অঝোরে কাঁদছেন লিয়োনেল মেসি। একের পর এক সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। চোখের জল থামছেই না। থামবে কী ভাবে। ১৫ মিনিট আগে তার এক বারের জন্য হলেও তো মনে হয়েছিল, শেষ! সব শেষ! বিশ্বকাপ শেষ! সম্ভবত দেশের হয়ে খেলাও শেষ! কিন্তু তিনি কেন বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলার তা আরও এক বার দেখালেন মেসি। একাই দলকে বাঁচিয়ে রাখলেন বিশ্বকাপে। খেলা শেষে মেসিকে যে ভাবে কাঁধে তুলে লাফালেন সতীর্থেরা, তাতে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি না থাকলে কী হত।
সত্যিই, মেসি না থাকলে এই ম্যাচ জিততে পারত না আর্জেন্টিনা। কোনও ভাবেই না। অন্তত ০-২ পিছিয়ে পড়ার তো নয়ই। দেখে মনে হচ্ছিল, মিশরের পিরামিডের উচ্চতা টপকাতে পারবে না গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। কিন্তু মেসি জানতেন, তিনি পারবেন। তিনি পারলেনও। হারের মুখ থেকে আর্জেন্টিনাকে টেনে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। হেরেও মন জিতে নিল মিশর। সালাহ্দের খেলা মনে রাখবেন ফুটবল ভক্তেরা।
খেলা শুরুর আগে মিশরের ডিরেক্টর অফ ফুটবল হাসান হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, তাদের দলে ২৬ জন মেসি রয়েছেন। মিশরের খেলা দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছিল। প্রথমার্ধে সালাহ্ তেমন কিছু করতে না পারলেও ইব্রাহিম, হাসান, জিকোদের পায়ে বার বার আক্রমণে উঠছিল মিশর। এই ম্যাচে প্রথম একাদশে তিন বদল করেছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো, ইউলিয়ান আলভারেজ় ও লিয়োনার্দো পারেদেস শুরু করেন। কিন্তু এই ম্যাচেও খুঁজে পাওয়া গেল না আলভারেজকে। একটি শট নেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করেননি তিনি।
মেসিকে যে মিশরের রক্ষণ বোতলবন্দি করে রাখার চেষ্টা করবে তা ছোট্ট শিশুও জানে। সে ক্ষেত্রে বাকিদের এগিয়ে আসতে হয়। ঠিক যে ভাবে হ্যারি কেনকে মেক্সিকো আটকে রাখায় গোল করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন জুড বেলিংহ্যাম। কিন্তু আর্জেন্টিনার এই দলে তো তেমন কেউ নেই। চার বছর আগে কাতারে আলভারেজ়, এঞ্জোরা গোল করছিলেন। মেসির উপর চাপ কমছিল। এ বার তারা খুব খারাপ ফর্মে।
শুরু থেকে ধীরে চলো নীতি নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এত স্লো বিল্ড আপে মিশরের মতো গতিশীল দলকে চাপে রাখা মুশকিল। সেটাই হলো। ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা হাসানের ক্রসে হেডে গোল করে মিশরকে এগিয়ে দিলেন ইব্রাহিম। যদিও কয়েক মিনিট পরেই পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট থেকে আরও একবার হতাশ করলেন মেসি। আবার গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবেরের বাঁ দিক দিয়ে মারার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু খুব খারাপ শট ছিল। পাড়ার ফুটবলেও তা দেখা যায় না। চলতি বিশ্বকাপে জোড়া পেনাল্টি ফস্কালেন মেসি।
তার পরেও গোল করতে পারতেন মেসি। তার বাঁ পায়ের বাঁক খাওয়ানো ফ্রি কিক পোস্টে লেগে বেরিয়ে যায়। সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ম্যাকঅ্যালিস্টার ও আলভারেজ়। মনে হচ্ছিল, দিনটা আর্জেন্টিনার নয়। মেসির সঙ্গে সব সময় এক জন মার্কার ছিলেন। তিনি বল ধরলে চলে আসছিলেন আরও দু’জন। ফলে মাঝে মাঝেই বলের দখল হারিয়ে ফেলছিলেন মেসি। দ্বিতীয়ার্ধেরও একই ছবি। চাপ বাড়ালেও গোলের মুখ খুলতে পারছিল না আর্জেন্টিনা।
তার মাঝেই পর পর নাটক হয় ম্যাচে। প্রতি আক্রমণ থেকে তিন পাসে আর্জেন্টিনার গোলে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন জ়িকো। কিন্তু তার আগে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ়কে ফাউল করায় রেফারি গোল বাতিল করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরও একবার প্রতি আক্রমণ থেকে গোল করে মিশর। এ বার জিকোর গোল বাতিল হয়নি। ম্যাচ জিতলেও আর্জেন্টিনার জঘন্য রক্ষণ চিন্তায় রাখবে স্কালোনিকে। যেভাবে হাসান, সালাহেরা হাসতে হাসতে আর্জেন্টিনার বক্সে ঢুকলেন, তা কাজে লাগাতে পারলে আরও গোল করতে পারত মিশর।
সময় কমছিল আর্জেন্টিনার। গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরা কাঁদতে শুরু করেছিলেন। ধারাভাষ্যকারেরা বলছিলেন, মেসিকে আর ১৫ মিনিটের জন্য বিশ্বকাপে দেখা যাবে। ঠিক তখনই লাউতারো মার্তিনেজ়কে নামালেন স্কালোনি। মেসিও সরে গেলেন একেবারে ডান প্রান্তে। বক্সের মধ্যে লোক বাড়াতে গিয়ে মেসিকে ছেড়ে দিল মিশরের রক্ষণ। সেরাদের জন্য ওই টুকুই যথেষ্ট। মেসির ক্রসে হেডে গোল ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর। ৪ মিনিট পরেই আবার মেসির ক্রস মিশরের বক্সে। এবার ফিরতি বলে তিনিই গোল করলেন। চলতি বিশ্বকাপ আট গোল করে ফেললেন তিনি। প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন লিয়ো।
তখনও নাটক বাকি ছিল। মিশর আবার গোল করার জন্য এগিয়ে যায়। ফলে তাদের রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁক কাজে লাগাল আর্জেন্টিনা। ডান প্রান্তে লাউতারো বল ধরে ক্রস দিলেন বক্সে। গোটা ম্যাচে যাকে পাওয়া যায়নি সেই এঞ্জো হেডে গোল করলেন। আর ফেরার সুযোগ ছিল না মিশরের। বিদায় নিতে হল তাদের। জিতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মেসি। বোঝা গেল, কতটা চাপে ছিলেন তিনি। সেই চাপ কাটিয়ে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার তুললেন সেই মেসিই।
পালাবদল/এসএ