শুক্রবার ● ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ● ৭ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার ● ২৩ অক্টোবর ২০২৬
 
মতামত
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্ববিরোধিতা





খাজা মাঈন উদ্দিন
Friday, 23 October, 2026
12:58 PM
 @palabadalnet

খাজা মাঈন উদ্দিন। ফাইল ছবি

খাজা মাঈন উদ্দিন। ফাইল ছবি

গত আড়াই দশকে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি সাংবাদিক প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি ছেড়েছেন, অথবা তাদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ছাপা সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেই ঝড় এখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপরও আঘাত হানছে।

বাংলাদেশে মূলধারার গণমাধ্যমের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পাঠক, দর্শক ও শ্রোতা হারাচ্ছে। কমছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা। অস্তিত্বের সংকটেও পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই সংকটের সঙ্গে নতুন একটি চ্যালেঞ্জ যুক্ত করেছে। যেসব কাজ করতে সাংবাদিকদের সময় লাগে, যন্ত্র এখন তার কিছু কিছু আরও দ্রুত করতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা এবং বিশেষ করে পেশাদার মানব সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয়তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিই কি প্রচলিত গণমাধ্যমের এই অবস্থার একমাত্র কারণ? নাকি সাংবাদিকতার মূল কাজের মধ্যেই কোনো ঘাটতি ছিল? সেই ঘাটতির নাম কি পেশাদারিত্বের অভাব?

সত্যের অনুসন্ধান করা, সত্য উদ্‌ঘাটন করা, তা বলা ও উপস্থাপন করা, মানুষকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করা, সমাজে সত্যের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের ভেতরে সত্যের পক্ষে লড়াই করা-এসবই একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব। এগুলো সাংবাদিকতার মৌলিক উপাদান।

গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে বলা যায় না যে ‘যেমন ঘটনা, তেমন সংবাদ’ নীতি সর্বত্র অনুসরণ করা হয়েছে। অন্তত বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাংবাদিকতা পেশাটি কী, তা নিয়ে গণমাধ্যমের ভেতরে ও বাইরে-দুই ক্ষেত্রেই বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে।

অন্য অনেক প্রতিষ্ঠিত পেশার মতো সাংবাদিকতাতেও বহু মানুষ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু এই পেশার স্বাতন্ত্র্য কী, তা তারা বোঝেননি। কেউ কেউ সচেতনভাবেই সাংবাদিকতার মহৎ আদর্শকে গ্রহণ করেছেন। অন্যরা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেছেন খ্যাতি, মর্যাদা, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাব অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে।

অনেকের কাছে সাংবাদিকতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এবং বিবেকবান, চিন্তাশীল বার্তাবাহক হিসেবে সাংবাদিকের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়েছে। ফলে পেশা ও সাংবাদিক-উভয়েই তাদের কর্মপদ্ধতি এবং যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির মধ্যে আটকে পড়েছেন।

সত্যকে বোঝা ও চর্চা করার ক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ব্যক্তিগত বিকাশ এবং জনসেবার মানসিকতাকে দুর্বল করে দেয়। যাঁদের পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, তাদের অনেকেই পরিবর্তনকে ভয় পান এবং পথ হারিয়ে ফেলেন। তাদের দর্শন হয়ে দাঁড়ায়: ‘আপনি যে সত্য তৈরি করেন, সেটাই সত্য; বাস্তবে যা ঘটেছে, তা সত্য না-ও হতে পারে।’

গণমাধ্যমের অবক্ষয়

মানুষ এখন আর আগের মতো ছাপা সংবাদপত্র পড়ে না কিংবা বসার ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে না। কিন্তু তারা এখনো খবর অনুসরণ করে। তথ্য পরিবেশনের এই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকেরা চাকরি হারাচ্ছেন এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্বসংকটে ডুবছে।

সমস্যাটি বাণিজ্যিক। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসায়িক মডেল কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

কিন্তু প্রকৃত সমস্যা অন্য জায়গায়।

পাঠক ও দর্শকের চোখে গণমাধ্যম তার মর্যাদা ও উপযোগিতা হারিয়েছে। অনেকের কাছে সংবাদপত্র পড়া কিংবা টেলিভিশন দেখা আর অপরিহার্য নয়। সংবাদপত্রে কী ছাপা হলো বা টেলিভিশন চ্যানেলে কী প্রচারিত হলো, তা না জেনেও মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই খবর পেয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত গণমাধ্যমের চেয়েও বেশি খবর তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

প্রযুক্তির এই রূপান্তরের সময়েই বাংলাদেশে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

শেখ হাসিনা ছিলেন একজন অগণতান্ত্রিক শাসক। তিনি শুধু তার প্রশংসা করার ‘স্বাধীনতা’ দিয়েছিলেন। অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী আগুনে ঝাঁপ দেওয়া পতঙ্গের মতো সেই সুযোগের দিকে ছুটে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পারেনি, মানুষ যে গণমাধ্যমের বিষয়বস্তুকে নেতিবাচকভাবে দেখে, সেই বিষয়বস্তু তারা কেন গ্রহণ করবে। আর কোনো গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা না থাকলে বিজ্ঞাপনদাতারাই বা সেখানে বিজ্ঞাপন দেবেন কেন?

এই অবক্ষয় একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত না হলে সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা ও টেলিভিশনের দর্শক কমে যায়। বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব হ্রাস পায়। রাজস্বও কমে যায়।

কেউ কেউ হয়তো ভুলে গেছেন, গণমাধ্যমের কাজ হলো প্রতিনিয়ত সত্যের অনুসন্ধান করা। তবে গণমাধ্যম সত্যের একমাত্র পরিবেশক নয়। সাংবাদিকেরা যখন নিজেদের সত্য নির্মাণের মালিক মনে করতে শুরু করেন, তখনই অর্ধসত্যের চর্চা শুরু হয়। মানুষ যখন সত্য থেকে বিচ্যুতি দেখতে পায়, তখন গণমাধ্যমের আর কোনো ‘ব্যবসা’ অবশিষ্ট থাকে না।

পেশা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা

শেখ হাসিনার শাসনামলের দুই দফায়-১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত-অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিভিন্ন মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পেশাজীবী সংগঠন ও সাংবাদিক নেতারা এই হস্তক্ষেপ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু তাতেও তাদের রক্ষা হয়নি। পেশাদারিত্বের কারণে অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। আবার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর অনেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশে তুলনামূলক স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা বিপুলসংখ্যক তরুণের এই পেশায় আসার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ ছিল।

প্রথমত, ১৯৯০ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা। দ্বিতীয়ত, ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী বেতন ও সুযোগ-সুবিধা চালু হওয়া। এর ফলে মেধাবীদের সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট করা এবং তাদের এই পেশায় ধরে রাখা সহজ হয়েছিল।

চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে ধনী দেশগুলোর কিছু সাংবাদিক বেশি বেতনের আশায় অন্য পেশায় চলে যেতে শুরু করেন। অন্যদিকে শিক্ষিত বাংলাদেশিরা তখনো সাংবাদিকতায় নিজেদের নিয়োজিত রাখছিলেন।

সর্বশেষ ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ বাস্তবায়িত হয় ২০১৩ সালে। এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালে, বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেটিকে ভোট ছাড়া নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সেই সময়েও সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ওয়েজ বোর্ডের বিধান মানেনি। ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমও এর আওতার বাইরে ছিল।

২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের বিপ্লব পর্যন্ত যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে থাকে, তখন অনেক সাংবাদিক নিজেদের পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। নিয়মিত বেতন পাওয়া সাংবাদিকেরাও করপোরেট প্রতিষ্ঠানসহ অন্য খাতে চাকরি নিতে শুরু করেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণমাধ্যম থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গণমাধ্যম নামের ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’কে পুনর্গঠনের জন্য যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে এআই সাংবাদিকদের পেশাগত প্রাসঙ্গিকতা হারানোর আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। যাদের অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তারা গণমাধ্যম ছেড়ে অন্য পেশায়, এমনকি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

করপোরেট স্বার্থ বনাম জনস্বার্থ

বিবেক, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি ও স্বীকৃত নীতিমালা এবং গণতান্ত্রিক সংবিধানে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। এই স্বাধীনতা কারও বংশগত সম্পত্তি নয়। এর মালিক জনগণ।

নির্বাচিত সরকারগুলোর দায়িত্ব এমন আইন ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করা, যাতে তাদের পক্ষে ও বিপক্ষে-উভয় ধরনের সংবাদ প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশ করা যায়। প্রাণবন্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। ইতিহাসেও দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের উত্থান ঘটেছে।

বিংশ শতাব্দীতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ গণমাধ্যমের ওপর সমাজের সম্মিলিত অধিকারকে ক্রমশ সংকুচিত করেছে। এর ফলে আধুনিক করপোরেট গণমাধ্যমের বিকাশ ঘটেছে। সাংবাদিকেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীতে পরিণত হয়েছেন। আর সাংবাদিকতা পরিণত হয়েছে করপোরেট ক্ষমতা ও রাজনৈতিক শক্তির যোগসাজশের প্রচারযন্ত্রে। বিনিয়োগকারীদেরই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মালিক বলে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে।

আমেরিকা হোক কিংবা বাংলাদেশ-ক্ষমতা ও সম্পদের প্রচারকারী কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যা প্রকাশ করতে চায়, পাঠক ও দর্শকেরা কেন তার জন্য অর্থ ব্যয় করবেন?

এ ধরনের গণমাধ্যমের কার্যক্রম শিকারি পুঁজিবাদীর চরিত্রই প্রকাশ করে।

করপোরেট গণমাধ্যমে জনস্বার্থকে সহজেই বিসর্জন দেওয়া যায়। মালিক কিংবা বিজ্ঞাপনদাতার করপোরেট মানসিকতা প্রায়ই এমন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে যে অর্থের বিনিময়ে প্রচার কেনা যায় এবং সংবাদ চেপে রাখা যায়।

গত এক শতাব্দীতে গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক ভুল ছিল বিজ্ঞাপনকে ভর্তুকি কিংবা মুনাফার উৎস হিসেবে ধরে ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা। জনস্বার্থের পরিবর্তে করপোরেট স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যখন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ইন্টারনেট আরেকটি রূপান্তর ঘটিয়েছে। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যদি এমন পরিবেশ তৈরি না করে, যেখানে গণমাধ্যমে জনস্বার্থ অগ্রাধিকার পায়, তাহলে করপোরেট জগতের এই সমুদ্রে হয়তো আরও বড় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো আধিপত্য বিস্তার করবে।

আজকের সাংবাদিক কে?

পেশাদার সংবাদকর্মীকে ইংরেজিতে ‘ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট’ বলা হয়। মূলত বিনিয়োগকারী, ব্যবস্থাপক কিংবা শখের সাংবাদিকদের থেকে তাকে আলাদা করতেই এই শব্দের ব্যবহার।

চিকিৎসক, বিচারক কিংবা সামরিক কর্মকর্তার মতো একজনের নামের আগে ‘সাংবাদিক’ শব্দটি সাধারণত বসানো হয় না। এর একটি কারণ হয়তো এই যে সাংবাদিক হতে হলে আজীবন সাধনা করতে হয়।

সত্যকে বোঝা এবং সমাজে তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য একজন সাংবাদিকের যে শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা, সংস্কৃতিবোধ, সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, নৈতিক দৃঢ়তা ও মানবিক চেতনা থাকা প্রয়োজন, তা শুধু সাংবাদিকতার পাঠ্যক্রম কিংবা সংবাদকক্ষের নির্দেশিকায় উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়।

যেসব সাংবাদিক নৈতিকতা পরিত্যাগ করেন, তারা এই পেশায় থাকার অধিকার হারান। অন্যদিকে যাঁরা দারিদ্র্য, দুর্ভোগ ও হুমকি উপেক্ষা করেও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন, তারা কি আরও বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য নন?

উচ্চমানের কয়েকজন সাংবাদিক মিলে একটি ভালো সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর উদাহরণ রয়েছে।

কিন্তু সাংবাদিকদের কাজ, শৃঙ্খলা কিংবা সততার ভিত্তিতে নয়, বরং করপোরেট মালিকদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী যখন তাদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করা হয়, তখন এই আদর্শ বাধাগ্রস্ত হয়। এমন পরিবেশে সংবাদকক্ষে বিতর্ক ও মতবিনিময় হারিয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের সত্যের প্রতি অঙ্গীকার কিংবা সাংবাদিকের বিচারবোধ ও অন্তর্দৃষ্টি-কোনোটিই যথাযথভাবে প্রকাশিত হতে পারে না।

তখন সাংবাদিকেরা বলতে বাধ্য হন, ‘আমি অমুক প্রতিষ্ঠানে কাজ করি।’

এতে তাদের ব্যক্তিগত বিকাশ ঘটে না। এমনকি বাণিজ্যিক দিক থেকেও তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচিতি বা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারেন না।

এ ধরনের কর্মীরা যদি মনে করেন, তারা যা লিখবেন বা প্রতিবেদন করবেন, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে, তাহলে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার ও তার সহযোগীদের পতন ঘটত না।

সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা অপরিহার্য। সস্তা তারকা কিংবা ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠা সাংবাদিকতার প্রধান লক্ষ্য নয়। প্রতিদিন নতুন করে ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে জানা, স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং সেই তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই পেশার সাধনা।

লোভ, প্রলোভন ও ভয়কে জয় করে ক্ষমতা ও সম্পদের প্রভাব উপেক্ষা করে জীবনের গল্প বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা প্রতিদিনের সংগ্রাম।

এক অর্থে সাংবাদিকের কাজ সহজ: তথ্য সংগ্রহ করা এবং কোনো বিকৃতি ছাড়াই তা উপস্থাপন করা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক ভবিষ্যদ্রষ্টার মতো দায়িত্বও। কারণ, সাংবাদিকের বয়ান হতে হবে নির্মল, ভেজালমুক্ত সত্য।

এমন একজন মানুষ নিজেকে আরও উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। আর তার সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে সমাজের সম্পদ। তাহলে একজন সাংবাদিককে চাকরির শৃঙ্খলে বন্দী করে রাখার উদ্দেশ্য কী?

সাংবাদিকতার নিকট ভবিষ্যৎ কেমন?

বিশ্বজুড়ে মানুষ আগের মতো গণমাধ্যমকে আর ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। গণমাধ্যম পেশাজীবীদের জন্য এটি বেদনাদায়ক। এর একটি কারণ হতে পারে, সাধারণ মানুষের চোখে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তারা নিজেদের দর্পণ হিসেবে খুঁজে পেয়েছে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সামাজিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হচ্ছে। অন্যদিকে ফেসবুক বা ইউটিউবে কিছু সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কর্মী মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি দর্শক-শ্রোতা আকৃষ্ট করেছেন।

দুই ক্ষেত্রেই প্রধান সুবিধাভোগী এবং অনেকাংশে নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের মালিক।

এই অস্থিরতার মধ্যে করপোরেট গণমাধ্যম পুরোনো দিনের ‘কম খরচে পুষ্টিকর খাবার’ খোঁজার মতো অন্ধভাবে জনপ্রিয় প্রবণতা অনুসরণ করছে। ব্যয় সংকোচনের নীতির আওতায় তারা যত বেশি সম্ভব উচ্চমানের সাংবাদিককে সরিয়ে দিতে চাইছে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে অক্ষম গণমাধ্যম নির্বাহীদের জন্য এআই নতুন একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

এআই দ্রুত অনলাইন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। সেগুলো সম্পাদনা করতে পারে। ব্যাকরণ ও বানানের ভুল সংশোধন করতে পারে। নির্দেশনা দিলে সংবাদ বা বিশ্লেষণও লিখতে পারে। কিন্তু এসব নির্বাহী বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে, এ ধরনের লেখা মৌলিক নয়, মানুষের আবেগকেও গভীরভাবে স্পর্শ করে না।

প্রায় সবাই এমন গণমাধ্যমের পণ্য অনুকরণ করে, যা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু রাখা, জনপ্রিয় প্রবণতা অনুসরণ করা এবং দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এআই ব্যবহারের মতো নানা কৌশল নিচ্ছে। কিন্তু স্বতন্ত্র সংবাদ অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ এবং সাংবাদিকতার সৃজনশীলতার প্রতি তারা তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ দিচ্ছে।

‘স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু’ বা ইউনিক কনটেন্টের কথা বারবার বলা হলেও পাঠক ও দর্শকদের সামনে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু তুলে ধরা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিপুল পরিমাণ বিষয়বস্তুই প্রমাণ করে, সত্যের চাহিদা এখনো রয়েছে। সেখানে যেমন অর্থহীন ও নিম্নমানের বিষয়বস্তু আছে, তেমনি আছে উচ্চমানের কাজও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা মূলধারার গণমাধ্যমের ভিডিও দেখেন, সংবাদ পড়েন, বিশ্লেষণ ও মতামত অনুসরণ করেন। একই সঙ্গে গুজব, ভুল তথ্য ও ভুয়া সংবাদের ব্যাপক উপস্থিতিও দেখিয়ে দেয়, শুধু তথ্য হাতে থাকা কিংবা তা প্রকাশ করলেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

এখন প্রয়োজন সত্যের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন-এমন একজন মানুষ। আর সেই মানুষটি হলেন সাংবাদিক।

সমাজে ভালো ও মন্দ শক্তির বয়ান নির্মাণের যে লড়াই চলছে, সেখানে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সামনে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।

খাজা মাঈন উদ্দিন: একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, গণমাধ্যম সমালোচক এবং সমসাময়িক বিষয়াবলির বিশ্লেষক। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে এই ই-মেইল ঠিকানায়: [email protected]


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]