রবিবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 
বিদেশ
ইয়েমেনের সংখ্যালঘু থেকে আঞ্চলিক শক্তি: যেভাবে হুতিদের উত্থান





Sunday, 13 September, 2026
5:10 PM
 @palabadalnet

হুতি যোদ্ধা। ফাইল ছবি

হুতি যোদ্ধা। ফাইল ছবি

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বলয়ে হুতিরা নিজেদের এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে জানান দিল।

একসময় হুতিদের একটি বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ও সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরের বিশাল এলাকা এবং লোহিত সাগরের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে।

হুতি কারা?

হুতিরা মূলত জায়েদি সম্প্রদায়ের অনুসারী। এটি শিয়া ইসলামের একটি শাখা। এই শাখা সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইয়েমেনে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে জায়েদিদের ওপর ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা আন্দোলন শুরু করে। জায়েদিরা মূলত দেশটির উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে বসবাস করে।

হুতি আন্দোলন ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর নামকরণ করা হয়েছে গোষ্ঠীটির প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা বদরুদ্দিন আল-হুতি ও তার ছেলে হোসেনের নামানুসারে। ২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হাতে হোসেন নিহত হন। পরে বদরুদ্দিনের আরেক ছেলে আব্দুল মালিক আন্দোলনের দায়িত্ব নেন। তিনি তার অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে গোষ্ঠীটিকে উত্তর-পশ্চিমের একটি বিচ্ছিন্ন দল থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন।

বর্তমানে আব্দুল মালিকের অধীনে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা রয়েছেন। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে তাদের। ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই বাস করে, যদিও দেশটির ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ এখনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হুতিদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো ইয়েমেনের প্রতিবেশী তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলের জন্যও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা শুরু করার পর তারা বারবার দখলদার দেশটিকে লক্ষ্য বানিয়েছে।

উত্থানের কয়েক দশক

২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে জড়ায়। এমনকি ২০০৯-১০ সালে তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
২০১২ সালে আরব বসন্তের সময় তারা বিক্ষোভে অংশ নেয়। এর ফলে তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে এই সালেহর সঙ্গেই হুতিরা জোট গড়েছিল। তবে সেই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০১৭ সালে হুতিরাই তাকে হত্যা করে।

২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করার মাধ্যমে হুতিরা তাদের শক্তির জানান দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব তাদের ওপর হামলা শুরু করে। এতে যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাতে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়। দেশটিতে নেমে আসে চরম মানবিক বিপর্যয়। ২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও দেশের উত্তরের বড় একটি অংশ এখনো তাদের দখলেই রয়েছে।

গত জুলাই মাসে নতুন করে সংকট শুরু হয়। ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করতে দেয়। এর পাল্টা জবাব হিসেবে সরকারি বাহিনী হুতিদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক

তেহরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হলো হুতিরা। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে। সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের ইরানের ‘হাতের পুতুল’ বলে মনে করে। তাদের অভিযোগ, ইরান এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে, যদিও ইরান বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

তবে হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত নেতা বলে মনে করে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে।

২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করতেই তাদের এই হামলা। হামলার কারণে অনেক কোম্পানির জাহাজ বাধ্য হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে।

গত মার্চ মাসে হুতিরা ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারা ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও হুতিরা নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখে। মূলত সামরিক সাহায্যের জন্যই তারা ইরানের ওপর নির্ভর করে।

বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ

দীর্ঘদিন ধরেই হুতিরা লোহিত সাগর এবং এর দক্ষিণ প্রবেশদ্বার বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়ে আসছে।

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালি আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন ও আফ্রিকার দেশ জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝে অবস্থিত। এটি তার সরুতম স্থানে মাত্র ১৮ মাইল (২৯ কিমি) প্রশস্ত। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগ স্থাপনকারী এই সমুদ্রপথটি সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তাদের তেল রফতানি প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল, তখন সৌদি আরব লোহিত সাগরের এই পথটিকেই তাদের তেল বিক্রির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। জুলাই মাসে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং এরপর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে থাকে।

ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ৩ সেপ্টেম্বর হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি দখলের লক্ষ্যে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এক সপ্তাহের মধ্যে তারা লোহিত সাগরের পুরো উপকূল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের দ্বীপগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এর ফলে এখন সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়ে গেছে এবং সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাদের জন্য আরও সহজ হয়েছে।

পালাবদল/এমএ


  সর্বশেষ খবর  
  সবচেয়ে বেশি পঠিত  
  এই বিভাগের আরো খবর  


Copyright © 2025
All rights reserved
সম্পাদক : সরদার ফরিদ আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক : জিয়াউর রহমান নাজিম
ফোন : +৮৮-০১৮৫২-০২১৫৩২, ই-মেইল : [email protected]