
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম: টানা ভারি বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের জনজীবন। নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বন্ধ রাখতে হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রমও।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নগরে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাসে ২৪ ঘণ্টায় এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত।
এর পরও বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। আজ বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা প্রচুর জলীয়বাষ্প ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে এই ভারি বর্ষণ হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রামসহ সমুদ্রবন্দরগুলোকে স্থানীয় সতর্কসংকেত নম্বর ৩ দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
বুধবার সকালেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কাতালগঞ্জ, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়ার কেবি আমান আলী সড়ক, আগ্রাবাদ, হালিশহর, হাটহাজারী সড়কের বড় দীঘির পাড়, কাপাসগোলা এবং অক্সিজেন-মদুনাঘাট সড়কসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
হঠাৎ জলাবদ্ধতায় বিপাকে পড়েন অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীরা।
সোমবার রাত থেকেই বিভিন্ন দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, রেললাইনে পানির উচ্চতা তিন থেকে ছয় ইঞ্চির মধ্যে থাকলে নিরাপদে ট্রেন চালানো যায়। তবে আজ সকালে ষোলশহর গেট নম্বর ২ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান পরিমাপ করে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত উঠেছে। পানির উচ্চতা ছয় ইঞ্চির নিচে না নামা পর্যন্ত ট্রেন চালানোর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কারণ এতে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জানিয়েছে, আগে থেকে খাল ও নালা পরিষ্কার থাকায় কয়েকটি এলাকায় দ্রুত পানি নেমে গেছে। তবে নগরের অনেক এলাকায় বুধবার সকাল পর্যন্ত জলাবদ্ধতা থাকায় ভোগান্তিতে ছিলেন বাসিন্দারা।
নগরের বাইরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। টানা তিন দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
আনোয়ারা উপজেলায় প্রবল বাতাস ও ভারি বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে।
আনোয়ারার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করতে কর্মীরা কাজ করছেন। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে।
ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় পরীক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও বুধবারের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিকূল আবহাওয়া, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।
নগরের বিভিন্ন মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে ছুটি ঘোষণা করেছে।
অবিরাম বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশ এবং নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”
এরই মধ্যে চট্টগ্রাম নগর, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও কক্সবাজারে দেয়াল ধস ও পাহাড়ধসে গত ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ও ঘন মেঘের কারণে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
পালাবদল/এসএ