
প্রতীকী ছবি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করায় আরও দুই যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ এর আগেও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়৷
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য বা কটূক্তি করার অভিযোগে কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি৷ তবে একজন মানবাধিকার কর্মী ২১ জন গ্রেফতারের তথ্য দিলেও তিনি তথ্যের সূত্র বলতে পারেননি৷ তবে ডয়চে ভেলে অন্তত পাঁচজনকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করেছে৷
দুইজন গ্রেফতার
ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সিলেটে মেহেদী আহমেদ (২১) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ শুক্রবার রাতে নগরের শহরের নোয়াগাঁও সাদিপুর এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়৷
সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাইনুল জাকির চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে মেহেদী আহমেদের বিরুদ্ধে৷ পাশাপাশি ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে একটা মামলা রয়েছে৷ আমরা সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছি৷”
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জনাব চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে৷ তাকে গ্রেফতারের সেটাও একটা কারণ৷ তবে এখন ওই বিষয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়নি৷ বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি৷ আপাতত তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷”
একই রাতে মেহেরপুর শহরের গড়পুকুর এলাকা থেকে সঞ্জয় কুমার দাস (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়৷ তিনি মেহেরপুর সদর উপজেলার গোভিপুর গ্রামের হিরন কুমার দাসের ছেলে৷ তাকেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ সম্প্রতি পুলিশ বাদি হয়ে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করেছে৷ তবে তাকেও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়নি৷
মেহেরপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবীর সোমবার ডয়চে ভেলেকে বলেন, “শুক্রবার রাতে সঞ্জয় কুমার দাস তার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি ভিডিও পোস্ট করেন৷ ওই ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করতে দেখা যায়৷ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আমাদেরও নজরে আসে৷ পরে আমরা তাকে গ্রেফতার করি৷ কিন্তু এখনও তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কোনো মামলা দেওয়া হয়নি৷ যেহেতু বিষয়টি সাইবার সংশ্লিষ্ট, ফলে আমরা বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করছি৷ এ বিষয়েও মামলা হতে পারে৷”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকের একটি পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে গত জানুয়ারিতে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়৷ অজ্ঞাতনামা এক নারীর পাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি বসিয়ে সেটি ‘তারেক রহমান ব্লগ’ নামে একটি আইডি থেকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল৷ আজিজুল হকের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি শেয়ার করা হয়৷ এরপরই মুক্তাগাছায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়৷ এক পর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে উপজেলার ঝনকা বাজার থেকে আজিজুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ গ্রেফতারের পরদিন মুক্তাগাছা থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেন কাশিমপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলু৷ এই মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে আজিজুল হককে৷
গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের অভিযোগে গাজীপুর থেকে সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক কলেজছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে৷ স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিফাত আব্দুল্লাহ বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য ও লেখালেখি করে আসছিলেন৷ এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীকে অশালীন ভাষায় কটূক্তি করেন৷ বিষয়টি স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের নজরে এলে তারা পুলিশকে অবহিত করেন৷ পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে৷ পরে তিনি জামিন পেয়েছেন৷
‘আওয়ামী লীগও পারে নাই’
মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস ডয়চে ভেলেকে বলেন, যেভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে তাতে বিষয়টা সরকারের জন্য হিতে বিপরীত (ব্যাকফায়ার) হতে পারে৷ তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা সরকারের জন্য ব্যাকফায়ার করবে৷ তার দুটো কারণ আছে৷ একটা হলো, খেয়াল করেন তাদের উদ্দেশ্য যদি হয় যে এ ধরনের কটূক্তি থামানো, তাহলে আমরা দেখি মেহেরপুরের ঘটনায় ওই ছেলেটাকে আমরা চিনতাম না৷ বরং অ্যারেস্ট করে ওনাদেরকে সরকার লাইমলাইটে আনছে অর্থাৎ যেই কটূক্তিগুলো সরকার চাচ্ছে যে সামনে না আসুক অ্যারেস্টের মাধ্যমেই আসলে সেগুলো সামনে আসছে৷ এটা প্রধানতম কারণ ব্যাকফায়ার করার৷ দ্বিতীয় কারণে ব্যাকফায়ার করবে কারণ আওয়ামী লীগও পারে নাই৷ তারা এত বিপুল অ্যারেস্ট করেও কটূক্তি থামাতে পারেনি, সিম্পলি এটা পারা যায় না৷ তো বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে সেক্ষেত্রে পসিবল হবে না৷”
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান তাকে নিয়ে আঁকা কার্টুন শেয়ার করে ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন৷ বিষয়টিকে তিনিসহ সবাই খুব ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন বলে জানান তিনি৷ তবে সরকার সাইবার সিকিউরিটি আইনের যে খসড়া প্রকাশ করেছে সেখানে বাকস্বাধীনতা হরণের ধারাগুলো শক্ত করা হয়েছে বলে মনে করছেন নাবিলা ইদ্রিস৷
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “সরকার আমার মনে হয় একটু বেশিই রিয়্যাক্ট করে ফেলছে৷ সেই আগের পথেই হাঁটছে৷ এখন আপনি যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক সরকার মনে করেন, তাহলে সমালোচনা আপনাকে সহ্য করতে হবে৷ সরকারের কাছে আরও সহনশীলতা মানুষ প্রত্যাশা করে৷”
পালাবদল/এসএ