শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬ ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার ২৮ আগস্ট ২০২৬
 
জাতীয়
বিবিসির বিশ্লেষণ: তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন আগ্রহী ভারত?





পালাবদল ডেস্ক
Friday, 28 August, 2026
5:04 PM
 @palabadalnet

তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে স্বাগত জানাতে ভারতের আগ্রহের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠেয় সাপ্তাহিক ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।

কিন্তু তখনো তারেক রহমানের ভারত সফরের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে চলা জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এখনো সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ।

তারেক রহমানের সফর হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে তার প্রথম ভারত সফর। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর তিনি সরকার গঠন করেন।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। পরে তিনি ভারতে চলে যান এবং এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।

হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার সুযোগ দেখছে দিল্লি। তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এ উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

ভারত কেন তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে আগ্রহী-এ বিষয়ে এই বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনটি লিখেছেন বিবিসির প্রতিবেদক অ্যানবারাসান ইথিরাজন।

হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা

ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সচিব ছালেহ বলেন, “শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত করার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।” ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। তারেক রহমান দিল্লি গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ দেওয়া হবে এবং ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়াই ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই অগ্রগতি করেছে দিল্লি।
তার মতে, বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা ভিসা দেওয়া এবং বাণিজ্য সহজ করতে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা পুনরায় চালুর মতো উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কও। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশই ভারতের পক্ষে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছরে দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণে একসঙ্গে কাজ করেছে। এতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বেড়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই সরকার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সক্রিয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল হাসিনা সরকার।

তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। সমালোচকদের অভিযোগ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে দিল্লি হাসিনা সরকারের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে। হাসিনার ভারতে অবস্থানের কারণে সেই অস্বস্তি এখনো রয়ে গেছে।

গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দেন এবং তারেক রহমানের বিএনপি সরকার তার সমর্থকদের দমন করছে বলে অভিযোগ করেন। তবে ভারতের মাটিতে হাসিনাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানায়, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্য তারা সমর্থন করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, “হাসিনার ওই বক্তব্য বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে গড়ার বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।”

ফলে শেখ হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে ভারতের আগ্রহের কারণ শুধু শেখ হাসিনা নন। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে বাংলাদেশ। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর হয়েছে। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও প্রকাশ্যে কথা বলেছে। এসব পরিবর্তন দিল্লির নজর এড়ায়নি।

২০০০ সালের পর ভারত অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশিক্ষণে সহায়তা করেছে এবং সীমান্ত পারাপারেও সহযোগিতা করেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সেসময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

এর মধ্যে চলতি মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া নতুন ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়েও বিভিন্ন দেশের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চুক্তিটির বিস্তারিত ও সদস্যদের সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। অর্থাৎ কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, “মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে তাতে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।” এদিকে সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পালাবদল/এসএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]