
সংগৃহীত ছবি
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার একটি ‘ঐক্যবদ্ধ মুসলিম ফ্রন্ট’ গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়তে ‘বন্ধুত্বের হাত’ বাড়াচ্ছেন।
ইসলামাদ সফরকালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ‘গঠনমূলক বৈঠক ও আলোচনা’ করেছেন।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই আলোচনায় আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছি।”
পেজেশকিয়ান বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশ “বর্তমান ইতিবাচক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত ও সুযোগ তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
তিনি বলেন, ইরানের বিশ্বাস, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরের কৌশলগত অঞ্চলে ‘শান্তি, স্থিতিশীলতা, টেকসই নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ কেবলমাত্র খোলামেলা ও সৎ আলোচনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।’
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “আমরা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি, যাতে একটি অভিন্ন বোঝাপড়া তৈরি করা যায় এবং অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা যায়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজের বক্তব্যে কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের নাম উল্লেখ ছিল, যা তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রাখা পক্ষগুলোর ‘যথার্থ স্বীকৃতি’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি মুসলমানদের তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠন করা উচিত।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন,“ইসলামাবাদ ও তেহরানের ‘বিশাল সম্ভাবনা’, এবং দুই দেশের নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের সমর্থন-এই সব মিলিয়ে ইরান ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে ‘ইসলামি বিশ্বের উপযোগী উচ্চতায় উন্নীত করা সম্ভব এবং এটি ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের একটি সফল মডেল তৈরি করতে পারে’।”
তিনি ঘোষণা করেন, দুই দেশ “বিশেষ করে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও বাড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
তিনি আরও জানান, গত বছরের সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও চুক্তির কাঠামোর মধ্যে দুই দেশের মন্ত্রীরা “বিদ্যমান প্রযুক্তিগত বাধা দূর করতে এবং সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।”
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার বক্তব্য শুরু করেন বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবালের কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে, যা তিনি বলেন মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে আসছে।
তিনি বলেন, “দুই দেশ শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ও আশার দিক থেকে একটি অভিন্ন ভাগ্য বহন করে।”
“আমাদের জন্য পাকিস্তান শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি একটি ভ্রাতৃপ্রতিম ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ,” তিনি বলেন। “দুই দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও জনসম্পর্ক রয়েছে, যা আমাদের আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।”
ইসলামাবাদ ও তেহরানের সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও ঐতিহাসিক আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও এই মূল্যবান সম্পদের দৃঢ়তাকে প্রমাণ করেছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সংকটময় সময়ে আঞ্চলিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাকিস্তানের দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী ভূমিকা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার ও উত্তেজনা কমাতে তার ভূমিকা—এটি একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।”
তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগকে ইরান গ্রহণ করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে প্রাচীন ও দীর্ঘস্থায়ী আস্থার প্রতিফলন।”
শেষে তিনি পাকিস্তানের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং মরহুম খামেনির স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ পোস্টে জানান, ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এটি ছিল ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তাদের প্রথম বৈঠক।
তিনি লেখেন, উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরসহ মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, “পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
পরে একদিনের সফর শেষে ইরানের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান ত্যাগ করেন।
বিদায়কালে সিডিএফ মুনির, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তার সফরের স্মারক হিসেবে তাকে একটি ফটো অ্যালবামও উপহার দেওয়া হয় বলে পিটিভি নিউজ জানায়।
সূত্র: ডন
পালাবদল/এসএ