউন্টারগুলোরও৷ রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে এমনিতেই ২০২৪ সালের শেষ থেকে কলকাতার হাসপাতালগুলোয় বাংলাদেশি রোগী আসার স্রোতে ভাটার টান দেখা দেয়৷ তবে কয়েক মাসে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার ফলে হাসপাতালে পড়শি দেশের রোগীদের ভিড় আবার বাড়তে শুরু করে৷ হাসপাতাল ও আনুষঙ্গিক ব্যবসায় সুদিন প্রত্যাবর্তনের সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ৷
স্বভাবতই এতে মেজাজ বিগড়েছে খাবার হোটেল, বিদেশি শুল্ক ভাঙানোর কাউন্টার, ট্র্যাভেল এজেন্টের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের৷ কলিন স্ট্রিটের এক ট্যুর অপারেটরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন৷ রুক্ষ স্বরে বললেন, “ব্যবসায় মন্দা কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা দিতেই তাতে বাধা সৃষ্টি করলো রাজ্য সরকারের ফতোয়া৷ এবার কারবার গুটিয়ে ফেলা ছাড়া আর উপায় নেই৷'”
পালাবদল/এসএ