
হাসপাতালের বেডে শুয়ে জোয়াল ঘালে, সামনে বসে তার মা মাত্তি তামাং। ছবি: রয়টার্স
‘জানো তো মা, এত বড় গাছ। আমরা উঠে পড়লাম।’ কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালে ছেলের বেডের সামনে বসে আছেন মা মাত্তি তামাং। চোখে পানি। চিবুকে হাত দিয়ে ছেলের কথা মন দিয়ে শুনছেন তিনি। আর বেডে শুয়ে ৮ বছরের জোয়াল ঘালে বলে চলেছে, ‘বানের পানি হু হু করে ঢুকছে। আমরা গাছে উঠে পড়লাম।’ কেঁদে ফেললেন মাত্তি। নেপালে বন্যায় দু’দিন পরে ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন। ছেলেকে পেয়ে তার কান্না থামছে না।
চারপাশে শুধু পানি, কাদা আর পাথর। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে জঙ্গলের দিকে ছুটেছিল ৮ বছরের জোয়াল ঘালে। প্রাণ বাঁচাতে বন্ধুর সঙ্গে গাছে উঠে পড়েছিল সে। সেখানেই কোনও মতে কাটে ভয়াবহ রাত। পা ভেঙে গিয়েছে। চোখেমুখে কাটা। ওই অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নেপাল পুলিশ। হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়া হয় কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালে।
মা মাত্তি মায়া তামাং এসবের কিছুই জানেন না। গত বুধবার দুই যমজ ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিনি। তার পরে বানের পানিতে ভেসে যায় সব। দুই ছেলের খোঁজে ত্রাণশিবির আর আর উদ্ধার কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন মাত্তি। কোথাও তাদের নাম নেই। এক সময়ে ধরে নিয়েছিলেন, দুই সন্তানই হয়তো আর বেঁচে নেই।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জোয়ালের মা বলেন, “আমি চার চারটি জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও সন্তানদের নাম ছিল না। তখন ধরে নিয়েছিলাম যে আমার দুই ছেলেই আর বেঁচে নেই। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। আমি নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।”
আচমকাই বদলে যায় সব। রয়টার্সের এক সাংবাদিক মারফত পান জোয়ালের খবর। আরও স্বস্তির খবর, তার ছোট ছেলেকেও জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তার পরে সোজা কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালে ছুটে যান মাত্তি। সেখানেই ফের দেখা হয় মা ও ছেলের। জোয়ালের হাতে তখনও শক্ত করে ধরা ছিল দু’টো ১০ টাকার নোট। উদ্ধারকারীরা তাকে গাছ থেকে নামাতে পারছিলেন না কিছুতেই। তখনই ২০ টাকা দিয়েছিলেন। সেই নোট নিয়েই হাসিমুখে মাকে জড়িয়ে ধরে জোয়েল। মাত্তি তখন শুধু কাঁদছেন।
যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন তিনি। একহাতে ছেলেকে জড়িয়ে আছেন। আর অন্য হাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, “খুব দুষ্টু। কত বার যে হাত-পা ভেঙেছে।” জোয়াল অকুতোভয়। মুখে অমলিন হাসি। বানের অমন স্রোত দেখে ভয় লাগেনি? দু’দিকে ঘাড় নাড়িয়ে জোয়াল বলে দিল, ‘একটুও না।’ জাপানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে তার বাবা। বন্যার খবর পেয়ে দেশে ফিরছেন তিনিও।
পালাবদল/এসএ