
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
হোয়াইট হাউস ‘ট্রাম্প টিভি’ নামে একটি স্ট্রিমিং চ্যানেল চালু করেছে। সোমবার সন্ধ্যায় এর সম্প্রচার শুরু হয়। আজ মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প টিভিতে ‘সেরা ভিডিও, গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এবং অবশ্যই দেখার মতো বিভিন্ন মুহূর্ত’ ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ করা হবে।
চ্যানেলটি চালুর পর এতে ৩ জুলাই মাউন্ট রাশমোরে ট্রাম্পের দেওয়া একটি বক্তব্যের আরকাইভ ভিডিও দেখানো হচ্ছিল।
এই ঘটনার নেপথ্যে আছে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর এক নজিরবিহীন ও সমন্বিত উদ্যোগ। হোয়াইট হাউস থেকে তিনটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোমবার আমেরিকার টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যক্রমের সম্প্রচার কার্যত বর্জন করে। দেশটির ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এ ধরনের উদ্যোগের নজির নেই।
বেশ কয়েক বছর ধরে ৮০ বছর বয়সী রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার দাবি, ‘প্রথাগত গণমাধ্যম’ সত্য প্রকাশ করে না।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর তার এসব উদ্যোগ নতুন মাত্রা পায়। এর অংশ হিসেবে গত শুক্রবার তিনি সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এরপর প্রতিষ্ঠান তিনটি আদালতের দ্বারস্থ হয়।
এই বিরোধের জেরে ট্রাম্পের বহুল আকাঙ্ক্ষিত নতুন হোয়াইট হাউস হেলিপ্যাড উদ্বোধন এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দেওয়ার ঘটনাগুলো টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়নি। বিরল এক পদক্ষেপে আমেরিকার শীর্ষ পাঁচটি সম্প্রচারমাধ্যম সোমবার জানায়, তারা সিএনএনের প্রতি সংহতি জানিয়ে হোয়াইট হাউসের ‘পুল’ কভারেজ বন্ধ রাখছে।
সাধারণত এক বা একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সারাদিনের জন্য হোয়াইট হাউসে ভিডিও ধারণের কাজ করে। তাদের সেই ভিডিও অন্যান্য টিভি চ্যানেলও ব্যবহার করতে পারে। এ বিষয়টিকেই ‘পুল কভারেজ’ বলা হয়। সোমবার হোয়াইট হাউসের টিভি পুল হিসেবে কাজ করার কথা ছিল সিএনএনের।
এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স ও এনবিসি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, “সরকার সম্পর্কে নিখুঁত ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে দেশের জনগণের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হলে সেটার ওপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধিনিষেধ আরোপ কোনো দিক দিয়েই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যমগুলোর এই উদ্যোগে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের এক ধরনের নজিরবিহীন শক্তির লড়াই শুরু হয়েছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহে এই বিরোধ তৈরি হয়েছে, যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হোয়াইট হাউসে সফর করছেন।
‘ক্যানসারের মতো’ সংবাদমাধ্যম
এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে (ইউএনজিএ) বিদেশি নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকগুলো সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার নাও হতে পারে।
এদিকে সাউথ লনে নির্মিত বিশাল গ্রানাইটের হেলিপ্যাডটির ফিতা কাটার অনুষ্ঠান শুধু হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের শব্দ পুরোপুরি শোনা যায়নি।
এএফপিসহ হোয়াইট হাউসে কাজ করা কয়েকটি ফটো সংবাদমাধ্যম নিষিদ্ধ তিনটি সংবাদমাধ্যমের প্রতি সংহতি জানিয়ে হেলিপ্যাডে ট্রাম্পের ছবি প্রকাশ বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে ‘ক্যানসার’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বলে আখ্যায়িত করেন।
ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, “হোয়াইট হাউস স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর কোনো আক্রমণ চালাচ্ছে না। এ বিষয়টিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিই।”
“বরং এটি ভুয়া সংবাদ (প্রচারকারীদের) ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, যা আমাদের প্রিয় আমেরিকায় ক্যানসারের মতো বেড়ে উঠেছে”, যোগ করেন তিনি।
রাজনীতিতে আসার আগে সিএনএনের ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ‘বামপন্থি প্রচারণা’ ছড়ানোর অভিযোগ করেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারা এখনও সংবাদ প্রকাশ করতে পারে। তাদের এখনও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। শুধু তারা আর হোয়াইট হাউসে কোনো অফিস পাবে না।”
সাংবাদিকদের প্রেস পাস জব্দ
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা শুধু হোয়াইট হাউসে ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর কার্যালয়ের জায়গা বাতিলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শনিবার সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং তাদের প্রেস পাস জব্দ করা হয়।
তিন প্রতিষ্ঠান তাদের মামলায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সাময়িক স্থগিতাদেশ জারির আবেদন করেছে। তাদের যুক্তি, এই নিষেধাজ্ঞা আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী লঙ্ঘন করে, যেখানে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, “এই নিষেধাজ্ঞার চেয়ে প্রথম সংশোধনীর ওপর আরও সরাসরি আক্রমণ কিংবা আমাদের সবচেয়ে মৌলিক সাংবিধানিক নীতির আরও স্পষ্ট লঙ্ঘন হতে পারে না।”
আমেরিকার একজন ডিস্ট্রিক্ট জজ বুধবার অভিযোগটির শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।
শুক্রবার ট্রাম্পের আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় সংবাদমাধ্যমগুলো বিস্মিত হয়ে যায়। জানা গেছে, তার প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাও এতে বিস্মিত হয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পেছনে কী কারণ ছিল, তা প্রেসিডেন্ট বিস্তারিত জানাননি। তবে শুক্রবার ওভাল অফিসে এএফপির এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মূলত গত দুই বছরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনই এর কারণ।”
শুক্রবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোও একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হতে পারে, তা তিনি জানাননি।
কোটিপতি সাবেক রিয়েলিটি টিভি তারকা ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে তার নির্বাচনী প্রচার ও প্রশাসনের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে আসছেন।
তিনি বারবার সংবাদমাধ্যমকে ‘জনগণের শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে এমন এক সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো, যখন ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থনের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধেরও কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।গ্রিনল্যান্ড
পালাবদল/এসএ