
ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূল সংলগ্ন হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজ, ১২ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে ওয়াশিংটন। বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক মাধ্যম এক্সে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী এই অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর কিছু জাহাজ মোতায়েন থাকবে।
অল্প সময় পরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, তার কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে অনুমোদন দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ‘ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষার’ আশ্বাস দেওয়ায় তিনি এই পদক্ষেপে সায় দিয়েছেন।
খামেনির মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চরম হতাশা থেকে চুক্তিটি সম্পন্ন করতে সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছেন।
সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। কিন্তু, এর অর্থ এই নয় যে ইরান শত্রুর শর্ত বা অবস্থান মেনে নেবে।
সমঝোতা স্মারক নিয়ে খামেনি এই প্রথম কোনো প্রতিক্রিয়া জানালেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার ফলে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাতে তার বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর মার্চ মাসে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
মোজতবা খামেনির বক্তব্যের সরাসরি কোনো জবাব না দিলেও ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে জানান, তিনি সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আশা করছেন। এর মধ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত।
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার পরিবেশ বজায় রাখতে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সই করা সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি হলো ১৪টি পয়েন্ট। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার বাধ্যবাধকতা।
এ ছাড়া দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে এতে। এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে দায়বদ্ধ থাকবে। তবে দুই পক্ষ চাইলে এই সময় আরও বাড়তে পারে।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারকের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা ছিল। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বিবিসিকে জানায়, অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে কারণ চুক্তিটি এরইমধ্যে ডিজিটালি সই হয়ে গেছে।
তা সত্ত্বেও, পরবর্তী আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের সুইজারল্যান্ডে সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স আজ রাতে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন না।
এর আগে হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ৬০ দিনের পরবর্তী আলোচনার সময়সীমা শুরু হয়েছে।
তিনি সম্ভবত ‘কারিগরি আলোচনার’ জন্য সুইজারল্যান্ড যাবেন। তবে কবে যাবেন তা নিশ্চিত করেননি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানরা স্মারকের শর্তাবলি, বিশেষ করে ইরানের জন্য পুনর্গঠন তহবিলের সংস্থান নিয়ে ক্ষুব্ধ।
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতিগত ভুল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়নি এবং তারা শিখে নিয়েছে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলে কাজ হয়।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বৃহস্পতিবার সমঝোতা স্মারকের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ইরান প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত কোনো অর্থ বা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে না।
তিনি জানান, এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে এবং ওই অঞ্চলের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।
ভ্যান্স ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও সমালোচনা করেন, যারা সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতা করছেন।
নেতানিয়াহু নিজে অবশ্য বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন ইসরায়েলের ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দাঁড়িয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে সই করলেও ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পালাবদল/এসএ