শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
দক্ষিণ এশিয়া
দিল্লিতে পুতিনের ‘চলন্ত দুর্গ’, ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়’ শি





পালাবদল ডেস্ক
Saturday, 12 September, 2026
8:46 PM
 @palabadalnet

অরাস সেনাটে চড়ার আগে ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতে নামার পর শি জিনপিং। ছবি: এএফপি ও এক্স থেকে নেওয়া

অরাস সেনাটে চড়ার আগে ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতে নামার পর শি জিনপিং। ছবি: এএফপি ও এক্স থেকে নেওয়া

বিশ্বের সবচেয়ে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত তিন নেতা এখন ভারতের নয়াদিল্লিতে একই নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে রয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এসেছেন তার সুরক্ষিত অরাস সেনাট গাড়ি নিয়ে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রয়েছে বিশেষায়িত চীনা নিরাপত্তা দল ও নিজস্ব বহর। 

দ্য স্টেটসম্যান জানিয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এই তিন নেতার নয়াদিল্লিতে অবস্থান রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন ও জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিদেশি নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দলকে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে, যাতে নিরাপত্তার কোনো স্তরে ফাঁক না থাকে।

এই সম্মেলন ঘিরে রাজধানীতে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ভারত মণ্ডপম, ভিভিআইপি হোটেল এবং নেতাদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে নেওয়া হয়েছে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায়। সম্মেলনের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) ১০০ জনেরও বেশি কমান্ডো দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে পুতিন, শি ও মোদির নিরাপত্তা আসলে শুরু হয়েছে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় থেকে।

পুতিনের “চলন্ত দুর্গ’ অরাস সেনাট

ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান জিনিসটি হলো তার বিশাল কালো লিমুজিন, রুশ প্রেসিডেন্টকে বহনকারী গাড়ি অরাস সেনাট। রাশিয়ার অরাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ও বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে প্রেসিডেন্টের যাতায়াতে এই গাড়ি ব্যবহার করা হয়।

গাড়িটির কাঠামো শক্তিশালী করে তৈরি করা হয়েছে। এর সাঁজোয়া ও সাধারণ, দুই সংস্করণই একইসঙ্গে উন্নয়ন করা হয়েছিল বলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। এ কারণে প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত সংস্করণটিকে প্রায়ই ‘চাকার ওপর দুর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারত মণ্ডপমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে এই অরাস সেনাটে চড়ে ঘুরেছেন পুতিন।

তবে গাড়িটি শুধু আনুষ্ঠানিক পরিবহনের জন্য নয়। পুতিনের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তার দায়িত্ব রাশিয়ার ফেডারেল গার্ড সার্ভিস (এফএসও), যা দেশটির প্রেসিডেন্ট ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং সরকারি যোগাযোগব্যবস্থা সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে।

পুতিনের সফরের আগেই রুশ নিরাপত্তাকর্মীরা নয়াদিল্লিতে পৌঁছান এবং তার থাকার হোটেলে নিজস্ব সরঞ্জাম নিয়ে অবস্থান নেন। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চারপাশে ভারতীয় নিরাপত্তাবলয়ও তৈরি করা হয়েছে এবং হোটেলে অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে পুতিনকে ঘিরে কার্যত একাধিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি হয়েছে, ভেতরে রুশ নিরাপত্তাব্যবস্থা, আর তার চারপাশে ভারতের বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত শির নিরাপত্তাবলয়

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও নিজের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নয়াদিল্লিতে এসেছেন। শির সফরের আগেই চীনা নিরাপত্তাকর্মীরা দিল্লিতে পৌঁছে তার জন্য নির্ধারিত হোটেলে অবস্থান নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট যে তলায় থাকবেন, সেখান থেকে নিচতলা ও ছাদ পর্যন্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকে শির নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। তার সফর ঘিরে আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন ধরনের হুমকি শনাক্তে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় ও পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা মোকাবিলায়ও পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

শির মোটরকেডেও রয়েছে আরেক স্তরের নিরাপত্তা। সফরে তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় গাড়ি নির্মাতা হংছির সাঁজোয়া লিমুজিন ব্যবহার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হংছির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে ও বিদেশে চীনা নেতৃত্বের সরকারি যাতায়াতে এই গাড়ি ব্যবহৃত হয়।

এর আগে, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদল নিজেদের কিছু গাড়ি ও বহর ব্যবহার করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। ফলে সম্মেলনের নিরাপত্তা শুধু একটি অনুষ্ঠানস্থল পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিদেশি প্রতিটি নেতার নিজস্ব গাড়ি, নিরাপত্তাকর্মী, প্রটোকল ও পরিচালনাগত প্রয়োজনও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

১১ হোটেল, ৩৫ রুটজুড়ে নিরাপত্তা

নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুধু ভারত মণ্ডপমকে ঘিরে নয়। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ১১টি হোটেল এবং ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ককে নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

নেতাদের যাতায়াতের পথে আগেই মহড়া চালানো হয়েছে। ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। হোটেলের কর্মীদের নিজ নিজ রাজ্যে যাচাইসহ তাদের পরিচয় ও অতীতের তথ্যও পরীক্ষা করা হয়েছে।

বিদেশি নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের থাকার হোটেলগুলোতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। সেখান থেকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নিরাপত্তাবেষ্টিত বহর নিয়ে তাদের ভারত মণ্ডপমে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

নাশকতা ঠেকাতে ভারত মণ্ডপম ও বিভিন্ন হোটেলে দিল্লি পুলিশের ১০০টিরও বেশি প্রশিক্ষিত কুকুর মোতায়েন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি তৈরি হয়েছে একাধিক বৃত্ত বা স্তরকে কেন্দ্র করে। সবচেয়ে ভেতরের স্তরে রয়েছে নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দল। এরপর ভারতীয় বিশেষায়িত বাহিনী ও পুলিশ তাৎক্ষণিক এলাকা সুরক্ষিত রাখছে। এর বাইরে হোটেল, যাতায়াতের পথ, সম্মেলনস্থল ও আশপাশের এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে বিস্তৃত নিরাপত্তাবলয়।

তিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়

ব্রিকস সম্মেলনের নিরাপত্তাকে অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে এই সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা।

পুতিন এসেছেন রাশিয়ার এফএসও এবং প্রেসিডেন্টের অরাস গাড়িকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। শি এসেছেন নিজস্ব চীনা নিরাপত্তা দল ও রাষ্ট্রীয় গাড়িবহর নিয়ে। অন্যদিকে মোদির চলাচল হচ্ছে ভারতের আইনে নির্ধারিত এসপিজির নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে।

তবে নয়াদিল্লিতে অবস্থানের সময় তিনটি পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই একই ভারতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে।

সাঁজোয়া গাড়ি কিংবা নেতাদের কাছাকাছি থাকা নিরাপত্তাকর্মীরাই হয়তো সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ছেন। কিন্তু এই বিশাল নিরাপত্তা অভিযানের মূল শক্তি ছড়িয়ে রয়েছে আরও বিস্তৃত পরিসরে, যেমন হোটেল, নিয়ন্ত্রিত সড়ক, নাশকতাবিরোধী তল্লাশি, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং রাজধানীজুড়ে মোতায়েন হাজারো নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যে।

ব্রিকস সম্মেলনের জন্য নয়াদিল্লি শুধু বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকেই আতিথ্য দিচ্ছে না, একইসঙ্গে তাদের নিরাপদ রাখতে গড়ে ওঠা পৃথক ও অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোকেও সামলাচ্ছে।

পালাবদল/এমএম


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]