
ছবি: সংগৃহীত
নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা, মামলার পাহাড়, পুলিশের অপ্রতুলতা, বেকারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মব ভায়োলেন্স বা মব জাস্টিস। আইন-শৃঙ্খলার এই সংকট থেকে মুক্তি না পেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শনিবার গবেষণাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত ‘আইন-শৃঙ্খলা অবনতির বহুমাত্রিক কারণ ও টেকসই সমাধানের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সমালোচনা করা এই আয়োজনের উদ্দেশ্য নয়। বাস্তবতার নিরিখে অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই এ আয়োজনের লক্ষ্য।
সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। আলোচনায় অংশ নেন সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম।
অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে খুন-খারাবি ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের প্রাথমিক ও মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। তাই অপরাধের মূল উৎপত্তি খুঁজে বের করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনাগরিক তৈরির দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সমাজের প্রতিটি স্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য সরকার, বিরোধী দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় সমন্বয় প্রয়োজন।
‘নিরাপত্তা দিতে না পারলে রাষ্ট্রের শাসনের অধিকার নেই’
মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, নাগরিক হিসেবে মানুষ সরকারকে কর দেয়। তাই তার জানমালের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যে রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র শাসন করার অধিকার রাখে না।
তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পুলিশ কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগত হয়ে কাজ করেছে। জনগণের সুরক্ষার জন্য পুলিশকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি।
অপরাধবিদ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, পিনাল কোডে হত্যার সংজ্ঞায়ন, ১৮৬০ সালের পুরোনো পুলিশ আইন যুগোপযোগী না হওয়া, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা এবং পুলিশের নিজেদের অপরাধ নিজেদের দিয়ে তদন্ত করানোর সংস্কৃতি পুরো আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে নির্দোষ মানুষকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি তনু হত্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগ থেকে সরকার বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২৬০ কোটি টাকা। ২০ কোটি মানুষের জন্য আপিল বিভাগে মাত্র তিন ঘণ্টার সময়কালও আন্তর্জাতিক মানে একেবারেই অপ্রতুল।
এই ‘অসভ্য পরিবেশ’ থেকে উত্তরণের জন্য সদিচ্ছা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ওপর জোর দেন তিনি।
‘শৈশব থেকেই নৈতিক শিক্ষা দরকার’
সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সফিউল্লাহ সিঙ্গাপুর ও জাপানের উদাহরণ তুলে বলেন, এসব দেশে শৈশব থেকেই শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এ শিক্ষা শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
আইন-শৃঙ্খলা অবনতির মূল কারণ হিসেবে তিনি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, মামলার বিশাল জট, অপ্রতুল পুলিশ সদস্য এবং যুবসমাজের ব্যাপক বেকারত্বকে দায়ী করেন।
সমাধানে সরকারের নিজ উদ্যোগে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও এলাকাভিত্তিক ‘কমিউনিটি পুলিশ’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে জরুরি রাজনৈতিক ও সংবিধান সংস্কার, বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির তাগিদ দেন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনমতের প্রতিফলনের জন্য ‘গণভোট’ প্রবর্তনেরও তাগিদ দেন তিনি।
‘৪৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়’
ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন বলেন, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ১০ বছরের মাদানি জীবন সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল। আইয়ামে জাহিলিয়াতের চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশকে কীভাবে তিনি একটি সুশৃঙ্খল সমাজে রূপান্তর করেছিলেন, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, সবাই পরিপূর্ণ মুসলিম ও মানবিক গুণাবলীতে ভূষিত হলে অপরাধ নিজ থেকেই কমে যাবে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার প্রসঙ্গে নেপাল ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, মাত্র দুটি আপিল বেঞ্চ থাকায় বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে প্রায় ৪৭ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
‘দিনের আলোতেও নিরাপদ নয় মানুষ’
ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রাত নয়, দিনের আলোতেও মানুষ নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না।
মেজর সিনহা ও রামিসা হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সুশাসনের অভাবেই দেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা ‘মব জাস্টিস’ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি বেকারের মধ্যে ৪১ থেকে ৪৫ লাখই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রই তাকে অপরাধী বানিয়ে তোলে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধিও মানুষকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফেলানি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা শিথিল থাকা এবং মাদকাসক্তি বাড়ায় অপরাধ চরম রূপ নিচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকলেও একটি নিরাপদ জীবন প্রত্যাশা করে।
‘পুলিশকে সরকারের হাতিয়ার বানানোর সংস্কৃতি’
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম ১৯৭১-পরবর্তী বিভিন্ন শাসনামলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে দেশে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছিল। পরে ১৯৭৯-৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে পোশাকশিল্প ও বিদেশে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন আসে এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
পরবর্তীতে এরশাদ আমল, তিন জোটের রূপরেখা ও গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনসেবার পরিবর্তে সরকারের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলেও এই সংস্কৃতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
‘আগে সৎ ও নৈতিক মানুষ তৈরি করতে হবে’
সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, কোনো কাঠামোগত আইন পরিবর্তনের আগে রাষ্ট্র ও সমাজে সর্বাগ্রে ‘সৎ ও নৈতিক মানুষ’ তৈরি করতে হবে। তা না হলে কোনো আইনই কার্যকর সুফল দেবে না।
সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম উপস্থিত অতিথি, আলোচক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।
পালাবদল/এসএ