
জাহিদ হুসেইন: পাকিস্তানি গবেষক ও সাংবাদিক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এবং এর বাইরেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে লাগাতার বোমা হামলা চালানো সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ইরান তার শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষতি এবং সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত সহ্য করেছে। তবুও তারা অপ্রত্যাশিত তীব্রতায় পাল্টা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আকাশপথে হামলার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন তা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মোজতবা খামেনিকে, যিনি নিহত আলি খামেনির ছেলে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হত্যা করেছে-তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন—এটি কল্পনাই করা যায় না। তার বাবার শাহাদাত জনসমর্থনকে আরও শক্তিশালী করেছে। তেহরান ও অন্যান্য শহরে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে তাঁর নিয়োগ উদযাপন করেছে, চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলাকে উপেক্ষা করেই।
ইরান যখন নতুন নেতা নির্বাচিত করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বোমা হামলা আরও বাড়িয়েছে। ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর ইসরায়েলের হামলা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতার নিয়োগ উদযাপন করতে যখন মানুষ রাস্তায় ভিড় করছিল, তখন তেহরানের বাইরে একটি বড় তেল ডিপো-যেটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল—এখনও জ্বলছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের মতে:
“ইরানের পেট্রোলিয়াম স্থাপনাগুলোর ক্ষতি খাদ্য, পানি ও বাতাস দূষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে—যা বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে। সম্প্রতি দেওয়া এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তেহরান বলছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা তারা নির্ধারণ করবে। এতে মরিয়া হয়ে পড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর ইসরায়েলি মিত্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প এটিকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ বলেছিলেন, কিন্তু সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা তত কঠিন হবে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা থেকে বের হয়ে আসা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি স্থলবাহিনী মোতায়েনের চেষ্টা করেন, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি হবে, বিশেষ করে আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য। এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে সেই তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর মারাত্মকভাবে পড়েছে, যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সচেতনভাবে বা অজান্তেই মার্কিন-ইসরায়েলি এজেন্ডার অংশ হয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চাপ তারাই বহন করছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে কিছু তেল ও গ্যাস স্থাপনা বন্ধ হয়ে গেছে। সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জল সরবরাহকারী ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, উপসাগরীয় শেখতন্ত্রগুলোর নেতাদের জন্য নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তত কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এবং তেল-গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবুও এই সংকট যেন ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বেপরোয়া মনোভাবকে বদলাতে পারেনি। সম্প্রতি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যারে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য খুব ছোট মূল্য।” তিনি আরও বলেন, “ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে যাবে।” এমন ঔদ্ধত্য আমেরিকার মিত্রদেরও বিস্মিত করেছে।
এদিকে ট্রাম্পের সহযোগীদের বক্তব্যে সংঘাতকে ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে তার বক্তব্যে নিয়মিত ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করেন।
‘হলি হেল’-এর মতো শব্দবন্ধ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতির পক্ষে থাকা ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের সমর্থনের প্রতিধ্বনি বহন করে। এই সিনেটর সংঘাতকে “সভ্যতার সংঘর্ষ” হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এই ভাষা আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা-যা একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ এবং একটি অবৈধ ও অজনপ্রিয় যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার ট্রাম্পের মরিয়া প্রচেষ্টাকেই প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ট্রাম্পের তথাকথিত বোর্ড অব পিস নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতবোর্ড অব পিস সম্মেলনের কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের সহযোগিতায়-যে দেশটিও সম্মেলনে উপস্থিত ছিল-ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এতে বোঝা যায়, যুদ্ধের পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত ছিল, যদিও সদস্যরা তখন গাজায় যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল।
এতে পুরো BoP উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং এই ধারণা জোরদার হয়েছে যে সংগঠনটি ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে গাজার শান্তি পরিকল্পনাকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তান বিতর্কিত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রথম দিকের সদস্য দেশগুলোর একটি ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্প যে বোর্ড অব পিস সনদ ঘোষণা করেন, সেখানে গাজার কোনো উল্লেখই ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বোর্ড মূলত এমন একটি ভূমিকা নিতে চায় যা ঐতিহ্যগতভাবে পালন করে থাকে জাতিসংঘ। এই উদ্যোগটি ট্রাম্পের মস্তিষ্কপ্রসূত, যিনি নিজেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখতে চান। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ বোর্ড অব পিস গঠনের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচন করেছে। পাকিস্তানসহ অন্যান্য সদস্য দেশের সামনে বড় প্রশ্ন হলো-তারা কি সচেতনভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরু করা এই সংঘাতের অংশ হয়ে উঠবে?
গত এক বছরে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে, এমনকি ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দিয়েছে। সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক শিরোনামে বলা হয়েছে: ‘Pakistan praised Trump. Now it risks being caught up in his war.’ এই মন্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে দেশটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে আমাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। দেশের পশ্চিম সীমান্তে চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাই আমাদের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির পুনর্মূল্যায়ন জরুরি, বিশেষ করে ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস-এ আমাদের সদস্যপদ নিয়ে।
সূত্র: ডন
জাহিদ হুসেইন: পাকিস্তানি গবেষক ও সাংবাদিক।