
মার্কিন আমেরিকার ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট। ফাইল ছবি
প্রতিটি যুদ্ধই ভিন্নমত সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ মানুষ তা নিজের মধ্যেই রাখে। কেউ কেউ নীরবে সরে যায়। খুব কম মানুষই সরাসরি নিজের মত প্রকাশ করে। জো কেন্ট তা-ই করেছেন।
মার্কিন আমেরিকার ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক কোনো আমলাতান্ত্রিক ভাষার আড়ালে লুকাননি বা ‘নীতিগত মতপার্থক্য’র কথা বলেননি। তিনি সরাসরি বলেছেন, ইরান আমেরিকার জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি নয়। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যুদ্ধকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে ইসরায়েল ও তার লবির চাপের কারণে।
এটি সাধারণ নীতিগত মতভেদের চেয়েও বেশি কিছু।
কেন্ট কোনো প্রান্তিক ব্যক্তি নন। তিনি একাধিকবার যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে হারিয়েছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তগুলোর পরিণতি থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নন। এমন একজন মানুষ যখন পদত্যাগ করেন এবং বলেন যে নতুন প্রজন্মকে কোনো অর্থহীন যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে, তখন তা গুরুত্ব বহন করে।
স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো-আর কতজন একইভাবে ভাবছেন কিন্তু নীরব রয়েছেন?
ওয়াশিংটনে তথ্যের অভাব নেই; অভাব আছে সেই তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার মানুষের। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক মূল্যায়ন তৈরি করে। কংগ্রেসে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়। এগুলো কোনো অনুমানভিত্তিক বিষয় নয়।
তবুও, যুদ্ধ চলছে।
ব্যাখ্যাগুলো পরিচিত: প্রতিরোধ, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা-ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত একই ভাষা। সাধারণত এগুলো শুরুতেই আসে এবং বাস্তব পরিণতি স্পষ্ট হওয়ার পরও দীর্ঘদিন টিকে থাকে।
কেন্ট এই ভাষা পুনরাবৃত্তি করতে অস্বীকার করে সেটিকে ভেঙে দিয়েছেন।
এ ধরনের সতর্কবার্তার নজির আছে।
১৯৪৭ সালে, যখন আমেরিকা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক করছিল, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ সি মার্শাল প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন। মার্শাল কোনো বাইরের ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার আশঙ্কা ছিল, ওই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও সংঘাত তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত তার মত উপেক্ষিত হয়। ট্রুম্যান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেন। তখন সিদ্ধান্তটি নৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। মার্শালের উদ্বেগগুলো পাশে সরিয়ে রাখা হয়।
পেছনে তাকালে দেখা যায়, তার কিছু সতর্কতা বাস্তবে রূপ নিয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জোটে পরিণত হয়। আমেরিকা শুধু ইসরায়েলকে সমর্থনই করে না; প্রায়ই তার হুমকি মূল্যায়নও গ্রহণ করে এবং সেই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করে।
কেন্টের পদত্যাগ সেই জোটের পরিণতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ইরানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ একটি পরিচিত ধারা অনুসরণ করছে। প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হওয়ার আগেই উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। নীতি নির্ধারণে জোট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ চাপ প্রভাব ফেলে। ভিন্নমতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হিসেবে না দেখে সমস্যার মতো বিবেচনা করা হয়।
স্টিফেন ওয়াল্ট এবং জন মিয়ারশাইমারের মতো গবেষকরা বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি কেবল কৌশলগত হিসাব নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি ও লবিং নেটওয়ার্কের প্রভাবেও গঠিত হয়। তাদের কাজ প্রায়ই খারিজ করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতর থেকেই যখন একই ধরনের উদ্বেগ উঠে আসে, তখন তা উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এতে আরও সরাসরি একটি প্রশ্ন উঠে আসে-যে দেশকে নিজের গোয়েন্দা সংস্থাই তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে না, সেই দেশের সঙ্গে আমেরিকা কেন যুদ্ধে জড়িত?
সম্ভাব্য কয়েকটি উত্তর আছে: জোটগত অঙ্গীকার, রাজনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা। অথবা আরও গভীর সমস্যা-নিজস্ব স্বার্থ এবং মিত্রদের স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ একটি ব্যবস্থা।
রাজনৈতিক দুর্বলতা বা গোপন চাপ সম্পর্কেও কিছু অনুমানভিত্তিক দাবি রয়েছে। এগুলো যাচাই করা কঠিন এবং প্রায়ই মূল বিষয়-নীতিগত প্রশ্ন-থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।
আর নীতিটা যথেষ্ট স্পষ্ট।
স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়া উত্তেজনা বৃদ্ধি। নির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়াই সামরিক সম্পৃক্ততা। অর্থবহ জনআলোচনা ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।
আমেরিকাকে এই অবস্থানে কেউ বাধ্য করছে না। বরং এটি নিজেই এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা অতীতের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে মিল রাখে।
কেন্ট সেই ধারা চিনতে পেরেছিলেন। এ কারণেই তিনি সরে দাঁড়ান।
কিন্তু শুধু পদত্যাগ যথেষ্ট নয়। এর পর প্রয়োজন বৃহত্তর স্বীকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতা। না হলে এটি কেবল আরেকটি ঘটনা হয়ে থাকবে, যা কিছুদিন আলোচিত হয়ে পরে ভুলে যাওয়া হবে।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো-আমেরিকা যুদ্ধ করছে, এটাই শুধু সমস্যা নয়; কেন করছে-এই প্রশ্নটিই আর গুরুত্ব পাচ্ছে না।
মার্শাল ১৯৪৭ সালে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিন্তু উপেক্ষিত হয়েছিলেন।
কেন্ট আবার সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
এখন দেখার বিষয়-কেউ তা শুনবে কি না।
সূত্র: আল-জাজিরা
জাসিম আল-আজ্জাবি: বিশ্লেষক ও সাংবাদিক