
সংগৃহীত ছবি
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানকে আমন্ত্রণ জানাল পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব। লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনের এক প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে ।
ইরানের পার্লামেন্টের ‘খানেহ মেল্লাত’ বার্তা সংস্থার প্রধান মেহেদি রাহিম আল মায়াদিনকে জানান, “ইরান মক্কা চুক্তিতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছে। আমন্ত্রণ পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’ এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
তবে এই নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ খোলেনি পাকিস্তান, তুরস্ক বা সৌদি আরব। তবে এই আমন্ত্রণের বিষয়টি এখনও ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
মেহদি রহিমি আরও বলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যা ইরানের জন্য একটি বিজয়-কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের জোট গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিল।
এই জোটের কোনো বিরোধিতা করছে না আমেরিকা। কেউ কেউ বলেন, এই জোট গড়ার নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকাই।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে যেসব শাসক এত দিন মসনদ রক্ষা করেছে, তাদের সেই পুরোনো সুবিধার অবসান ঘটতে চলেছে ক্রমে। এ অঞ্চলের রাজপরিবারগুলো বহুকাল এ রকম সুরক্ষাব্যবস্থায় নিরাপদে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মোকাবিলায় নেমে ইরান ওয়াশিংটনের আরব মিত্রদের পুরোনো সেই সুরক্ষার ধারণা ভেঙে দিয়েছে।
এ দৃশ্য থেকে বিশ্বের অনেক দেশ তাৎক্ষণিক কিছু শিক্ষা নিয়েছে। সবাই নিজ নিজ প্রতিরক্ষা নীতি-কৌশল পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাস করছে। কৌশলগত বহুমুখিতা শুরু হয়েছে চারদিকে। মক্কা চুক্তি তার প্রথম বড় প্রকাশ। রূঢ় এক বাস্তবতার চাপই দূরে দূরে থাকা তিন শক্তিকে কাছাকাছি এনেছে। তবে চুক্তিবদ্ধ সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা না ছেড়েও নিজ নিজ আন্তর্জাতিক ইমেজে বাড়তি ভার যোগ করতে পারল। চুক্তির পরও রিয়াদ-ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদ-বেইজিং সখ্য থাকছে। তুরস্ককেও ন্যাটো ছাড়তে হচ্ছে না।
চুক্তিতে রয়েছে, আলোচ্য তিন শরিকের কেউ আক্রান্ত হলে সেটা তিন দেশের আক্রান্ত হওয়া হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। এই অনুচ্ছেদ ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো। যার ব্যাখ্যা এ–ও দাঁড়ায়, ভারত-পাকিস্তান যেকোনো ভবিষ্যৎ যুদ্ধে তুরস্ক ও সৌদি আরবও ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে। কিংবা ইরান-সৌদি যেকোনো সামরিক সংঘাতে পাকিস্তান ও তুরস্ক তেহরানের বিরুদ্ধে লড়বে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি আরবে কিছু পরিমাণে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং জওয়ান মোতায়েন করেছে। ত্রিদেশীয় এ চুক্তির আগে গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পৃথক আরেকটি সামরিক চুক্তি হয়েছিল। পরের চুক্তি নিঃসন্দেহে আগের চুক্তির চেয়ে বড় আকারের অগ্রগতি।
এই চুক্তি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও আপত্তি জানায়নি তেহরান। গত ১০ অগস্ট ইরানের বিদেশ মন্ত্রণালয়েরর মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, “উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই।” বরং জোটের পাশে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছিল তাকে। বাঘাইয়ের মতে, “নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।”
তবে ইরান সত্যিই এই জোটে যোগ দিলে তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক অনেকটা আদায়-কাঁচকলায়। ইয়েমেন-সহ বিভিন্ন সংঘাতে দুই দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩-এ চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হলেও গত কয়েক মাসে তার অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার জবাবে ইরান সৌদি আরব-সহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে তৈরি এই প্রতিরক্ষা জোটে ইরান যোগ দিলে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে বড়সড় পালাবদল ঘটতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ।
পালাবদল/এসএ